কাশ্মীর এক বিতর্কিত উত্তরাধিকার: ১৮৪৬-১৯৯০ (১ম খণ্ড : তৃতীয় অধ্যায়)

জম্মু ও কাশ্মীর এবং বৃটিশ ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা : উত্তর সীমান্ত অঞ্চলের সমস্যা

১ম অংশ
লাদাখ ও গিলগিট এজেন্সির সন্ধি সড়ক
(পূর্ববর্তী সংখ্যার পরে)

১৮৬০ এর দশকে লাদাখ রুটের প্রতি বৃটিশ নীতিগুলোর মনোযোগ আকৃষ্ট হয়। এ সময়ে মধ্য এশিয়ায় জার নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যের সীমা বিপজ্জনকভাবে ভারতীয় উত্তরাঞ্চল সীমান্তের খুব কাছাকাছি চলে আসে। এটা ছিলো ক্ষুদ্র রাজ্যগুলোতে (যার মধ্যে খানেত-এর খাইভা, কোখন্দ ও বুখারা অন্তর্ভুক্ত ছিলো) রুশ অনুপ্রবেশের প্রাথমিক অবস্থা। এ ক্ষুদ্র রাজ্যগুলো আরব সাগরের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্ত, আফগানিস্তানের উত্তর এবং চাইনিজ তুর্কিস্থানের পশ্চিম অংশ মিলে গঠিত একটি ত্রিভুজাকৃতি এলাকার মধ্যে অবস্থান করছিলো। এটা পৃথিবীর এমন একটা অংশ ছিলো যার কোন সীমানা অনেক ক্ষেত্রেই চিহ্নিত ছিলো না কিংবা কোন কোন ক্ষেত্রে থাকলেও সে সম্পর্কে কলকাতার বৃটিশ কর্তৃপক্ষ অবগত ছিলো না। এ সময় রুশরা শুধুমাত্র আফগানিস্তান সংলগ্ন একটি সাধারণ সীমান্তরেখা দখলেই এগিয়ে আসেনি, তারা খুব দ্রুত চাইনিজ তুর্কিস্থানের দিকেও এগিয়ে এসেছিলো। আর এটা এমন এক সময় হয়েছিলো যে সময় মধ্য এশিয়ায় মুসলিম জনতার উপর থেকে চাইনিজদের কর্তৃত্ব ধসে পড়ছিলো বলে মনে হচ্ছিলো; ফলে বৃটিশদের দৃষ্টিতে ক্ষমতার একটি চরম বিপজ্জনক শূন্যতা সৃষ্টি হচ্ছিলো বলে অনুভূত হয়েছিলো। ১৮৬৫ সাল নাগাদ বৃটিশ নীতি নির্ধারকদের কাছে এটা পুরোপুরি প্রমাণ হয়ে যায় যে, ভারতের উত্তরাঞ্চল সীমান্তের নিরাপত্তা হয় তৈরি করতে হবে নয়তো খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এটা ঝুঁকিতে পড়ে যাবে।

