কাশ্মীর এক বিতর্কিত উত্তরাধিকার: ১৮৪৬-১৯৯০ (১ম খণ্ড : দ্বিতীয় অধ্যায়)

প্রথম খন্ড: উৎপত্তি ১৮৪৬-১৯৪৭
দ্বিতীয় অধ্যায়

জম্মু ও কাশ্মীর এবং ভারতীয় রাজকীয় রাজ্যসমূহ: ১৮৪৬-১৯৪৭

১৯৪৭ সালে জম্মু ও কাশ্মীর ছিলো বৃটিশ ভারতীয় রাজকীয় রাজ্যগুলোর একটি। এ রকম রাজ্য ছিলো কমপক্ষে ৫৬২টি (কারো কারো মতে ৫৬৫টি বা ৫৮৪টি)। বস্তুতঃ ভারতীয় রাজকীয় রাজ্যগুলো তিনটি প্রধান শ্রেণিতে বিভক্ত ছিলো। প্রথমতঃ জম্মু ও কাশ্মীর সহ প্রায় একশ’ চল্লিশটি বড় রাজ্য যেগুলো নীতিগত ভাবে আইন প্রণয়ন ও বিচার বিভাগীয় ক্ষমতা উপভোগ করতো, অর্থাৎ এ রাজ্যগুলো ছিলো ‘পূর্ণ ক্ষমতায়িত’। দ্বিতীয়তঃ প্রায় একই সংখ্যক আরো কিছু রাজ্য ছিলো যাদের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনকে বৃটিশরা কিছু আনুষ্ঠানিক অঙ্গীকারনামার মাধ্যমে কিছু পরিমাণে নিয়ন্ত্রণ করতো; এক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক অঙ্গীকারনামা গুলো একেক রাজ্যের জন্য একেক রকম ছিলো। এছাড়াও শুধুমাত্র কয়েকশ’ একর জমির মালিক এরকম আরো প্রায় তিনশ’র মতো ছোট রাজ্য ছিলো তৃতীয় শ্রেণিতে। প্রতি শ্রেণিভুক্ত রাজ্যগুলোর মধ্যে অনেক রাজ্যই এমন অবস্থানে ছিলো যে সেগুলো অন্য এক বা একাধিক রাজ্য দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিলো।

বড়, মাঝারি বা ছোট কিংবা একীভূত বা বিচ্ছিন্ন যাই হোক না কেন সকল ভারতীয় রাজকীয় রাজ্যসমূহ সাংবিধানিক তত্ত্বে মূল বৃটিশ ভারত (অর্থাৎ এগারোটি প্রদেশ ও কিছু উপজাতীয় এলাকা) থেকে সম্পূর্ণ পৃথক ছিলো এই অর্থে যে, রাজ্যগুলোর আনুগত্য ছিলো সরাসরি বৃটিশ রাজের প্রতি। এক্ষেত্রে রাজ্যগুলো এবং বৃটিশ রাজের মধ্যে কাজের সুবিধার্থে সাধারণতঃ সম্রাটের প্রতিনিধি – আনুষ্ঠানিক অর্থে রাজ প্রতিনিধি – ভাইসরয়ের মাধ্যমে একজন রাজনৈতিক উপদেষ্টা বা তত্ত্বাবধায়ক-এর মত কোন একজন কর্মকর্তা যোগাযোগ রক্ষা করতেন। ভাইসরয় একাধারে গর্ভনর জেনারেল হিসেবে সরকার প্রধানও ছিলেন এবং ভাইসরয় হিসেবে ছিলেন সম্পূর্ণ ভারতীয় সাম্রাজ্যের আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রপ্রধানের প্রতিভূ। রাজ্য শাসকবৃন্দ ও রাজন্যবর্গ বৃটিশ রাজের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করার গুণে এক অর্থে ভারতীয় রাজ্যের অংশই ছিলেন, কিন্তু তাদের রাজ্যগুলো মূলতঃ সম্রাটের নামে বৃটিশ সরকারের বর্ধিত অংশের কোন ভূখন্ড ছিলো না। (মূলতঃ বৃটিশ দমন নীতিই এখানে শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করতে বা হজম করতে কাজ করেছিলো।)

বৃটিশ ভারতীয় সাম্রাজ্য বিদায় নেয়ার সাথে সাথেই এর শ্রেষ্ঠত্বের অবসান ঘটতে পারতো এবং রাজ্যগুলো (বিশেষ করে পূর্ণ ক্ষমতায়িত রাজ্যগুলো) পুরোপুরি স্বাধীন হতে পারতো। বৃটিশদের প্রস্থানের প্রাক্কালে ১৯৪৬ সালের ১২ মে ভারত সফরকারী বৃটিশ মন্ত্রী দল এই পরিস্থিতি নেতৃস্থানীয় রাজন্যবর্গকে খুব পরিষ্কারভাবেই তুলে ধরেন। ১৯৪৭ এর শুরুতে দেশভাগ-এর অবশ্যম্ভাবিতা যখন প্রায় প্রমাণিত, তখন রাজন্যবর্গকে অনেকটা ইঙ্গিতে এবং বেশ জোরালোভাবেই একটি বিষয়ে সুপারিশ করা হয়েছিলো। বলা হয়েছিলো, তাঁদের হাতে এ সুযোগ রয়েছে যে, বৃটিশ রাজের স্থলাভিশিক্ত শাসনব্যবস্থার যে কোনটি অর্থাৎ ভারত বা পাকিস্তানের সাথে তারা যুক্ত হতে পারেন। এক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণে মনস্থির করার আগে তাদের মনোবাসনার বিষয়ে শাসকদের সাথে পরামর্শ করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে অবশ্য কিছুই বলা হয়নি।

নতুন শাসনব্যবস্থার সাথে যুক্ত হওয়া বা একীভূত হওয়া সম্পর্কিত কর্মকৌশলের বিস্তারিত ভারত সরকার আইন ১৯৩৫-এ অনেকটা গুছিয়ে রাখা হয়েছিলো। এ আইনে ভারতের আধিপত্যে একটি জোট গঠনের মাধ্যমে রাজ্যগুলোর সংযুক্ত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ ছিলো এবং ১৯৪৭ এর বিভক্তির ব্যবস্থা ১৯৩৫ এর এ বিধানের কাছে অনেকটাই ঋণী বলা চলে। পূর্ণ ক্ষমতায়িত শ্রেণির রাজ্যের শাসক চাইলে একটি ‘সংযোজন চুক্তিপত্র’ স্বাক্ষর করতে পারতেন যার মাধ্যমে তিনি তাঁর তিনটি প্রধান শক্তি – প্রতিরক্ষা, বহিঃ বিষয়ক ও যোগাযোগ – সহ উপযুক্ত আধিপত্যের অধীনে স্থানান্তরিত হতে পারতেন। দ্বিতীয় শ্রেণির রাজ্যগুলোর জন্য পৃথক অন্য একটি সংযোজন চুক্তির ব্যবস্থা করা হয়েছিলো যেখানে এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয় যে, এ রাজ্যগুলো প্রস্থানকারী বৃটিশ ক্ষমতা দ্বারা অধিকৃত নয়। এ চুক্তিটি অবশ্য ব্যবহার করা হয়নি। তৃতীয় শ্রেণির রাজ্যগুলো মূলতঃ কোন সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়নি, এগুলো খুব সহজেই আত্মীকরণ করা হয়েছিলো। ১৯৪৭ এর শর্ত মোতাবেক একটি রাজ্যের পক্ষে এক বা উভয় শাসনব্যবস্থার সাথে স্বেচ্ছায় সংযোজন কিংবা অমীমাংসিত সুনির্দিষ্ট শর্তসহ সংযোজন দু’টাই সম্ভব ছিলো; একে বলা হতো ‘স্থায়ী চুক্তি’ বা ‘স্থিতাবস্থা চুক্তি’। এ ধরনের চুক্তি অত্যাবশ্যকীয় বিভিন্ন সেবা চালিয়ে যাওয়াকে অনুমোদন করলেও বর্তমান প্রেক্ষিতে এর সাংবিধানিক ভিত্তি সুদৃঢ় নয়। অধিকতর টেকসই প্রশাসনিক কাঠামো তৈরিতে ১৯৪৭ সালে কোন একটি শাসনব্যবস্থার সাথে সংযুক্তির পূর্বে, দুই বা ততোধিক রাজ্যের সম্মত জোট তৈরির কৌশলও তৈরি করা হয়েছিলো। বাস্তবে ভারতীয় এলাকাভুক্ত সমস্ত রাজ্যই হয় কোন প্রদেশের সাথে যুক্ত হয়েছিলো অথবা সংযুক্তির মাধ্যমে একটি বৃহত্তর রাজ্য গঠন করেছিলো (যেমন, উদাহরণস্বরূপ পাতিয়ালা ও পূর্ব পাঞ্জাব জোট রাজ্যের কথা বলা যায়)। অন্যদিকে মিসৌরী, হায়দ্রাবাদ এবং জম্মু ও কাশ্মীর এর ব্যতিক্রম, যেগুলো ভারতীয় জোট কম বেশী তাদের মূল ভূখণ্ডের আকারে গ্রহণ করেছিলো। এক্ষেত্রে একমাত্র মিসৌরী কোন ধরনের সংঘর্ষ ছাড়াই এ জোটে যোগ দিয়েছিলো; অপরদিকে ভারতীয় তত্ত্বের জম্মু ও কাশ্মীরের ভৌগলিক আকার আজ পর্যন্ত বাস্তব পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে ওঠেনি।

