সম্পাদকীয় জুন ২০১৯

প্রিয় পাঠক, আপনাকে ঈদের শুভেচ্ছা।

এবার ঈদের চাঁদ দেখা নিয়ে যা হয়ে গেল, তাতে আপনার মতো আমিও জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির উপর বিরক্ত হয়েছি। কিন্তু, পরে আমার মনে বেশ কিছু প্রশ্ন এসেছে, যার উত্তর খুঁজতে আমি ইন্টারনেটে বিভিন্ন ইসলামী চিন্তাবিদের লেখা পড়েছি ও ভিডিও দেখেছি। কিছু প্রশ্নের উত্তর পেলেও নতুন কিছু প্রশ্ন মাথায় ঢুকেছে, যেগুলোর উত্তর এখনও পাইনি।

ঈদ শুরু করা নিয়ে বিতর্ক শুধু যে আমাদের দেশেই, তা কিন্তু নয়। বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই মুসলমানরা ‘moon sighting’ করতে গিয়ে ‘moon fighting’ করে (শব্দ দুটি ইন্টারনেট থেকে নেয়া)। এর প্রধান কারণ বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর নিয়ে মতভেদ।

প্রথম প্রশ্ন: ঈদের দিন নির্ধারণ করতে হবে চাঁদ দেখেই, নাকি জ্যোতির্বিজ্ঞান ব্যবহার করা যাবে?

ওমর (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে আছে, “(রমজানের) চাঁদ না দেখে রোজা শুরু করো না এবং (শাওয়ালের) চাঁদ না দেখে রোজা শেষ করো না, এবং যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে, তাহলে হিসেব করো।” (আল-বুখারী, ৩: ১৩০)

আমি প্রথমে ভেবেছি, জ্ঞানের আলোয় দেখা (জ্যোতির্বিজ্ঞান ব্যবহার করা) তো এক ধরনের দেখা। কিন্তু, আরেকটু চিন্তা করে বুঝলাম, সিদ্ধান্ত নিতে জ্যোতির্বিজ্ঞান ব্যবহারের অনুমতি থাকলে মেঘাচ্ছন্ন আকাশের প্রসঙ্গ আসতো না। এরপর আমার মনে হলো, আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলে নিশ্চয়ই জ্যোতির্বিজ্ঞান ব্যবহার করা যাবে (বলা হয়েছে ‘হিসেব করো’)। কিন্তু, ভুল ভাঙলো আরেকটি হাদীস পড়ে। আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে আছে, ‘‘(রমজানের) চাঁদ দেখে রোজা শুরু করো এবং (শাওয়ালের) চাঁদ দেখে রোজা শেষ করো, এবং যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে, শা’বান মাস ত্রিশ দিন পূর্ণ করো।” (আল-বুখারী, ৩: ১৩৩)

উপরের হাদীসের শেষ অংশে যদিও শা’বান মাসের কথা বলা হয়েছে (রোজা কখন শুরু হবে, তা নির্ধারণ করতে), তবে এখানে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলে করণীয় সম্পর্কে একটি দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়। এটা নিয়ে তর্কের অবকাশ নেই যে, আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলে শা’বান মাসের মতো রমজান মাসও ত্রিশ দিন পূর্ণ করতে হবে।

আমার মনে নতুন প্রশ্ন এলো, মহানবী (সাঃ) কেন জ্যোতির্বিজ্ঞান ব্যবহারকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের উপায় হিসেবে রাখেননি? ইন্টারনেটে এর উত্তর খুঁজে পাইনি। তবে, আমি এর একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছি। চাঁদ দেখার শর্ত দেয়ায় এখন কী হচ্ছে? ২৯শে রমজান সন্ধ্যায় ইফতারের পর প্রত্যেক এলাকায় ছেলে-মেয়ে, নর-নারী, বুড়ো-বুড়ি ঈদের চাঁদ দেখতে মাঠে, ঘাটে, রাস্তায়, বাড়ির ছাদে, বারান্দায় চলে যাচ্ছে; চাঁদ দেখতে পেলে খুশিতে চিৎকার করে অন্যদেরকে দেখাচ্ছে; যারা ঘর থেকে বেরোতে পারেনি, তাদেরকে খবরটা দিতে দৌড়ে যাচ্ছে; এ ওকে ফোন করছে – কী চমৎকার একটি ধর্মীয় ও সামাজিক রীতি আর ঐতিহ্য! এটাই কি ঈদের সবচেয়ে বড় আনন্দ নয়?

জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের হাতে ছেড়ে দিলে বছরের শুরুতেই তারা বলে দিবেন অমুক তারিখে ঈদ। নেই হয়ে যাবে চাঁদ দেখার উৎসাহ আর উদ্দীপনা, হারিয়ে যাবে ঈদের মূল আনন্দ।

তবে হ্যাঁ, চাঁদ দেখার পরিপূরক হিসেবে জ্যোতির্বিজ্ঞান ব্যবহারে অনেক ইসলামী চিন্তাবিদের আপত্তি নেই। আকাশে অনেক কিছু থাকে, যার উপর আলো প্রতিফলিত হয়ে চাঁদ মনে হতে পারে, অর্থাৎ মানুষ ভুল করতে পারে। অনেকে মিথ্যাও বলতে পারে। জ্যোতির্বিজ্ঞানকে তথ্য যাচাইয়ের উপায় হিসেবে ব্যবহার করা দোষের হবে কেন?

দ্বিতীয় প্রশ্ন: খালি চোখে চাঁদ দেখতে হবে, নাকি টেলিস্কোপ বা অন্য যন্ত্র ব্যবহার করা যাবে?

ইসলামে নির্দিষ্ট করে কিছু বলা নেই। তাই, যে কোনটি করা যেতে পারে। এ প্রসঙ্গে মুফতি মেন্‌ক্‌ (জিম্বাবুয়ের গ্র্যান্ড মুফতি) এর বক্তব্যের ভিডিও ইউটিউবে দেখতে পারেন। অনেকে বলেন, মহানবী (সাঃ) বা সাহাবীরা খালি চোখে দেখেছেন বলে আমাদেরও তাই করা উচিত। এই যুক্তি ধোপে টেকে না। মহানবী (সাঃ) এর সময়ে ইন্টারনেট ছিল না বলে কি এখন ইসলামী চিন্তাবিদরা ইন্টারনেটে কোন বক্তব্য দিতে পারবেন না?

তৃতীয় প্রশ্ন: এক দেশে চাঁদ দেখা গেলে কি অন্য সব দেশে এক সাথে ঈদ হওয়া উচিত, নাকি প্রত্যেক দেশেই আলাদা করে চাঁদ দেখা যেতে হবে?

এখানেও মতভেদ আছে। তবে, অধিকাংশ ইসলামী চিন্তাবিদ মনে করেন, প্রত্যেক দেশে (অনেকে বলেন প্রত্যেক দিগন্তে বা horizon-এ) চাঁদ দেখা সাপেক্ষে ঈদ করতে হবে।

এ পর্যায়ে আমার মাথায় নতুন প্রশ্ন এসেছে। এবার উত্তরবঙ্গে চাঁদ দেখা যাওয়ায় আমরা সারা দেশ একসাথে ঈদ করলাম। যদি ভবিষ্যতে উত্তরবঙ্গ আর দক্ষিণবঙ্গ দুটি আলাদা দেশে বিভক্ত হয়, তাহলে কী হবে? এই দু’দেশের একটিতে চাঁদ দেখা গেলে কি অন্যটিতে ঈদ করা যাবে?

উত্তর যদি ‘না’ হয়, তাহলে এখনই বা একসাথে ঈদ করা যাবে কেন? দেশ সৃষ্টি ও বিভক্তি তো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, ইসলামী সিদ্ধান্ত নয়।

যদি উত্তরবঙ্গে আর দক্ষিণবঙ্গে একসাথে ঈদ করা যায় (এক দেশের অঞ্চল বলে), তাহলে ভারত বা পাকিস্তানে চাঁদ দেখা গেলে বাংলাদেশে কেন ঈদ করা যাবে না? এক সময় তো আমরা একত্রেই ছিলাম। দেশ বিভক্তির সাথে চাঁদের কী সম্পর্ক? এ প্রশ্নের উত্তর পাইনি।