চাইনিজ তুর্কিস্থানের উপর ম্যাঞ্চু আধিপত্যের ধস্ নামা শুরু হয় ১৮৬১ সালে যখন কানসুতে চাইনিজ মুসলিমরা (তুনগান বা হুই জনগোষ্ঠী) বিদ্রোহ করে উঠে। এর ফলে চায়নার মূল শহরাঞ্চল এবং মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকার মধ্যে প্রধান যোগাযোগ রেখার উপর মারাত্মক প্রভাব পড়ে। মধ্য এশিয়ার এই বিস্তীর্ণ এলাকাটিতে মাত্র এক শতক আগে ম্যাঞ্চু সম্রাট চিয়েন লুন্দ-এর আধিপত্য বিস্তার লাভ করেছিলো। সম্পূর্ণ এলাকাটি দুইটি প্রশাসনিক জেলাতে বিভক্ত ছিলো – কাশগড়িয়া এবং জুনগড়িয়া (জুনগড়িয়ার রাজধানী ছিলো উরুমচি)। এ জেলাগুলো ম্যাঞ্চু গর্ভনররা শাসন করতো এবং তারা অনেকাংশেই উপজাতি মুসলিম কর্মচারী ও প্রতিষ্ঠানসমূহের উপর প্রধানতঃ তুর্কি ও মঙ্গল জনগণ নিয়ে গঠিত স্থানীয় সরকারের মুখাপেক্ষী ছিলো; এবং চাইনিজ ক্ষমতা সামরিক অস্ত্রের তুলনায় সম্রাটের মর্যাদা গুনেই পরিচালিত হতো। তাইপে বিদ্রোহ, যেটা ১৮৬৪ সালে ম্যাঞ্চু সাম্রাজ্য দমাতে সক্ষম হয়েছিলো, সেটা পিকিং সরকার কর্তৃপক্ষকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে ফেলেছিলো, কার্যত অক্ষম করে ফেলেছিলো। ফলে মধ্য এশিয়ার শাসনের বিরুদ্ধে যখন সবেগে বিদ্রোহ জেগে উঠলো তখন কর্তৃপক্ষ অধিস্বামী হিসেবে নিজের অবস্থান পুনরুদ্ধার করার কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি। বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠী যারা চাইনিজ আধিপত্বাধীন ছিলো তাদের মধ্যে তখনও স্বাধীন অস্তিত্বের স্মৃতি সুদৃঢ় ছিলো; ফলে আঞ্চলিক আনুগত্য পুনরুজ্জীবিত করা আবশ্যক হয়ে পড়েছিলো এবং ঐহিত্যগত গোত্রপ্রধানেরা আরো একবার তাদের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য উদগ্রীব ছিলেন।

এমন অবস্থায় সস্পূর্ণ এলাকাটা হয়তো ভেঙ্গে কয়েক টুকরো বিভ্রান্তিকর ছোট সুলতানাতে পরিণত হতো। সে সময় রাশিয়ার প্রচণ্ড চাপে থাকা পার্শ্ববর্তী কোখন্দ থেকে চাইনিজ তুর্কিস্থানে পাড়ি জমানো অভিযাত্রীরা ১৮৬৫ সালের শুরুর দিকে এ এলাকায় না আসা পর্যন্ত এখানে কেন্দ্রীভূত কোন সামরিক শক্তিও ছিলো না। এমন সময় বুজুর্গ খান নামক একজন খুব দ্রুতই চাইনিজ তুর্কিস্থানের একেবারে পশ্চিমে কাশগড়িয়ার (যার কেন্দ্রে রয়েছে কাশগড়) ক্ষমতাশালী সেনাপতি হিসেবে আবির্ভূত হন। খুব শীঘ্রিই (১৮৬৮ তে) বুজুর্গ খানের একজন লেফটেন্যান্ট ইয়াকুব বেগ তার স্থানে অধিষ্ঠিত হন। ইয়াকুব বেগ চাইনিজ তুর্কিস্থানের অধিকাংশ অঞ্চলকে মূল চীনের সীমানা পর্যন্ত বিস্তৃত মধ্য এশিয়ার একটি নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থায় একীভূত করতে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করেন। এ রাষ্ট্রব্যবস্থা কাশগড়িয়া মরুদ্যান ছাড়াও সুদূর পূর্বে উরুমচি (দিহুয়া) শহর, ইলি নদীতট এবং মঙ্গোলিয়ান সীমান্ত এলাকা আলতেই পর্বত পর্যন্ত গিয়েছে।