রাজকীয় রাজ্যগুলোর পুরো পদ্ধতি বৃটিশ ভারতীয় সাম্রাজ্যের একটি অত্যন্ত অদ্ভুত বিষয় ছিলো যেটা ঊনিশ শতকের শেষার্ধ ও বিংশ শতকের প্রথম কয়েক দশকে বিকশিত হয়েছিলো। বৃটিশ রাজকীয় শাসনযন্ত্রের সত্যিকার অর্থেই চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে নিজ সরকার চালিত প্রতিনিধি-প্রতিষ্ঠান সৃষ্টির ইচ্ছা ছিলো যেটা সময়ের প্রেক্ষিতে নিষ্ক্রিয় বলে প্রতীয়মান হয়েছে। একই সময়ে রাজকীয় রাজ্যগুলোতে অযৌক্তিক স্বৈরতান্ত্রিক রাজনীতি চিরস্থায়ী করার, এমন কি সংরক্ষিত করার ব্যবস্থাও হচ্ছিলো যেটা বৃটিশ ভারতীয় শাসনযন্ত্রের মননের সাথে যায় না। মূল বিষয় যেটা ছিলো সেটা হচ্ছে ১৮৫৭ সালের ক্রান্তিকাল যেটাকে বৃটিশ ইতিহাসে ‘ভারতীয় বিদ্রোহ’ নামে চিহ্নিত করা হয়েছে, তার কয়েক বছর আগে থেকেই ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নীতিই ছিলো রাজকীয় রাজ্যগুলোকে সরাসরি বৃটিশ শাসনের আওতায় একটি ভূখণ্ডে নিয়ে আসা। তবে ১৮৫৭ সালের ঘটনাগুলো বৃটিশদের দুটো বিষয় প্রমাণস্বরূপ বুঝিয়ে দিয়েছিলো – এক, রাজন্যবর্গের বিষয়ে অতিরিক্ত অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ করা বিপজ্জনক এবং দুই, যখন রাজন্যবর্গের একটি অংশ বিদ্রোহ করেন, অপর অংশ করেন না তখন ভারতীয় সাম্রাজ্যের টেকসইতার বিষয়ে তাঁদের আনুগত্যের প্রভাব ব্যাপক। মুসলিম বা অমুসলিম যা-ই হোক না কেন বৃটিশ শাসনের অধীনে ক্ষুদ্র রাজ্য হিসেবে রাজকীয় রাজ্যগুলো থাকার এই ধারণা ভারতীয় জাতীয়তাবাদের কাছে মোটেই আদরনীয় ছিলো না। স্বাধীনতা উপভোগকারী অনেক শাসকই সে সময় এ বিষয়টি হৃদয়ঙ্গম করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন এবং যার ফল হিসেবে তাঁরা ভারত ও পাকিস্তান উভয়ের মধ্যে গিয়েই বিপর্যস্ত হয়েছিলেন।

বাস্তবে ১৯৪৭ এ রাজকীয় রাজ্যগুলোর অধিকাংশ স্বাভাবিকভাবেই নতুন সার্বভৌম শাসনব্যবস্থা দু’টির কোন একটির অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলো এবং ১৫ আগস্ট ১৯৪৭ এ বৃটিশদের কাছ থেকে নতুন অংশে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হওয়ার আগেই ভারতীয় অংশের মধ্যবর্তী প্রায় সবগুলো রাজ্যই ভারতের সাথে একীভূত হয়েছিলো। ঐদিন পর্যন্ত প্রকৃতপক্ষে তিনটি রাজ্য ভারতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সম্ভাব্যতা থাকা সত্ত্বেও ভারতের বাইরে অবস্থান করছিলো। এগুলো হচ্ছে – পশ্চিম ভারতে কাথিয়াওয়ার-এর জুনাগধ নামে ছোট একটি রাজ্য যার মুসলিম শাসক রাজ্যের ৮০% হিন্দু জনগণ নিয়ে পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হতে আগ্রহী ছিলেন; দক্ষিণাত্যের হায়দ্রাবাদ যার মুসলিম শাসক হিন্দু আধিপত্যশালী জনগণ নিয়ে ভারত ও পাকিস্তান থেকে স্বাধীন থাকতে চেয়েছিলেন; এবং উত্তর-পশ্চিমের জম্মু ও কাশ্মীর। দিনশেষে তিনটি রাজ্যই ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলো। এক্ষেত্রে জুনাগধকে একটি চাপিয়ে দেয়া গণভোটের মাধ্যমে ভারত নিজের ভূখণ্ডে অন্তর্ভুক্ত করেছিলো যে গণভোটের বৈধতা পাকিস্তান কখনোই মেনে নেয়নি। হায়দ্রাবাদ ভারতীয় বাহিনী দ্বারা দখল হয়েছিলো এবং জম্মু ও কাশ্মীরের তাত্ত্বিকভাবে পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও রাজ্যের মুসলিম আধিপত্য ও হিন্দু মহারাজা সামরিক, রাজনৈতিক ও কুটনীতিক বিতর্কের শিকার হয়েছিলো যেটা এখন পর্যন্ত বিদ্যমান।

দেশ বিভাগের প্রাক্কালে ভারতীয় পক্ষ থেকে রাজ্য অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে যেমনটা জোর পরিলক্ষিত হয়েছে পাকিস্তানের নেতৃস্থানীয় অবস্থান থেকে এক্ষেত্রে তেমন কোন অংশগ্রহণ ছিলো। জম্মু ও কাশ্মীর বাদে পশ্চিম পাকিস্তান অংশে সুস্পষ্টভাবে দশটি রাজকীয় রাজ্যের অবস্থান ছিলো – ভাওয়ালপুর, খায়েরপুর, কালাত, লাস বেলা, খারান, মাক্রান, দির, স্বাত, অ্যাম্ব এবং চিত্রাল। এর কোনটাই ১৫ আগস্ট ১৯৪৭ পর্যন্ত পাকিস্তানের সাথে একীভূত হয়নি যদিও মার্চ ১৯৪৮ পর্যন্ত এটি পাকিস্তান অংশের মধ্যেই ছিলো।

জম্মু ও কাশ্মীর এবং হায়দ্রাবাদ ছিলো রাজকীয় রাজ্যগুলোর মধ্যে বিশালাকৃতির, প্রতিটি প্রায় ৮০,০০০ বর্গমাইলের বেশি আয়তন বিশিষ্ট এবং এ হিসেবে এর আকার যুক্তরাজ্যের সাথে তুলনীয়। প্রত্যেকটির জনসংখ্যাও ছিলো তুলনামূলকভাবে বেশি – জম্মু ও কাশ্মীরের জনসংখ্যা ছিলো প্রায় ৪০,০০,০০০ এবং হায়দ্রাবাদের ১,৪০,০০,০০০ এর কম নয়। এ ধরনেরই অন্য রাজ্য ছিলো ৭০,০০০ বর্গমাইল আয়তনের কালাত (যেটা পাকিস্তানভুক্ত হয়েছিলো); এবং প্রায় একই পরিমাণ জনসংখ্যার আরো ছিলো মিসৌরী (জনসংখ্যা প্রায় ৬৫,০০,০০০) এবং ত্রাভানকোর (জনসংখ্যা প্রায় ৫০,০০,০০০); উভয়ই ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলো।

জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক থেকে অন্যান্য রাজকীয় রাজ্য থেকে ভিন্ন ছিলো। এর ভৌগলিক অবস্থান এমন চমৎকার ছিলো যে তাত্ত্বিক বিচারে ভবিষ্যতের জন্য হলেও এটা পছন্দের অধিক কিছু ছিলো। এর সীমান্ত ছিলো তিব্বতের সাথে, চীনের সিনকিয়াং প্রদেশের সাথে এবং আফগানিস্তানের সাথে (এটা নিয়ে অবশ্য কারো কারো দ্বিমত থাকতে পারে)। এটা প্রকৃতপক্ষে সোভিয়েট ইউনিয়নেরও খুব কাছাকাছি ছিলো যা শুধুমাত্র আফগান ভূখণ্ডের সরু অঞ্চল ওয়াকান এবং টাঘদুম্বাশ পামীরে সিনকিয়াং-এর ছোট্ট অংশ দ্বারা পৃথক হয়ে ছিলো। পুরনো বৃটিশ ভারতীয় সাম্রাজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ জম্মু ও কাশ্মীরের বহির্জগতের সাথে এমন বিবিধ সংযোগের অবস্থান অন্ততঃ তাত্ত্বিকভাবে হলেও ১৫ আগস্ট ১৯৪৭-এর পর এর স্বাধীনতার ধারণাটিকে আকর্ষণীয় করে তোলার একটি কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