এবার আসি ‘জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি’র কার্যকলাপ প্রসঙ্গে। উল্লেখ্য, প্রত্যেক জেলায়ও ‘জেলা চাঁদ দেখা কমিটি’ আছে।

রাত ৮:৩০টারও পরে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি জানালেন, দেশের কোথাও চাঁদ দেখা যায়নি, ঈদ ৬ জুন। এ পর্যন্ত আমি তাদের কোন দোষ দেখি না। যদি দেশের কোন জেলা থেকে তাদেরকে ফোন করে জানানো হতো চাঁদ দেখা গেছে, তারা নিশ্চয়ই এরকম ঘোষণা দিতেন না।

এরপর রাত এগারোটায় জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি তাদের পূর্বের ঘোষণা পরিবর্তন করলেন। বললেন, চাঁদ দেখা গেছে, ঈদ পরদিন ৫ জুন। জানা গেলো, কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটে চাঁদ দেখা গেছে – বেশ কয়েকজন আমলা নাকি কমিটিকে ফোন করে চাঁদ দেখার খবর দিয়েছেন।

তথ্য যাচাইয়ের জন্য আমি জ্যোতির্বিজ্ঞানের সাহায্য নিলাম। জানতে পারলাম, বাংলাদেশের আকাশে সেদিন চাঁদ দেখা গেলেও সেটা আটটার আগেই অস্ত গেছে। বিশেষ করে কুড়িগ্রামে চাঁদ অস্ত গেছে রাত ৭:৪৭-এ (www.timeanddate.com/moon/@1337158), এবং লালমনিরহাটে অস্ত গেছে রাত ৭:৫০-এ (www.timeanddate.com/moon/@1337157)।

যারা চাঁদ দেখেছেন, তারা নিশ্চয়ই রাত আটটার আগেই চাঁদ দেখেছেন। সাথে সাথে তারা জেলা/জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটিকে জানাননি কেন?

জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির ঘোষণার পর যাদের মনে পড়লো যে তারা চাঁদ দেখেছেন, তারা হয় মিথ্যেবাদী, না হয় দায়িত্বজ্ঞানহীন। তাদের কথায় কমিটি কেন ঘোষণা পরিবর্তন করলেন?

পরে জানা গেল, এবার চাঁদ দেখতে কষ্ট হয়েছে বলে সরকার নাকি বেশ কিছু দামি যন্ত্র কিনবেন। তার মানে কী? চাঁদ খালি চোখে দেখতে হবে, না যন্ত্র ব্যবহার করা যাবে – এই নিয়েই যেখানে বিতর্ক, সেখানে বাংলাদেশে বর্তমানে যেসব টেলিস্কোপ রয়েছে, তা ব্যবহার করলে চলবে না? আরও দামি যন্ত্র কিনতে হবে? এ জন্যেই কি কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি?

জনগণ দায় এড়াতে পারে না। চাঁদ দেখতে কজন চেষ্টা করেছে? দেখতে পেলে চাঁদ দেখা কমিটিকে কেউ জানায়নি কেন? এটা যেন বহুদিন আগে পড়া (এখন ইন্টারনেটে সহজলভ্য) সেই গল্পের মতো:

It is a story about four people named Everybody, Somebody, Anybody and Nobody. There was an important job to be done. Everybody was sure that Somebody would do it. Anybody could have done it, but Nobody did it.

এত লোকের দেশে টেকনোলজির দরকার হবে কেন? সবাই দেখতে চাইলে খালি চোখেই অনেকে চাঁদ দেখতে পাবে। দায়িত্ব নিয়ে কমিটিকে জানালেই হলো।

আমাদের প্যাপাইরাস পত্রিকা প্রকাশের ক্ষেত্রে অবশ্য চাঁদ দেখা না দেখার কোন ঝামেলা নেই। তাই, প্রতিবারের মতো এবারও ক্যালেন্ডার দেখে মাসের দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার পত্রিকা প্রকাশ করা হলো।

কমেন্ট করুন

প্রাক্তন শিক্ষার্থী

পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সেশনঃ ১৯৮৩ - ৮৪

জাফর আহমেদ খান

প্রাক্তন শিক্ষার্থী পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেশনঃ ১৯৮৩ - ৮৪

0