ইয়াকুব বেগের সৃষ্ট এই রাষ্ট্রব্যবস্থা কি আদৌ স্থায়ী কিছু দিতে পারতো? কিংবা রুশরা কি সাম্রাজ্যবাদ সম্প্রসারণে এই সুযোগ লুফে নিতো – প্রথমতঃ ইয়াকুব বেগকে প্রতিরোধ করে এবং দ্বিতীয়তঃ সম্ভাব্য চূড়ান্ত পদক্ষেপ হিসেবে জার রাজত্বকে বর্ধিত করে একেবারে ভারতীয় উত্তরাঞ্চল সীমান্ত স্পর্শ করার মাধ্যমে? পূর্ববর্তী চাইনিজ রাজত্বে যা ঘটছিলো সে বিষয়ে যে রুশরা ব্যাপক আগ্রহী ছিলো এবং ইয়াকুব বেগের সাথে যে তারা একটি বিশেষ কুটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করছিলো এ বিষয়টি খুব দ্রুতই বৃটিশদের ধারণায় চলে আসে। এর ফলে আমরা দেখবো যে ভারত সরকার এশিয়ার আকাশে এই নতুন নক্ষত্র অঙ্গনে নিজের প্রতিনিধি পাঠাতে একটুও দেরি করেনি।

ইয়াকুব বেগের শাসন যুগ ছিলো মাত্র এক যুগের। ইয়াকুব বেগ যখন ১৮৭৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন তখন চীন অসাধারণ সামরিক-আমলাদের নেতৃত্বে নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে শুরু করে। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি যখন মনে হচ্ছিলো চীন পুরোপুরি বিভাজনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে সে সময়েও চীন এধরনের সামরিক-আমলা তৈরিতে সক্ষম ছিলো। সো সাং থ্যাং ছিলেন এমনই এক ভয়ঙ্কর চরিত্র যিনি ১৮৭৩ সালে ষাটোর্ধ্ব বয়সে তাইপে বিদ্রোহের বিরুদ্ধে তার অর্জনের পুরষ্কারস্বরূপ চাইনিজ তুর্কিস্থানের সীমান্তবর্তী শেনঝি ও কানঝু প্রদেশের গর্ভনর হিসেবে নিয়োজিত হন। এই ঘাঁটি থেকে অনেকটা নিজ উদ্যোগে এবং সাংহাই-এর বণিকদের থেকে নিজ প্রচেষ্টায় সংগৃহীত তহবিল অর্থ সহায়তায় তিনি ইয়াকুব বেগের উচ্চাভিলাষের সমাপ্তি টানেন। ১৮৭৮ এর মধ্যেই কাশগড় পুনরুদ্ধার হয় এবং ছয় বছর পর, ১৮৮৪ সালে ম্যাঞ্চু রাজত্ব সম্পূর্ণ চাইনিজ তুর্কিস্থানকে নগর চায়নার একটি প্রদেশ ‘শিনঝ্যাং’ বা ‘জিনঝ্যাং’ (অর্থাৎ ‘নতুন রাজত্ব’) হিসেবে ঘোষণা করতে সমর্থ হয়। চাইনিজ তুর্কিস্থান সব কিছুর পরও রুশ বা বৃটিশ সাম্রাজ্যে অবশ্যম্ভাবীভাবে হারিয়ে যাওয়ার মতো নির্ভেজাল মুসলিম রাজ্যে পরিণত হয়নি। এটা যেভাবেই হোক চাইনিজ ক্ষত এলাকা হিসেবেই থেকে গিয়েছিলো; এবং ভারতে বৃটিশ রাজের অবশিষ্ট সময়ের জন্য পৃথক কৌশল নির্ধারিত ছিলো যেখানে মনে করা হতো যে, এটা কোন এক সময়ে রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত হবে; সেটা না হলেও অন্ততঃ পক্ষে রাশিয়ার একটি সংরক্ষণাধীন দেশ (যাকে পরবর্তী সময়ে ‘উপশহর’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হতো) হিসেবে টিকে থাকবে।  