১২ মে ১৯৪৬ এ বৃটিশ প্রতিনিধির উল্লিখিত বিধি মোতাবেক জম্মু ও কাশ্মীরের মহারাজা স্যার হরি সিং তাঁর তিন চতুর্থাংশের বেশি মুসলিম জনতা থাকা সত্ত্বেও ভারত ও পাকিস্তান এর যে কোনটির সাথে একীভূত হতে পারতেন, যা এ দুটো নতুন কর্তৃত্বকেই বেশ খানিকটা উদ্বিগ্ন করে তুলেছিলো। জম্মু ও কাশ্মীরের ভৌগলিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ ভারতের তুলনায় পাকিস্তানের সাথে অধিকতর ভালো ছিলো; বিশেষ করে প্রকৃত দেশ বিভাগ প্রক্রিয়া বিবেচনায় পাঞ্জাবের মুসলিম আধিপত্যশালী গুরুদাসপুর জেলার পাকিস্তানে অন্তুর্ভুক্তির বিষয়টি বলা যায়। পাকিস্তানী গুরুদাসপুর বলতে যেটা বোঝানো হতো সেটা ভারতীয় ভূমির এক অংশ সরাসরি রাজ্যে একীভূত হয়েছিলো যেটা কোনভাবেই আদর্শিক ছিলো না কেন না এর কিছু অংশ গুরুদাসপুর জেলার সীমা বহির্ভূতও ছিলো। গুরুদাসপুরের প্রবেশ পথ ছিলো হয় সরাসরি জম্মুর মধ্যে দিয়ে অথবা গুরুদাসপুরের পাঠানকোট সাবডিস্ট্রিক্ট হয়ে হিমালয়ের পাদদেশের চরম কঠিন পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে পাঞ্জাবের কাংরা জেলার মধ্য দিয়ে। পাঠানকোট সাবডিস্ট্রিক্ট ছিলো ছোট্ট একটি হিন্দু আধিপত্যশালী এলাকা যেটা কি না ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলো এবং এ সম্পূর্ণ এলাকাটিতে নতুন রাস্তা নির্মাণের প্রয়োজন ছিলো যেটা প্রস্তুতিতে বেশ সময়ের প্রয়োজন। বিমান যোগাযোগ সে সময় গুরুত্বপূর্ণ ছিলো না যদিও খুব অল্প সময় পরেই তা গুরুত্ব পেয়েছিলো। এ সব কারণেই তত্ত্বের বাইরে বাস্তবে জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের অদৃষ্টের সাথে গুরুদাসপুর জেলার অদৃষ্টও অচ্ছেদ্য বন্ধনে আটকা পড়ে যায়।

জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্য ছিলো ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি ডগরা গোত্রপ্রধান গুলাব সিং এর সৃষ্টি। ডগরা ছিলো পাহাড়ি রাজপুত গোত্র যাদেরকে জম্মু ও প্রতিবেশী কাংরা জেলায় দেখা যেতো। গুলাব সিং পাঞ্জাবের মহান শিখ সম্রাট রঞ্জিত সিং-এর কৃপা লাভ করেছিলেন, যিনি লাহোরে সাম্রাজ্যের রাজধানী স্থাপন করেছিলেন। ১৮২০ সালে গুলাব সিং-কে রঞ্জিত সিং জম্মু রাজ্যের রাজা হিসেবে ঘোষণা করেন এবং এর উপর ভিত্তি করে গুলাব সিং দ্রুত তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তারে  মনোনিবেশ করেন। এর অংশ হিসেবে তিনি ১৮৩০ এ তিব্বতের সাথে শ্রদ্ধাশীল সম্পর্কের খাতিরে জাতিগত ভাবে তিব্বতীয় ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠীর ভূমি লাদাখ জয় করেন এবং পরবর্তীতে ১৮৪০ এ বালতিস্তান জয় করেন যাকে ঊনবিংশ শতকের পর্যটকেরা ‘ছোট তিব্বত’ নামে অভিহিত করতেন। ১৮৪১ এ গুলাব সিং মূল তিব্বত অংশে একটি বিপর্যস্ত সামরিক অভিযানে অংশ গ্রহণ করেন। সে সময় তিব্বতের ঐ এলাকা চীনের মাঞ্চু রাজবংশের প্রভাবশালী অংশ ছিলো এবং গুলাব সিং-এর এ বিপর্যয়কারী সামরিক অভিযানই তাঁর প্রাচ্যের অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দেয়।

যে সময়ে গুলাব সিং রঞ্জিত সিং থেকে জম্মুর অধিকার লাভ করেন ঠিক সে সময়েই গুলাব সিং-এর অনুজ ধ্যান সিং-কে শিখ সম্রাট পুঁচ-এর ছোট একটি জেলার জায়গীর নিয়োগ করেন। পুঁচ ঝিলাম নদীর পূর্ব প্রান্তের একটি সরু অঞ্চল যেটা ঝিলাম নদী ও পির পাঞ্জাল রেঞ্জের মধ্যে সরু অংশে রূপ নিয়েছিলো; আর পির পাঞ্জালের পিছনেই ছিলো কাশ্মীর উপত্যকা। সে হিসেবে পুঁচ নিজ গুনেই একটি আলাদা রাজ্য হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলো এবং গুলাব সিং-এর জম্মু থেকে সম্পূর্ণ পৃথক অবস্থানে ছিলো। পুঁচ-এর মুসলিম জনতা ডগরা শাসনকে সহজ ভাবে নিয়ে পারেনি। ফলে ১৮৩০ এ বেশ কিছু ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন রক্তক্ষয়ী বিদ্রোহ দেখা দিয়েছিলো যেগুলো ডগরা রাজার সামরিক ক্ষমতাকে খুব মারাত্মকভাবেই পরীক্ষায় ফেলে দিয়েছিলো।

১৮৪৬ এ প্রথম বৃটিশ-শিখ যুদ্ধে নিরপেক্ষ অবস্থানের কারণে গুলাব সিং বৃটিশ কর্তৃত্ব কর্তৃক কাশ্মীর উপত্যকার উপর অধিকার লাভ করেছিলেন। এটা শিখরা আফগান শাসকদের থেকে ১৮১৯ সালে জয় করেছিলেন। ১৮৪৬ সালে শিখরা এটা ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু গভর্নর জেনারেল স্যার হেনরি হার্ডিঞ্জ যথেষ্টভাবে বিস্তৃত বৃটিশ শাসনকে আরো নতুন ক্ষেত্রে বিস্তার লাভ করাতে অনিচ্ছুক থাকায় এটা তাৎক্ষণিকভাবে জম্মুর শাসকের কাছে হস্তান্তর করেন। কাশ্মীর হস্তান্তর করা হয়েছিলো ১৮৪৬ সালের ১৬ মার্চে ‘অমৃতসর চুক্তি’র মাধ্যমে যেটা ছিলো ৭৫,০০,০০০ রুপির (প্রায় ৫,০০,০০০ বৃটিশ পাউন্ড) বিক্রয় চুক্তি। সে সময় স্থানীয় জনতা গুলাব সিং-কে সাদরে অভ্যর্থনা জানায়নি এবং নতুন এ ভূখণ্ডে বৃটিশ সামরিক শক্তির সহায়তায় নিজের আধিপত্য লাভ করতে গুলাব সিং-এর প্রায় দুই বছর সময় লেগেছিলো। প্রতিপক্ষের বেশ কিছু লোককে গুলাব সিং তাঁর অনেকগুলো পছন্দের শাস্তির মধ্যে একটি – জীবিত অবস্থায় চামড়া তুলে নিয়ে শাস্তি দিয়েছিলেন। গুলাব সিং-কে রাজকার্যের বাইরে একজন উল্লাসমুখর সঙ্গী হিসেবে দেখে অনেকে বিস্মিত হলেও তৎকালীন বৃটিশ পর্যবেক্ষকরা গুলাব সিং-কে মোটেও দয়ালু হিসেবে বিবেচনা করেননি।