জম্মু ও কাশ্মীরের মহারাজা রণবীর সিং (যিনি ১৮৫৭ সালে গুলাব সিং এর উত্তরসুরি হিসেবে ক্ষমতায় আসেন) খুব দ্রুতই এ পরিবর্তনের তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারেন এবং উত্তরে চাইনিজ তুর্কিস্থানের দিকে অবস্থান নেন। চাইনিজ শাসনের এই ধস্ তাঁর রাজ্য বিস্তৃত করার একটি দারুন সুযোগ এনে দেয় – ভৌগোলিক ভাবে না হলেও অন্ততঃ কুটনৈতিক ও বাণিজ্যিক প্রভাবের দিক থেকে। ১৮৬৪ সালে তিনি একটি ছোট সৈন্যদল প্রায় ষাট মাইল উত্তরে লেহ্ থেকে কাশগড় রাস্তার উপর দিয়ে কারাকোরাম পাস অতিক্রম করে শাহিদুল্লা  (জাইদুল্লা)-তে প্রেরণ করেন। একই সময়ে রণবীর সিং খোটান-এর আমীর হাজি হাবিবুল্লাহ খান যিনি চাইনিজ কর্তৃপক্ষের অনুপস্থিতিতে ঐ শহরের নিয়ন্ত্রণ নিবেন বলে অনুমান করা যাচ্ছিলো, তার সাথে যোগাযোগ করেন। অশান্ত ও অনির্দিষ্ট এ সময়ে একটি সম্ভাব্য জোটের অনুসন্ধানে খোটানের আমীর মহারাজা রণবীর সিং-কে ভারত সরকারের কাছে হস্তান্তরের জন্য একটি গোপন বার্তা পাঠান।১০ রণবীর সিং দেখলেন যে, আমীরের প্রস্তাবনা জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের সুবিধার জন্য কাজে লাগানো যায়। তিনি তাঁর রাজ্যের বাণিজ্য পূর্বাঞ্চলীয় তুর্কিস্থানের দিকে বিস্তৃত করতে চাচ্ছিলেন১১, এতে করে এক দিক দিয়ে লুটেরা আক্রমণ প্রতিরোধ করা যেতো এবং অপর দিকে রাজস্ব বৃদ্ধিতে যথাযথ পরিমাণে কর আদায় নিশ্চিত করা যেতো; শাহিদুল্লা  গ্যারিসনের মূল লক্ষ্যই ছিলো এটা। তিনি যেটা চাচ্ছিলেন না সেটা হচ্ছে তাঁর পক্ষ হয়ে বৃটিশদের হস্তক্ষেপ। তিনি ভারত সরকারকে আমীরের সাথে তাঁর যোগাযোগ কিংবা সাহায্যের জন্য আমীরের অনুরোধের বিষয়ে (আমরা দেখবো যদিও এটা পরে বৃটিশ ও রণবীর সিং কে জড়িয়ে ফেলে) কিছুই বলেননি।

ভারত সরকার এ বিষয়ে কিছুই জানে না এ বিশ্বাস থেকে ১৮৬৫ সালে রণবীর সিং এ বিষয়ে ভারত সরকারকে টেনে আনেন। ভারতের বৃহৎ ত্রিকোণমিতিক জরিপের অংশ হিসেবে ১৮৫৫ থেকে বৃটিশরা জম্মু ও কাশ্মীর জরিপ করে আসছিলো। সে সময়ে কাজ প্রায় শেষের দিকে।১২ শুধুমাত্র লেহ্ থেকে কারাকোরাম পাস সহ লাদাখের উত্তর-পূর্ব অংশ বাকি ছিলো যার মানচিত্র করার দায়িত্বে ন্যস্ত ছিলেন ডব্লিউ. এইচ. জনসন নামক এক ব্যক্তি। জনসন তার বৃটিশ কর্তাব্যক্তিদের উপর খুব ত্যক্তবিরক্ত ছিলেন (খুব সম্ভবত তার শরীরে ইউরেশিয়ান রক্ত বয়ে যাওয়ার কারণে)। কারণ, তিনি মনে করতেন যে তার মেধাকে যথাযথ ভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। জনসন-এর কার্যক্রম জরিপ থেকে স্থানান্তর করে মহারাজার অধীনে ন্যস্ত করা হয়। ভবিষ্যতে রাজ্যের চাকরির শর্তে জনসন জম্মু ও কাশ্মীর-এর পক্ষে কুটনীতির ভূমিকা পালন করতে রাজি হন।