কাশ্মীরের ইতিহাস যারা লিখতে বসেন তাদের মনে সচরাচর শুধুমাত্র কাশ্মীর উপত্যকাই থাকে এবং এর অন্যান্য অংশকে ভুলেই যান যেগুলো স্তুপীকৃত হয়ে বর্তমানে জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্য গঠন করেছে। জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্য বলতে যেটা বোঝায় তার মাত্র ১০% এর কম এলাকা নিয়ে কাশ্মীর উপত্যকা গঠিত হলেও শুধুমাত্র কাশ্মীর উপত্যকাকে গুরুত্ব দেয়ার স্বাভাবিক কারণ রয়েছে। ১৯৪৭ এ রাজ্যের অর্ধেকের বেশি জনসংখ্যা ছিলো কাশ্মীর প্রদেশে অর্থাৎ কাশ্মীর উপত্যকায় এবং রাজ্যের মূল সম্পদ এখান থেকেই (অথবা, ১৯৪৭ এর পর যে অংশ ভারতের অংশে ছিলো সেখান থেকে) আরোহিত হতো। কাশ্মীর উপত্যকা ছিলো ভারতীয় সমতল ভূমির তাপ থেকে মুক্তির এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্র। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষাংশ পর্যন্ত এটি ছিলো কাশ্মীর শাল শিল্পের বুৎপত্তিস্থল যেখানে পশ্চিম তিব্বতের পাহাড়ি ভেড়ার পশম থেকে পাওয়া উল থেকে নান্দনিক পশমী শাল বোনা হতো। ১৮৭০ এ এই শাল শিল্প দুর্ভিক্ষ দ্বারা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় যার কারণে তাঁতীরা বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েন; কিন্তু সাম্প্রতিককালে এলাকাটিতে কার্পেট ও সিল্ক বুননের শিল্প নতুন করে ছড়িয়ে পড়েছে। ধান ও ফল উৎপাদনের জন্য কাশ্মীর উপত্যকা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৃষি কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিলো। উপরন্তু, কাশ্মীর উপত্যকা রাজ্যের আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প, কাঠ শিল্পেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতো। ১৯৪৭ এর আগে জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের প্রচুর পরিমাণ রপ্তানিকারক পণ্য কাশ্মীর উপত্যকা থেকে নীচে ঝিলাম উপত্যকা হয়ে পাঞ্জাবের যে অংশ ১৯৪৭ এ পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয় সেখানে প্রবেশ করতো।

উত্তর ভারতের প্রাচীন বৌদ্ধ ও হিন্দু সভ্যতার বেশির ভাগ পর্যায়ে কাশ্মীর উপত্যকার উপর এ সভ্যতাগুলোর প্রভাব ছিলো। নবম শতকে এ এলাকাটিকে মনে করা হতো হিন্দু সভ্যতার একটি প্রধান কেন্দ্র। দ্বাদশ শতকে কাশ্মীর, ঐতিহাসিক কালহানা কর্তৃক ‘রাজাতরঙ্গিনী’ (অর্থাৎ ‘নদীরাজ’ বা ‘নদ-নদীর রাজা’) শিরোনামের একটি দলিলের জন্ম দিয়েছিলো। ‘রাজাতরঙ্গিনী’ ছিলো খুবই ছোট আকৃতির একটি সত্য ইতিহাস প্রকৃতির লেখা যা ভারতের প্রাক-ইসলামিক যুগ থেকে টিকে ছিলো। কাশ্মীর উপত্যকায় চতুর্দশ শতাব্দীতে ১৩৩৯ সালে শাহ মীর নামক এক ব্যক্তি কর্তৃক ইসলামিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো যিনি সুলতান শামসুদ্দিন নামে রাজত্ব করেছিলেন। শাহ মীর রাজত্বকালে বহু সংখ্যক ধর্মপ্রচারক কাশ্মীর ভ্রমণ করেন। এমনই একজন হচ্ছেন পারস্যের মীর সৈয়দ আলী হামাদানী (যিনি শাহ-ই-হামাদান নামেও পরিচিত ছিলেন) যিনি কাশ্মীর উপত্যকার লোকজনের মাঝে ইসলামের আধিপত্যকে সুসংহত করেন। ১৫৮৬ সালে মুঘল সম্রাট আকবর কাশ্মীরকে তার কর্তৃত্বে নিয়ে আসেন এবং তখন থেকে এটি উত্তরসুরী মুঘল শাসকদের গ্রীষ্মকালীন অবকাশ কেন্দ্র হিসেবে পরিণত হয়। ১৭৫২ সালে মুঘল ক্ষমতা পতনের সাথে সাথে কাশ্মীর উপত্যকা আফগান সেনাপতি আহমদ শাহ্ দূররানীর নিয়ন্ত্রণে আসে। রঞ্জিত সিং-এর অধীনে শিখদের দ্বারা ১৮১৯ সালে এটা আফগানদের কবল থেকে মুক্ত হয়।

কাশ্মীর উপত্যকা ডগরাদের দ্বারা দখলের এবং নতুন রাজ্য জম্মু ও কাশ্মীর সৃষ্টির কয়েক বছর পর গুলাব সিং ও তাঁর উত্তরসূরীরা তাঁদের প্রভাব উত্তর-পশ্চিমে – ঊনিশ শতকের শেষের দিকে বৃটিশরা দারদিস্তান বলতে যে এলাকা বোঝাতো – সে পর্যন্ত বিস্তার লাভ করান। দারদিস্তান গঠিত হয়েছিলো গিলগিট, হুনজা, নাগর ও চীনের সিনকিয়াং ও আফগানিস্তানের গা ঘেঁষা এলাকাগুলো নিয়ে যা আজকের দিনে ভারত-পাকিস্তান বিরোধে উত্তরাঞ্চল হিসেবে পরিচিত। এ প্রক্রিয়ার ইতিহাস এবং ভারতের বৃটিশ সরকারের নীতির কারণে এর যে ফলাফল তা তৃতীয় ও চতুর্থ অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।

ঠিক এভাবেই জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্য গুরুত্বপূর্ণ জটিলতায় সন্নিবেশিত হয়েছিলো। ভারতীয় ইতিহাস পরিবর্তনে এটি ছিলো কোন ধরনের পূর্ব নিদর্শন ছাড়াই এক নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা। মূল কেন্দ্রস্থল জম্মু ছিলো পূর্ব থেকেই হিন্দু ও শিখ জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত এবং ডগরা দ্বারা শাসিত যারা নিজেদের পূর্বপুরুষ রাজপুত বলে দাবি করতো; যদিও জম্মুর দূরবর্তী জেলাগুলো ছিলো ১৯৪৭ পর্যন্ত ছোট মুসলিম প্রাধান্যবিশিষ্ট, পরবর্তীতে যেটা মিরপুর (বর্তমানে অধিকাংশই ভারতীয় নিয়ন্ত্রণমুক্ত আজাদ কাশ্মীর নামে পরিচিত) ও রিয়াসাই জেলায় কেন্দ্রীভূত হয়। ১৯৪১ এ জম্মু প্রদেশের মোট জনসংখ্যা ছিলো ১৫,৬১,৫৮০। আর কাশ্মীর অর্থাৎ কাশ্মীর উপত্যকা যার রাজধানী শ্রীনগর তা ছিলো মুসলিম অধ্যুষিত যদিও সেখানে কিছু কট্টর সংখ্যালঘিষ্ঠ প্রভাবশালী কাশ্মীরি ব্রাহ্মণ ও পন্ডিতের দল ছিলো। এ ধরনের গোষ্ঠীভুক্ত পরিবার থেকেই জওহরলাল নেহেরু এবং ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্বের (যেমন, স্যার তেজ বাহাদুর সপ্রু) আবির্ভাব ঘটে। কাশ্মীর উপত্যকায় ১৯৪১ সালে মোট অধিবাসী ছিলো ১৭,২৮,৬০০ যার মধ্যে ১৬,১৫,৫০০ (প্রায় ৯০%) ছিলো মুসলিম। জম্মুর সাথে ঐতিহ্যগত ভাবে কোন সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও কাশ্মীর উপত্যকার মুসলিমদের নিজস্ব সভ্যতা অত্যন্ত উঁচু মানের ছিলো যেটা শুধু যে ঐ অঞ্চলের অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ইসলামিক ধরনের কারণে তা নয়, ঐ এলাকার স্বাতন্ত্রপূর্ণ ভাষার কারণেও। কাশ্মীরি ভাষাকে দার্দীয় ভাষা পরিবারের অংশ বলে বিবেচনা করা হয় যেটা এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা মতে আসলে ‘আর্য’ কিন্তু ‘ইরানী’ বা ‘ইন্দো-আর্য’ কোনটাই নয়; এবং উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের পাহাড়গুলোতে একটি অনন্য ভাষা। কাশ্মীরি মুসলিমদের অধিকাংশই নিজেদের সুন্নি মতাবলম্বী বলে দাবি করতো যদিও সেখানে আহমদিয়া গোষ্ঠীর (যাকে অনেকেই মুসলিম বলেই স্বীকার করে না) পাশাপাশি কিছু সংখ্যক – খুব সম্ভব ৫% এর মতো – শিয়া মতাবলম্বীদেরও অস্তিত্ব ছিলো। শিয়াদের সাথে সুন্নিদের সম্পর্ক সাধারণ ভাবে সৌহার্দ্যপূর্ণ ছিলো, কিন্তু ১৮৭২ এ শ্রীনগরে চরম ব্যতিক্রমী শিয়া-সুন্নি দাঙ্গার পর এটা ভয়াবহ হতে পারতো।