জনসন ১৮৬৫ সালে লেহ্ অতিক্রম করে খোটানে যান, তবে সেটা নিয়মিত কারাকোরাম রুট ব্যবহার না করে আরো পূর্বে দূরের একটি পথ দিয়ে যেটা উঁচু আকসাই চিন পতিতভূমি অতিক্রম করে তিব্বতীয় মালভূমির প্রান্ত হয়ে কারাকাশ নদীর পাশ দিয়ে খোটানে নেমে গেছে।১৩ চাইনিজ তুরকিস্তান থেকে তিব্বতীয় মালভূমি পৌঁছানোর এ পথটা চায়না বিশ্বে খুব আদরনীয় ‘জেড’ খনিজের মূল্যবান একটি উৎস হিসেবে কিছুটা ব্যবহার হতো; এবং আমীর হাজি হাবিবুল্লা খান কারাকোরাম যাওয়ার বিকল্প পথ হিসেবে এর উন্নয়নের চেষ্টা করেছিলেন বলে মনে হয়, যেন তিনি এটাকে ভারত প্রবেশের ব্যক্তিগত পথ হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন।

মহারাজার দৃষ্টিকোণ থেকে জনসনের অভিযাত্রা তিনটি লক্ষ্য অর্জন করেছিলো। প্রথমত, একজন বৃটিশ কর্মকর্তার মধ্যস্থতায় জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্য এবং খোটানের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন হয়েছিলো যেটা নিসন্দেহে আমীরকে প্রভাবিত করেছিলো। দ্বিতীয়ত, এর মাধ্যমে একটি নতুন রুট আবিষ্কৃত হয়েছিলো যেটা আপাতদৃষ্টিতে ইতিমধ্যে আমীর হাবিবুল্লা খানের নজরেও ছিলো। এ রুটটা কারাকোরাম ঘুরে একটা পথ বের করেছিলো (যেটা ছিলো অত্যন্ত উঁচু – ৮,০০০ ফুটের বেশি – এবং দুর্গম, এবং চায়না শক্তির বিচারে দক্ষতার সাথে সুরক্ষিত); এবং এটি গোপন যোগাযোগ এবং সুনির্দিষ্টভাবে চায়নারা ফিরে আসলে চোরাগোপ্তা বাণিজ্য – উভয় কাজেই ব্যবহার করা যেতো। চূড়ান্তভাবে, সম্পন্নকৃত জরিপ অফিসিয়াল বৃটিশ মানচিত্রে ঐ অঞ্চলের একটি বিবেচনাধীন এলাকাকে জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছিলো যেটা সে সময় পর্যন্ত মহারাজার ভূখণ্ডের বাইরে বলে বিবেচিত হতো। জনসনের মানচিত্র রাজ্যের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সীমানাকে কয়েক শ’ মাইল উত্তরে কারাকোরাম পাস (এবং পিছনে আরো দূরবর্তী পতিতভূমি) পর্যন্ত ঠেলে দিয়েছিলো যেটা সন্দেহাতীতভাবে চায়না ভূখণ্ডে গিয়ে পড়তো। জনসনের মানচিত্র অনুযায়ী জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্য তখন খোটানের মধ্যে প্রায় পঞ্চাশ মাইল বিস্তৃত হয়েছিলো এবং একজন বৃটিশ পর্যবেক্ষকের মতে এটা প্রায় ২১,০০০ বর্গমাইল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিলো।১৪

বৃটিশ কর্তৃপক্ষ যখন এ সকল ব্যাপার জানতে পারলো তখন তারা যথেষ্ট বিরক্ত হয়েছিলো। এখানে এমন কিছু গোলমেলে ব্যাপার ছিলো যেটা ১৮৪৬ এর অমৃতসর চুক্তির মূল চেতনাকে নষ্ট করছিলো; কিন্তু চুক্তিটিই আসলে অস্পষ্ট ছিলো এবং একে বিভিন্ন ভাবে ব্যাখ্যা করা যেতো।১৫ মহারাজা তাঁর নিজস্ব বৈদেশিক নীতি বাস্তবায়ন করেছিলেন এবং (জনসনের মানচিত্রের বিপরীতে গিয়ে যদি এটা ধরে নেয়া হতো যে শহিদুল্লা জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের মধ্যে ছিলো না তবে) এটা বলা যেতো যে তিনি তাঁর শহিদুল্লা বাহিনী নিয়ে ভারতীয় সীমান্তের ঠিক পেছনেই সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু করেছিলেন। জনসন বৃটিশ ভারত সরকারের কর্মচারী হয়ে এমন ভাবে কাজ করছিলো যেন মনে হচ্ছিলো তার কোন আইনগত কর্তৃপক্ষ নেই। এ বিষয়ে জনসনকে তীব্র তিরস্কার করা হয়েছিলো এবং মহারাজাকে পরিষ্কার জানিয়ে দেয়া হয়েছিলো যে, কলকাতা এই নতুন সীমানা মেনে নেয়নি।  

অপরদিকে, যেহেতু অন্য কোন মানচিত্র ছিলো না, ফলে পরবর্তী বছরগুলোতে বৃটিশ মানচিত্রকে প্রভাবিত করতে জনসনের মানচিত্রই ভারতীয় মানচিত্র বিদ্যার একমাত্র দাপ্তরিক অনুলিপি হিসেবে জায়গা করে নেয় (এবং ১৯৪৭ পরবর্তী সময়ে আকসাই চিনের বিষয়ে ভারতীয় দাবির মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়)।১৬ জনসন জরিপের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে দেখা যায় ভারত সরকার এই নতুন রুট আবিষ্কারের মূল্য সম্পর্কে একেবারে অসচেতন ছিলো না। জনসন অধ্যায়ের প্রতি বৃটিশ দাপ্তরিক প্রতিক্রিয়া এক্ষেত্রে চুপ মেরে গিয়েছিলো। এ থেকে একটি পরিষ্কার শিক্ষাও ছিলো যে, সীমানা চূড়ান্তভাবে যেমনই প্রমাণ হোক না কেন নতুন আবিষ্কৃত জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের সীমান্ত অঞ্চলে সতর্ক নজরদারি রাখতে হবে।  

ভারত সরকার চাইনিজ তুর্কিস্থান বিশেষ করে ইয়াকুব বেগ-এর উত্থানকে সবচেয়ে গুরুত্ব সহকারে পর্যবেক্ষণ করছিলো। তারা বাণিজ্যে উৎসাহ দিতে এবং কাশগড়িয়ার নতুন শাসনব্যবস্থার সাথে কুটনীতিক সম্পর্ক স্থাপনে নতুন নীতিমালার মাধ্যমে নির্দেশনা প্রদান করছিলো। ১৮৬৩ সালে বৃটিশরা মহারাজা রণবীর সিং-এর সাথে একটি বাণিজ্যিক চুক্তির বিষয়ে একমত হয় যার অভীষ্ট লক্ষ্য ছিলো ভারত এবং লাদাখ অতিক্রম করে পূর্বাঞ্চলীয় তুর্কিস্থানের সাথে বাণিজ্য উন্নয়ন। কেননা মহারাজার লোকজন এলাকার মধ্যে দিয়ে অতীতের বাণিজ্যের জন্য বার বার দুঃসহ বকেয়া ধার্য করছিলো, যার ফলে ভারত সরকার খুব শীঘ্রিই লেহ্-তে একজন বৃটিশ বাণিজ্যিক প্রতিনিধি নিয়োগের সিদ্ধান্তে আসে যে কি না ঐ এলাকায় কী ঘটছে তার নজরদারি করবে। ১৮৬৭ সালে ড. হেনরী ক্যালে-কে এই পদে নিয়োগ প্রদান করা হয় এবং সে সময় থেকে বৃটিশ রাজের শেষ সময় পর্যন্ত লাদাখের বিষয়ে বৃটিশদের বিশেষ নজরদারি করা একটা ঐতিহ্যে পরিণত হয়।