লাদাখের বিচ্ছিন্ন জনগণ ছিলো পুরোপুরিই প্রায় তিব্বতীয় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। বালতিস্তান, যার রাজধানী স্কারদু, ছিলো মুসলিমদের দখলে; যারা জাতিগতভাবে তিব্বতের সংশ্লিষ্ট কিন্তু ধর্মীয় দিক থেকে ইসলামের ১২ ইমামের শিয়া অনুসারী। বালতিস্তান ও লাদাখ-কে সাধারণত একটি ঘনিষ্ঠ প্রশাসনিক একক হিসেবে বিবেচনা করা হতো; ১৯৪১ সালে যার মোট জনসংখ্যা ছিলো প্রায় ২,০০,০০০ যার মধ্যে শুধু লাদাখে ছিলো ৪০,০০০।

১৯৪১ এ হুনজা, নাগর, গিরগিট, চিলাস, এস্টর, ইয়াসিন ও ইক্ষুমান এবং দারদিস্তান এর অবশিষ্ট অংশে স্বল্প পরিমাণে প্রায় ১,০০,০০০ লোকের বসবাস ছিলো। তারাও মুসলিম ধর্মাবলম্বী ছিলো যাদের একটি বড় অংশ ছিলো ১২ ইমামের শিয়া অনুসারী যদিও হুনজার অধিকাংশ লোকই ছিলো ইসমাইলী শ্রেণিভুক্ত অর্থাৎ আগা খানের নেতৃত্বাধীন ইসলামিক শ্রেণিভুক্ত। কাশ্মীর উপত্যকার জনগণের মতো যদিও তারা দার্দিক ভাষা পরিবারভুক্ত ভাষায় কথা বলতো কিন্তু কাশ্মীর উপত্যকার সভ্যতার সাথে তাদের সম্পর্ক ছিলো একেবারেই নগন্য।

জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্য পুরোপুরিই পার্বত্য এলাকা। রাজ্যের উত্তরাঞ্চল বড় বড় পাহাড়ি এলাকার মধ্যে দিয়ে চলে গিয়েছে যা পশ্চিমে পামির ও হিন্দুকুশ এবং পূর্বে হিমালয়ের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেছে। বালতিস্তানের কারাকোরামে ২৮,০০০ ফুটের চেয়েও বেশি উচ্চতাবিশিষ্ট পৃথিবীর দ্বিতীয় পর্বত শৃঙ্গ (মাউন্ট গডউইন অস্টিন) অবস্থিত এবং ২৫,০০০ ফুটের চেয়ে বেশি উচ্চতাবিশিষ্ট আরো বেশ কিছু পবর্ত শৃঙ্গ এ রাজ্যের অংশ। লাদাখ তিব্বতীয় উঁচু মালভূমির একটি প্রান্ত ছুঁয়ে আছে যা পূর্বে হাজার মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত, বর্তমানে চীনের অংশ।১০ রাজ্যের দক্ষিণ-পূর্ব কোনা অতিক্রম করলে দেখা পাওয়া যায় পির পাঞ্জল পাহাড়ি অঞ্চল যা একই সারিতে অবস্থিত হিমালয় অথবা কারাকোরাম থেকে নীচু হলেও বন্ধুর; এটা কাশ্মীর উপত্যকাকে জম্মু ও পুঁচ উভয় থেকে পৃথক করেছে।

জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের মধ্য দিয়ে পূর্ব থেকে পশ্চিমে চরম বাঁক নিয়ে বয়ে গেছে ইন্দু নদী যা পশ্চিমের তিব্বত থেকে সৃষ্টি হয়ে পাকিস্তানের সিন্ধুতে গিয়ে মিলেছে। ইন্দুর একটি উল্লেখযোগ্য শাখা নদী হচ্ছে ঝিলাম যার উৎস এই রাজ্যে এবং এর বেশ কিছু অংশ কাশ্মীর উপত্যকার জীবনযাত্রার মূল ভিত্তি। ইন্দুর আরো একটি শাখা নদী হচ্ছে চেনাব যেটা রাজ্যের একেবারে দক্ষিণ কোনা দিয়ে বয়ে চলেছে; এটি ভারতীয় উৎস লাহুল থেকে পাকিস্তানের পাঞ্জাবের সমতলে গিয়ে পড়েছে। অর্থাৎ পাঞ্জাব (যার সাধারণ শাব্দিক অর্থ ‘পঞ্চনদী’)-এর পাঁচটি নদীর তিনটিই সৃষ্টি হয়েছে হয় জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যে অথবা রাজ্যের পাহাড়ের গা ঘেঁষে (এবং চতুর্থ নদী রাভি গুরুদাসপুর জেলায় জম্মু ও পাঞ্জাবের সীমানা নির্দেশ করছে)। ফলে পাঞ্জাব ও সিন্ধুর কৃষি পাহাড়ি বরফ গলার উপর অনেকাংশেই নির্ভর করে।

প্রধান কাশ্মীরি নদীতটগুলো বর্তমানে পাকিস্তানের অর্থনীতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং কিছু দিন আগে পর্যন্তও এটি বাইরের বিশ্বের সাথে রাজ্যের যোগাযোগের প্রধান উপায় ছিলো। শ্রীনগরের সড়ক রাওয়ালপিন্ডি থেকে শুরু হয়ে ঝিলাম নদীর পথ অনুসরণ করে কাশ্মীর উপত্যকায় গিয়ে মিশেছে। ইন্দুর উপরের অংশ পাহাড়ি রাজ্য গিলগিট অঞ্চলে প্রবেশ করেছে। যে নদীতটগুলো পাঞ্জাবের পশ্চিম অংশ ও কাশ্মীরের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করেছে সেগুলো পাঞ্জাবের পূর্ব অংশ ও কাশ্মীরের মধ্যে যোগাযোগকে অত্যন্ত কঠিন করে ফেলেছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের ভেতরের একমাত্র রাস্তা যেটা রাজ্যের শীতকালীন রাজধানী জম্মুর সাথে গ্রীষ্মকালীন রাজধানী শ্রীনগরকে সংযুক্ত করেছে সেটা বানিহাল পাস হয়ে পির পাঞ্জাল পাহাড় অতিক্রম করেছে প্রায় ৯,০০০ ফুট উপর দিয়ে এবং যেটা শীতকালে বরফাচ্ছাদিত হয়ে থাকে।১১ জম্মু ও শ্রীনগরের সবচেয়ে সহজ রাস্তা হলো শিয়ালকোট হয়ে পাকিস্তানভুক্ত পশ্চিম পাঞ্জাব ও রাওয়ালপিন্ডির মধ্য দিয়ে। ১৯৪৭ এ দেশ বিভাগের সময় পাঠানকোট হয়ে ভারত থেকে জম্মুর আরো একটি রাস্তা ছিলো যার অবস্থা ছিলো চরম খারাপ এবং অনেকাংশই ছিলো অজানা। ১৯৪৭ এ রাজ্যের একমাত্র রেল যোগাযোগ ছিলো ছোট্ট একটি শাখা যা ১৮৯০ সালে চালু হয়েছিলো; এটা পাঞ্জাবের শিয়ালকোটকে জম্মু শহরের সাথে সংযুক্ত করেছিলো। আর দেশ বিভাগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পাঞ্জাবের শিয়ালকোট গিয়ে পড়েছিলো পাকিস্তান অংশে।

কাশ্মীরের জনসংখ্যা, অর্থনীতি এবং ভৌগলিক অবস্থানের এই সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা কাশ্মীরের পাকিস্তানভুক্ত হওয়ার মূল ক্ষেত্রগুলোকে তুলে ধরে। এই সারমর্ম এক অর্থে কিছুই না, কেন না ১৯৪৭ এ ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় কী হতে পারতো বা হতে পারতো না তা এ বিষয়গুলোর উপর নির্ভরশীল ছিলো না; রাজ্যের অদৃষ্ট নিয়ন্ত্রণে বৃটিশ রাজের কাছে দুই উত্তরসূরীর প্রকৃত দ্বন্দ্বই শুরু হয় ১৯৪৭ এ ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় যা আরো আগে ডগরা মহারাজারা সৃষ্টি করেছিলেন।

প্রথমত, জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্য ছিলো একটি অতি মাত্রায় মুসলিম আধিপত্যশালী অঞ্চল যেটা পাকিস্তানের অংশ হওয়া মুসলিম আধিপত্যশালী পাঞ্জাবের গা ঘেঁষে অবস্থিত।