(চলবে)

 ৭. কাইভার খানেট, কোখন্দ ও বোখারা পর্যন্ত রুশ প্রসারের ইতিহাস জানতে A. Krausse, Russia in Asia, A Record and a Study 1558-1889, London 1899; G. Morgan, Anglo-Russian Rivalry in Central Asia 1810-1895, London 1981 দ্রষ্টব্য।
১৮৬৫ সালে রুশরা তাসখন্দ দখল করে নেয় যেটা নতুন প্রদেশ তুর্কিস্থানের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠে এবং একই বছরে তরার কোখন্দ শহরও আয়ত্বে নিয়ে আসে। সম্পূর্ণ কোখন্দ খানেট ১৮৭৬ সাল নাগাদ রুশ কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে সম্প্রসারিত হয় ফেরঘানা জেলা তৈরির জন্য যে সময়ে কাইভা ও বোখারা উভয়ই রুশ নিয়ন্ত্রিত এলাকাভুক্ত হয়ে গেছে।
৮.  চাইনিজ তুর্কিস্থান ইতিহাসে ইয়াকুব বেগ অধ্যায় জানতে J. Chen, The Sinkiang Story, London 1977 দ্রষ্টব্য। আরো পাণ্ডিত্যপূর্ণ বিশ্লেষণ জানতে দেখুন: E. O. Clubb, China & Russia. The “Great Game”, New York 1971। এছাড়াও দেখুন: T. Yuan, “Yakub Beg (1820-1877) and the Moslem Rebellion in Chinese Turkestan”, Central Asiatic Journal, 1961।
৯.  সো সাং থ্যাং উচ্চ মানের আত্মজীবনী W. L. Bales, Tso Tsung-t’ang: Soldier and Statesman of Old China, Shanghai 1937 দ্রষ্টব্য। 
১০. ইয়াকুব বেগ ১৮৬৬ সালে খোটান দখল করে নতুন কাশগড়িয়ান রাজ্যের সাথে একীভূত করেন এবং আমীর হাজি হাবিবুল্লা খানকে মৃত্যুদন্ড দেন।
১১. বৃটিশরা পূর্বাঞ্চলীয় তুর্কিস্থান বলতে বারবার চাইনিজ তুর্কিস্থানের উল্লেখ করেছে পশ্চিমাঞ্চলীয় তুর্কিস্থান থেকে একে পৃথক করতে; পশ্চিমাঞ্চলীয় তুর্কিস্থান মধ্য এশিয়ার অংশ যেটাতে রাশিয়ার অংশের সমরখন্দ ও বোখারা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
১২.  মহারাজা রণবীর সিং জরিপের যে কোন কাজে ইন্দু অতিক্রম করে গিলগিট এলাকা ও তার পেছনের অংশকে বাইরে রাখতে আগ্রহী ছিলেন।
১৩. কারাকোরাম পাসের পূর্বদিকের কিছু সীমান্ত এলাকা ১৮৫৬-৫৭ সালের দিকে সোলজেন্টহোয়াই ভ্রাতৃদ্বয় অনুসন্ধান করে বেড়ান। সে সময় আনুষ্ঠানিক নীতি প্রণয়নে এ জার্মান ভ্রমণকারীদের অত্যল্প প্রভাব ছিলো। তাদের তিন ভাই-এর মধ্যে একজন, অ্যাডল্ফ ১৯৫৮ সালে কাশগড়িয়াতে খুন হন, যে কারণে খুব স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ ভ্রমণকে এ পথে নিরুৎসাহিত করা হতো। H., A., & R von Schlagintweit, Result of a Scientific Mission to India and High Asia, 4 vols., London and Leipzig 1861-66 দ্রষ্টব্য।
১৪. জনসন মানচিত্রের জন্য A. Lamb, The Sino-Indian Border in Ladakh, Canberra 1973, p. 113 দ্রষ্টব্য। জনসনের জন্য দেখুন: Alder, Northern Frontier, op. cit., p.32।