দ্বিতীয়ত, জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের অর্থনীতি সে অংশের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত ছিলো যেটা পাকিস্তান হতে যাচ্ছিলো। বহির্বিশ্বের সাথে এর সবচেয়ে ভালো যোগাযোগ ছিলো পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে এবং ব্যাপক পরিমাণে রপ্তানি যেতো এই রুট ব্যবহার করে।

তৃতীয়ত, ইন্দু, ঝিলাম ও চেনাব সবগুলো নদীর পানি জম্মু ও কাশ্মীর অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতো যা পাকিস্তানের কৃষি উন্নয়নের জন্য অত্যাবশ্যকীয় ছিলো।

ঐ এলাকার ঐতিহ্য ও অর্থনীতির উপর ভিত্তি করে খুব কঠিন নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে এ বিষয়ে ক্ষীণ সন্দেহের অবকাশ থাকে যে সে সময় ১৯৪৭ এ ভারতীয় উপমহাদেশ বিভাজনের যে নকশা তৈরি হয়েছিলো তাতে জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের বেশির ভাগ অংশই পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা ছিলো। আর এটা পুরষ্কার হিসেবে নয় বরং রাজকীয় রাজ্যগুলো এবং তাদের প্রতি বৃটিশদের আচরণ থেকে বিভিন্ন সময় অপরিহার্যভাবে যে ঐতিহাসিক দুর্ঘটনা ঘটেছিলো তার ফলস্বরূপই এমন হওয়া উচিত ছিলো। যেমনটা স্যার ওয়েন ডিক্সন ১৯৫০ এর সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে তাঁর উল্লিখিত প্রতিবেদনে নির্দেশ করেন যে, কাশ্মীর সমস্যার মূল কারণ “খুব সম্ভবত উপমহাদেশের ইতিহাসের একটি আকৃতি দিয়েছে”। ইতিহাসের এর প্রক্রিয়া কী তৈরি করেছে তা উল্লেখ করতে গিয়ে লর্ড বার্ডউড বলেছিলেন, “মধ্য এশিয়ার একটি সীমা নির্দেশক লাইন রাজনৈতিক বিবেচনায় সম্পূর্ণ অবাস্তব একটি এলাকাকে সীমাবদ্ধ করেছে; ভৌগলিক ভাবে কিম্ভূতকিমাকার এ অংশ বলতে যা অনুমান করা হয় সেটা হচ্ছে ঝিলাম নদী পার্শ্ববর্তী উপত্যকা, কাশ্মীর”।১২

এভাবেই উপমহাদেশের একেবারে উত্তর-পশ্চিমের কিছু অসম্পর্কিত এলাকা একটি রাজকীয় রাজ্যে পরিণত হলো। এর ফল হলো বৃটিশ ভারতের অংশ ও ক্ষমতার শ্রেষ্ঠত্বের অংশকে একত্রিত করে একটি একক সমস্যায় পরিণত করা যেটার সমাধানের বিষয়ে বৃটিশরা একদমই প্রস্তুত ছিলো না এবং যার জন্য ভারতীয় সাম্রাজ্যের দু’টি উত্তরসূরী রাজ্য এখন পর্যন্ত সমাধান খুঁজে ফিরছে।

ঊনিশ শতকের শেষের দিকে বৃটিশরা এমন একটা উদ্যোগের কাছাকাছি পৌঁছেছিলো যেটা সফল হলে হয়তো কাশ্মীর সমস্যারই উদ্ভব হওয়া প্রতিরোধ করা যেতো। জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যে ডগরাদের স্বৈরতান্ত্রিক ও স্বেচ্ছাচারী শাসন ভারত সরকারের জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ দুঃশ্চিন্তার কারণ ছিলো – কিছুটা কৌশলগত বিবেচনায় যে বিষয়ে আমরা তৃতীয় ও চতুর্থ অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো এবং কিছুটা জনহিতকর উপাদান বিবেচনায় যে সঙ্কটের বিষয়ে বৃটিশ ভারতীয় সম্রাট উদাসীন ছিলেন।

বৃটিশ পর্যবেক্ষকগণ ১৮৭৭-৭৮ এ কাশ্মীরের মহাদুর্ভিক্ষ নিয়ে বিচলিত ছিলেন; এ সময় অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত কাশ্মীর উপত্যকার ফসল নষ্ট করে ফেলেছিলো। হাজার হাজার লোক না খেয়ে মারা যায় এবং কয়েক মাস যাবৎ পাঞ্জাবের তুলনামূলক উর্বর এলাকার উদ্দেশ্যে দুর্যোগপ্রবন এলাকার শরণার্থীদের রাজ্য ছেড়ে যাওয়ার বিষয়ে মহারাজার সৈন্যরা অনুমতি প্রদান করেনি। অবশেষে কাশ্মীরিরা ১৮৭৮ সালে দলে দলে বৃটিশ ভারতের পথে কাশ্মীর উপত্যকা ত্যাগ করে। এ দলগুলোতে বহু সংখ্যক তাঁতী ছিলো যারা আর কখনও ফিরে যায়নি। ফলে কাশ্মীরি শাল শিল্পের ক্রমহ্রাসমান ধারায় এক অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়। মহারাজা যখন বৃটিশ ভারত থেকে জরুরি শস্য সরবরাহ ক্রয় করে তখন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের জন্য এর অল্প পরিমাণ প্রকৃত অভাবীদের মধ্যে পৌঁছায় এবং এর অধিকাংশই পাঞ্জাবে পুনরায় বিক্রি হয়। ফলে ভারত সম্পর্কিত বৃটিশ মন্ত্রী লর্ড কিম্বার্লী ১৮৮৪ সালে খুব স্বাভাবিকভাবেই এ রকম মন্তব্য করেন, “দুর্ভাগ্যবশতঃ জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্য প্রশাসনের জরুরি পুনর্গঠনের বিষয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। বস্তুতঃ, এ প্রশ্ন আসতে পারে যে, বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় যেখানে দেশের সার্বভৌমত্ব বর্তমান হিন্দু শাসিত পরিবারের কাছে বিশ্বস্ত রয়েছে সেখানে মুসলিম জনতার পক্ষে বৃটিশ সরকারের হস্তক্ষেপে ইতিমধ্যেই যথেষ্ট দেরি হয়ে গিয়েছে কি না।”১৩

এ ক্ষেত্রে বৃটিশরা রাজ্যকে খুব বেশি দূর বিস্তৃত করেনি, তবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পরিবর্তন এনেছিলো। জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্য সৃষ্টিকারী অমৃতসর চুক্তি অনুসারে ১৮৪৯ সালে বৃটিশরা রাজ্যে কোন ধরনের আবাসিক দপ্তর স্থাপন না করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। এক্ষেত্রে মহারাজা ও ভারত সরকারের মধ্যে সম্পর্কের লেনদেন হতো কাশ্মীরে একজন বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত বৃটিশ কর্মকর্তার (Officer on Special Duty-OSD) মাধ্যমে যিনি প্রশাসনিক ক্ষমতা অনুশীলনকারী একজন রাজ প্রতিনিধির তুলনায় গভর্নর জেনারেল বা ভাইসরয়-এর একজন দূত হিসেবে অধিকতর ভূমিকা রাখতেন। নতুন এই নীতিমালার ফলে ১৮৮৫ সালে ‘বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা’, “বৃটিশ সরকারের অধীনস্ত জোটের স্থানীয় রাজ্যগুলোতে নিয়োজিত রাজনৈতিক কর্মকর্তার সম মর্যাদা ও কর্তব্য সহকারে”১৪ কাশ্মীরে ‘বৃটিশ কর্মকর্তা’য় রূপ নেয়। একটি রাজ্য পরিষদের উপর আস্থা রেখে ১৮৮৯ সালে “জনগণ সংক্রান্ত সকল অনাহূত হস্তক্ষেপ থেকে মহারাজা …[প্রতাপ সিং]… কে দূরে রাখার” সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়; মহারাজার ভাইরা এবং কতিপয় নির্বাচিত স্থানীয় কর্মকর্তাকে বৃটিশ চাকরি প্রদান করে পরিষদ গঠন করা হয়। পরিষদ যাবতীয় ক্ষমতার অধিকারী হবে, তবে শর্ত থাকে যে, তারা বৃটিশ কর্মকর্তার সাথে পরামর্শ না করে কোন গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে না এবং বৃটিশ কর্মকর্তা যখন যেভাবে পরামর্শ দিবেন সেভাবে কার্য সম্পাদন করবে।”১৫

এভাবেই সে সময়ের বৃটিশ কর্মকর্তা কর্ণেল আর. প্যারি নিসবেট ভারত সরকারের পক্ষে রাজ্যের বিষয়ে চূড়ান্ত ভাগ্যনিয়ন্তায় পরিণত হন।

১৯০৫ সালে ভাইসরয় লর্ড কার্জন মহারাজার কিছু ক্ষমতা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন; এবং নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া কার্যত ১৯২২ এর মধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছিলো। রাজ্য পরিষদ তখনো বর্তমান থাকলেও ১৯২৫ সালে মহারাজা প্রতাপ সিং-এর মৃত্যুর সময় কর্তৃত্ব উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস করা হয়েছিলো। এরপর সর্বশেষ মহারাজা হরি সিং উত্তরসূরী হিসেবে রাজ্যের দায়িত্ব নেন যেটা তখনও একনায়কতান্ত্রিক ছিলো যদিও গুলাব সিং প্রতিষ্ঠিত রাজত্বের তুলনায় অনেকটাই অনিয়ন্ত্রিত। ১৮৮০ তে যদি বৃটিশ অন্তর্ভুক্তি চলতো যেটা সে সময়ের কয়েকজন আইনপ্রণেতা সমর্থন করেছিলেন তাহলে হয়তো কাশ্মীর বিতর্ক কোনদিনই সৃষ্টি হতো না : সম্পূর্ণ রাজ্য (জম্মু ও লাদাখের সম্ভাব্য ব্যতিক্রমী অংশ সহ) ১৯৪৭ এর দেশ বিভাগের শর্ত মোতাবেক পাকিস্তানের অংশ হতো।

বৃটিশরা ভারত ত্যাগের মাত্র এক দশক আগে জম্মু ও কাশ্মীরের মহারাজা তাঁর কর্তৃত্বাধীনে একটি চূড়ান্ত সংযোজন করেন। গুলাব সিং-এর ভাই ধ্যান সিং-এর কাছে ন্যস্ত পুঁচ হয় নিজস্ব সত্তা নিয়ে কার্যত একটি পৃথক রাজ্য হিসেবে অবস্থান করতো অথবা পাঞ্জাবের অংশ হিসেবে থাকতো। কিন্তু ১৯৩৫-৩৬ এ বৃটিশ ভারতীয় আদালতে দায়ের করা একটি মামলার সাফল্যজনক ফলের কারণে মহারাজা হরি সিং একে নিজের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে সক্ষম হন। এই ছিলো ডগরা রাজবংশের দুই অংশের বিদ্বেষপূর্ণ দীর্ঘ ইতিহাসের সমাপ্তি যেটা ১৯২৫ সালে মহারাজা প্রতাপ সিং কর্তৃক মৃত্যুশয্যায় গৃহীত একটি সিদ্ধান্তে আরো খারাপের দিকে মোড় নেয়। সে সময় মহারাজা প্রতাপ সিং তাঁর উত্তরাধিকার হিসেবে তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র হরি সিং এর পরিবর্তে পুঁচ এর শাসক পরিবার থেকে একজনকে মনোনীত করেন। মহারাজা প্রতাপ সিং-এর কোন পুত্র সন্তান ছিলো না এবং তিনি ভারত ও ইংল্যান্ডে যুবক হরি সিং-এর বিভিন্ন উচ্ছৃংখল আচরণের খবরে খুব একটা খুশি ছিলেন না। প্রতাপ সিং বৃটিশদের ব্যাপারে হতাশ ছিলেন। পুঁচ যখন ১৯৩৫-৩৬ এর দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে জম্মু ও কাশ্মীরের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয় তখন এর মুসলিম অধিবাসীরা (মোট ৪,২০,০০০ জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ৩,৮০,০০০) এ পরিবর্তনে অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন এবং এ রাজ্যের অংশ হওয়ার বিষয়ে নিজেদের কখনোই মেনে নিতে পারেননি। এ মনোভাব পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। ঐতিহ্যগতভাবে পুঁচ এর অধিবাসীদের পির পাঞ্জাল পাহাড়ি এলাকা অতিক্রম করে কাশ্মীর উপত্যকার প্রতিবেশীদের সাথে যোগাযোগ খুবই কম ছিলো, এমন কি জম্মুর সাথে আরো কম; তাদের মূল যোগাযোগ ছিলো ঝিলাম পার হয়ে, বিশেষ করে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের হাজারা জেলার সাথে।১৬

তথ্যসূত্র:

১.  বিস্তারিত V. P. Menon, The Story of the Integration of the Indian States, London 1956, Appendix II দ্রষ্টব্য।

২.  জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের সঠিক আয়তন নিয়ে কিছু বিতর্ক রয়েছে। পাকিস্তানের একটি সরকারি উৎস ১৯৫৪ সালে আয়তন ৮৪,৪৭১ বর্গ মাইল বলে উল্লেখ করে। বৃটিশ ভারতের ১৮৯১ এর শুমারিতে এর আয়তন উল্লেখ করা হয়েছিলো ৮০,৯০০ বর্গ মাইল যেটা ১৯১১ এর শুমারিতে বৃদ্ধি পেয়ে ৮৪,৪৩২ বর্গ মাইল হয় এবং ১৯২১ এর শুমারিতে এটা আর একটু সংকুচিত হয়ে ৮৪,২৫৮ বর্গ মাইলে এসে দাঁড়ায়। ১৯৬১ সালে ভারত সরকার ইঙ্গিত দেয় যে, জম্মু ও কাশ্মীরের আয়তনের পূর্বের হিসাব সঠিন নয়; এর প্রকৃত আয়তন হবে ৮৬,০২৩ বর্গ মাইল (খুব স্বাভাবিক ভাবেই, যেহেতু ভারত-চীন সীমান্তের বিতর্কিত এলাকা আকসাই চীন আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে)। মূল কথা হচ্ছে, জম্মু ও কাশ্মীর, তিব্বত ও চীন সীমান্ত এলাকায় কিছু অবাস্তব সীমারেখা নিয়ে অবস্থিত যে কারণে রাজ্যের আয়তনে বিভিন্ন সময়ে ভিন্নতা দেখা যায়।

৩. পাঠানকোট একই নামের সাবডিস্ট্রিক্টে অবস্থিত একটি অমুসলিম আধিপত্য এলাকা যেটা ছিলো দিল্লী থেকে আসা রেল যোগাযোগের শেষ প্রান্ত; এক্ষেত্রে দিল্লী থেকে যে এলাকার মধ্য দিয়ে পাঠানকোট পর্যন্ত রেল যোগাযোগ ছিলো তার পুরোটাই দেশ বিভাগের পর ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। তখন থেকে ১৯৪৭ এ জম্মু পর্যন্ত একটি মাঝারি মানের সড়ক পথ ছিলো। বৃটিশ ভারতের মূল নেটওয়ার্কে শিয়ালকোট হয়ে জম্মু পর্যন্ত সরাসরি রেল যোগাযোগ ছিলো; কিন্তু দেশ বিভাগ শিয়ালকোটকে পাকিস্তান অংশে নিয়ে ফেলে। কাশ্মীর উপত্যকায় জম্মু থেকে শ্রীনগরে বানিহাল পাস হয়ে পির পাঞ্জাল পাহাড়ি এলাকা অতিক্রম করে সড়ক যোগাযোগ ছিলো যেটা প্রায় সময়ই বন্ধ থাকতো। বৃটিশ ভারত থেকে শ্রীনগর যাওয়ার সবচেয়ে সহজ রাস্তা ছিলো ঝিলাম উপত্যকার পাশ দিয়ে পাঞ্জাবের অংশ থেকে, পাঞ্জাবের যে অংশ পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়।

জম্মু ও কাশ্মীরে প্রবেশের অন্য আরো একটি রুট যেটা হতে পারতো সেটা হচ্ছে কুল্লু যা দেশ বিভাগের পর ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। মানালি থেকে রোটাং পাস হয়ে চন্দ্রা উপত্যকা প্রবেশ করা যেতো যার উপর দিয়ে বারালাচা পাস অতিক্রম করে যে কেউ লাদাখ যেতে পারতো। এখন এই রাস্তা দিয়ে জিপ নিয়ে যাওয়া যায়। লেখক যখন ১৯৫৫ সালে এ পথে যান তখন খুব স্বাভাবিক ভাবেই এ রাস্তা বড় সামরিক বাহিনীর জন্য ভালো রাস্তা ছিলো না।

৪. পুঁচ বিদ্রোহ নিয়ে প্রাণবন্ত বর্ণনা B. S. Singh, The Fox. A Biography of Maharaja Gulab Singh of Kashmir 1792-1857, Carbondale, Illionis, 1974, pp. 12-13 দ্রষ্টব্য।

৫.  অমৃতসর চুক্তির ধারা ১০ এ এই লেনদেনের খুব সম্ভবত একটি বন্ধকি ব্যবস্থাকে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে যেখানে বলা ছিলো - “মহারাজা গুলাব সিং বৃটিশ সরকারের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করেন এবং শ্রেষ্ঠত্বের প্রতি এই আনুগত্যের প্রতীক হিসেবে বৃটিশ সরকারকে বাৎসরিক ঘোড়া, অনুমোদিত জাতের ১২টি নিখুঁত শাল ভেড়া (৬টি পুরুষ ও ৬টি মহিলা) এবং তিন জোড়া কাশ্মীর শাল উপহার দিবেন”। বৃটিশ রাজের শেষ দিন পর্যন্ত এই শ্রদ্ধার্ঘ্য প্রদান করা হতো যদিও পরবর্তীতে জীবন্ত পশুর পরিবর্তে কাশ্মীর শাল উপহার হিসেবে দেয়া হতো।