১৫. চুক্তির ৪ নং ধারায় মহারাজা এই বিষয়ে একমত হয়েছিলেন যে বৃটিশদের সম্মতি ছাড়া তিনি তাঁর এলাকার সীমানা ভঙ্গ অতিক্রম করবেন না। কিন্তু জনসনের জরিপ কি তা-ই করেনি? এটা একটা বৃটিশ অপারেশন ছিলো বলে অবশ্য যুক্তি দেখানো যেতে পাওে যার ফলে মহারাজার কিছুই করার ছিলো না। চুক্তির ৫ নং ধারামতে মহারাজা তাঁর বৈদেশিক নীতি তত্ত্বাবধানের অনুমোদন দিবেন, কিন্তু এ ধারা ছিলো অস্পস্ট এবং এটা প্রমাণিত যে, ১৮৬৪ সালে খোটানে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিলো সে বিষয়ে চুক্তিতে কোন উল্লেখ ছিলো না। এটা বিশেষ করে জম্মু ও কাশ্মীরের সাথে বৃটিশ এলাকার অন্যান্য রাজ্যের মধ্যে বিরোধের দিকেই যাচ্ছিলো। চুক্তির ৭ নং ধারামতে মহারাজা ভারত সরকারের অনুমোদন ব্যতীত কোন বৃটিশকে তাঁর চাকুরে হিসেবে নিয়োগ দিতে পারবেন না। মহারাজা কি জনসনকে নিয়োগ দিয়েছিলেন? সম্ভবতঃ; কিন্তু এক্ষেত্রে বিভিন্ন যুক্তি প্রদর্শন করা যায়। জনসন যখন খোটানের উদ্দেশে বের হন তখন তার কাছে চাকরির বিষয়ে মহারাজার প্রতিশ্রুতি  ছিলো - এটা আগে থেকেই জানা রয়েছে। কিন্তু তিনি জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের কোন আনুষ্ঠানিক পদ গ্রহণ করেননি, কিছু দিন পর যে সময় পর্যন্ত না তিনি বৃটিশ চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। ১৮৭২ সালে তাকে লাদাখের ওয়াজির (গভর্নর) নিয়োগ করা হয়।
১৬. কাশ্মীর জরিপের ফলাফল ভারত সরকার কর্তৃক ১৮৬৮ সালে কাশ্মীর এটলাস শিরোনামে একটি চমৎকার কাজ হিসেবে প্রকাশ করা হয়। এটাতে জনসনের সীমানায় শহিদুল্লা ও কারাকোরাম পাসের উত্তরে আরো দূরবর্তী অঞ্চল পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যদিও ভারত সরকার ১৮৬৮ সালে বা অন্য কোন সময় জনসন সীমানাকে বৃটিশ উচ্চাকাক্সক্ষার প্রকৃত প্রকাশ বলে স্বীকার করেনি। তবে জনসনের মানচিত্রের চেয়ে ভালো মানচিত্র এখন পর্যন্ত নেই। জনসন সীমানা পরিত্যক্ত হওয়ার পরও জনসন জরিপের কিছু বিষয় মানচিত্র অঙ্কন বিদ্যায় বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত টিকে যায়। Lamb, Ladakh, op. cit. Chapter I এ জনসন জরিপের কিছু তাৎপর্যপূর্ণ সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। 

কমেন্ট করুন
ব্যবস্থাপক |

সদস‍্য, সম্পাদনা পর্ষদ, প‍্যাপাইরাস

প্রাক্তন শিক্ষার্থী

পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সেশন:১৯৯৯-২০০০

রোকনুজ্জামান

সদস‍্য, সম্পাদনা পর্ষদ, প‍্যাপাইরাস প্রাক্তন শিক্ষার্থী পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেশন:১৯৯৯-২০০০

0