এখানে যুক্তির খাতিরে একটা প্রশ্ন উঠতে পারে যে, যদি এটা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছ থেকে গুলাব সিং-এর কাশ্মীর প্রাপ্তির বন্ধকি শর্ত হয়ে থাকে সেক্ষেত্রে ১৯৪৭ এ ক্ষমতা পরিবর্তনের সাথে সাথে এ বন্ধকি চুক্তি তামাদি হয়ে গিয়েছিলো কি না? ঠিক এ প্রশ্নটাই ১৯৪৬ সালে ক্যাবিনেট মিশনের কাছে শেখ আব্দুল্লাহ্’র প্রতিনিধি দল উত্থাপন করেছিলেন।

ক্ষমতা হস্তান্তরের আগেই যদি জম্মু ও কাশ্মীর প্রশ্নে আরো গভীরভাবে চিন্তা করা হতো তবে হয়তো আরো কিছু উপায় বের করা সম্ভব হতো। কাশ্মীর উপত্যকা বৃটিশ ভারতে প্রত্যাবর্তন করে জম্মু ও কাশ্মীর এমন ভাবে বিভক্ত হতে পারতো যাতে একটি মুসলিম প্রাধান্য এলাকা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হতো। জম্মু মুসলিম প্রাধান্য নিয়ে ছোট্ট এমন একটি রাজকীয় রাজ্যে পরিণত হতো যা চূড়ান্তভাবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হলে সম্ভবত এম এ জিন্নাহ কোন আপত্তি করতেন না।

হার্ডিঞ্জ, রাণী ভিক্টোরিয়ার কাছে এমন ভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন যে, গুলাব সিং-এর কাছে কাশ্মীর বিক্রি করা সুবিধাজনক কারণ এতে প্রথম শিখ যুদ্ধের যাবতীয় খরচের অনেকটাই উঠে আসবে, যে খরচ শিখদের পক্ষে পরিশোধ করা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে বিস্তারিত: A. C. Benson & Viscount Esher, eds., The Letters of Queen Victoria. A Selection of Her Majesty’s Correspondence between the Years 1837 and 1861. Volume II. 1844-1853, London 1908, pp. 73-74, Sir Henry Hardinge to Queen Victoria, 18 February 1846. দ্রষ্টব্য।

৬. A. L. Basham, The Wonder that was India. A Survey of the Culture of the Indian Sub-dontinent before the Coming of the Muslims, London 1954, p. 44. দ্রষ্টব্য।

৭. মুঘল আমলে শ্রীনগরে কাশ্মীরি পণ্ডিতরা ক্রমাগত নিজেদেরকে প্রশাসকের ভূমিকায় উপনীত করেছিলেন। পণ্ডিতরা জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্য সরকারে আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। ঊনিশ শতকের শেষের দিকে সেটলমেন্ট অফিসার হিসেবে ওয়াল্টার লরেন্স জম্মু ও কাশ্মীর প্রশাসন সম্পর্কে অনন্য জ্ঞান অর্জন করেছিলেন; তিনি মন্তব্য করেন, “এটা দুঃখজনক যে, রাজ্যের বিভিন্ন বিষয় ও গণমানুষের বিশ্বাস এক শ্রেণির মানুষের কাছে গচ্ছিত ছিলো এবং আরো বেশি দুঃখজনক যে, এই শ্রেণির মানুষগুলো (পণ্ডিতগণ) খুব পদ্ধতিগতভাবে একত্রে রাজ্যের সাথে প্রতারণা করে জনগণকে লুট করতেন।” বিস্তারিত: W. R. Lawrence, The Valley of Kashmir, London 1895, p. 401. দ্রষ্টব্য। কাশ্মীরি পণ্ডিতদের বিষয়ে বিস্তারিত: H. Sender, The Kashmiri Pandits. A Study of Cultural Choice in North India, New Delhi 1988. দ্রষ্টব্য।

৮.  শ্রীনগরের আহমদিয়াদের নিয়ে পঞ্চম অধ্যায়ে আলোচনা করা হবে।

৯. ১৯৪৭ নাগাদ হুনজা’র (এবং সম্ভবত নাগর, ইয়াসিন ও ইক্ষুমান) কোন ভাবে জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের অংশ হওয়া উচিত ছিলো কি না এ বিষয়ে চতুর্থ অধ্যায়ে আলোচনা করা হবে ।

১০. লাদাখের এই অংশ তৃতীয় অধ্যায়ে পুনরায় বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।

১১. বানিহাল পাসের উপর দিয়ে সড়ক পথ ১৯১৬ সালে খুলে দেয়া হয়। সে সময় এটা জম্মু ও কাশ্মীর মহারাজার ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিলো এবং এটি ব্যবহারের জন্য বিশেষ অনুমতির প্রয়োজন ছিলো। ১৯২২ সালে এটা সাধারণ জনগণের জন্য খুলে দেয়া হয়। রাস্তাটি সত্যিকার অর্থে সব সময়ের জন্য মোটর যান চলাচলের সড়কে পরিণত হয় ১৯৫০ সালে যখন ভারত সরকার সামরিক চাহিদা মেটাতে বরফ বা ভূমিধ্বস প্রতিরোধক প্রায় দুই মাইল লম্বা চমৎকার টানেল তৈরি করে; সঙ্গত কারণেই এর নামকরণ করা হয় জওহারলাল নেহেরুর নামে।

১৯১৬ এর আগে পর্যন্ত জম্মু থেকে শ্রীনগর যাবার একমাত্র ঘোড়াগাড়ি পথ ছিলো রাওয়ালপিণ্ডি ও ঝিলাম উপত্যকা সড়ক হয়ে যেটা ১৮৯০ সালে চালু হয়েছিলো। জম্মু ও কাশ্মীর সরকার এটা তৈরি করেছিলো বৃটিশ সেনাদের উত্তরাঞ্চল সীমান্তে প্রবেশের সুবিধার জন্য এবং ভারতীয় সরকার কর্তৃক রাজ্যে সেনানিবাস স্থাপন প্রতিরোদ করতে।

১২. Lord Birdwood, Two Nations and Kashmir, London 1956, p. 25. দ্রষ্টব্য।

১৩. Government of Great Britain, Accounts and Papers. East Indies. Papers Relating to Kashmir, C. 6072, 1890. LIV, f. 233, Kimberley to the Government of India, 23 May 1884. দ্রষ্টব্য।

১৪. Papers Relating to Kashmir, loc. cit., Lord Randolph Churchill, Secretary of State for India, to the Viceroy, Lord Dufferin, 27 November 1885. দ্রষ্টব্য।

১৫. Papers Relating to Kashmir, loc. cit., Lord Cross, Secretary of State for India, to the Viceroy, Lord Lansdowne, 24 May 1889. দ্রষ্টব্য।

১৬. পুঁচ এর প্রভাবশালী গোষ্ঠী ছিলো সুধানুতি সাবডিস্ট্রিক্ট এর সুধানরা যারা ১৯৪৭ এ পুঁচ এর উত্থানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলো; এ সম্পর্কে সপ্তম অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে। সুধানদেরকে দুররানী (বা আবদালী) আফগানের গোত্র সাদোজাই এর সদস্য হিসেবে মনে করা হয় যারা খুব সম্ভবতঃ আঠারোশ শতকের শেষে ও ঊনিশ শতকের শুরুতে আফগান কর্তৃক কাশ্মীর দখলের সময় এ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিলো। অন্য কথায় এরা ছিলো পাঠান; এবং তাদের সাথে উত্তর-পশ্চিত ভারত ও পূর্বাঞ্চলীয় আফগানিস্তানের অন্যান্য পাঠানদের সম্পর্ক ছিলো। ১৯৪৭ সালে কাশ্মীর সমস্যায় পাঠানদের সংশ্লিষ্টতার ক্ষেত্রে পাঠানদের সম্ভাব্য প্রকৃতি বিবেচনার ক্ষেত্রে এই সুনির্দিষ্ট পাঠান বিষয়টি বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
কমেন্ট করুন
ব্যবস্থাপক |

সদস‍্য, সম্পাদনা পর্ষদ, প‍্যাপাইরাস

প্রাক্তন শিক্ষার্থী

পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সেশন:১৯৯৯-২০০০

রোকনুজ্জামান

সদস‍্য, সম্পাদনা পর্ষদ, প‍্যাপাইরাস প্রাক্তন শিক্ষার্থী পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেশন:১৯৯৯-২০০০

0