কাশ্মীর এক বিতর্কিত উত্তরাধিকার: ১৮৪৬-১৯৯০ (১ম খণ্ড : চতুর্থ অধ্যায়)

গিলগিট ইজারা

(পূর্ববর্তী সংখ্যায় প্রকাশের পর)

ইয়াকুব বেগ আমল সূচনার পর ১৯২৮ সালে জিনঝিয়াং এর নতুন চিন শু-জেন প্রশাসন শুরু থেকে উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্ত সংজ্ঞায়িত করা সংক্রান্ত সমস্যার বিষয়ে আরও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে যা চায়না জাতীয়তাবাদের পুনর্জাগরণকেই প্রতিফলিত করে। এটা কুমিনতাং বা চায়না জাতীয়তাবাদি দল (Chinese Nationalist Party – CNP) এর শুরুর দিকের একটা সাধারণ চিত্র। কুমিনতাং এর নেতৃবৃন্দ বৃটিশদের চায়না শক্তি ও ঐক্যের ঐতিহ্যগত শত্রু বলে বিবেচনা করতো। তাদের সন্দেহ ছিলো যে বৃটিশরা কাশগড় এ মুসলিম বিক্ষোভের ঢেউকে উস্কে দিয়ে পিকিং কর্তৃপক্ষের ভিত্তি দুর্বল করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে।কাশগড় কর্তৃপক্ষের দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো যে, ভারত সরকারের এজেন্ট কারাকোরাম এর দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল অতিক্রম করে প্রবেশ করবে; আর এ কারণে চায়নারা এ অঞ্চল আরো নিবিড়ভাবে নজরদারি ও পাহারাদারির আওতায় নিয়ে আসে।

১৯২৯ এর গ্রীষ্মে মূল কারাকোরাম জলবিভাজিকার দিকে ইয়ারখন্দ ও কারাকোশ নদী উপত্যকায় প্রায় ৭০০ সৈন্যের একটি চায়না সামরিক দলকে নিয়োগ করা হয়; জিনঝিয়াং কর্তৃপক্ষের মতানুসারে এটা ছিলো বৃটিশ দখলের হুমকিকে নিরাশ করার একটা প্রচেষ্টা; এবং তাদের পেছনে শহিদুল্লা’য় স্থায়ী সৈন্য শক্তির সমাবেশ ছিলো। ১৯৩০ সালে যখন হুনজা মির-এর প্রতিনিধি কাশগড়ে বার্ষিক নজরানা প্রদান করতে উপস্থিত হন, তখন শহরের প্রধান কর্তৃপক্ষ, মা শাও-উ ঘোষণা করেন যে, রাসকাম বা তাঘদুম্বাশ পামির-এ মির-এর কোন অধিকার নেই। তিনি ঘোষণা করেন যে, মূল জলবিভাজিকার ‍উত্তরাংশে গবাদি পশু চরালে চায়নারা এর জন্য কর ধার্য করবে। তিনি মির-এর প্রতিনিধিবৃন্দকে এটাও বলেন যে, হুনজা’র লোকজন রাসকামে চাষাবাদ চালিয়ে যেতে পারবেন কেবল মাত্র যদি তারা নিজেদের চায়নার নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে নিতে রাজি থাকেন। চীন যে এ বিষয়টা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে তা বোঝা যায় যখন তারা হুনজার দু’জন অধিবাসীকে আটক করে যারা বৃটিশ ভারতীয় পরিচয় পত্র নিয়ে কাশগড় ভ্রমণ করছিলো। পরবর্তীতে তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হয় শুধুমাত্র তখনই যখন তারা তাদের এই পরিচয়পত্র হস্তান্তর করে ও একটা ফি প্রদানের মাধ্যমে চায়না পরিচয় পত্র গ্রহণ করে। এ ধরনের প্রেক্ষাপটের বিপরীতে অবশ্যম্ভাবীভাবে ১৯৩০ সালে কাশগড় কর্তৃপক্ষ ও বৃটিশ কনস্যুলেট জেনারেল-এর মধ্যে সমঝোতা শুরু হয় (কাশগড় ১৯১০ সালেই কনস্যুলেট এ উন্নীত হয়); আপাতদৃষ্টিতে এটা ছিলো আগাম প্রতিরোধ ব্যবস্থা যেটাকে ভারত সরকার হুনজায় বৃটিশ অবস্থানের প্রতি চায়না চ্যালেঞ্জের প্রথম ধাপ বলে ব্যাখ্যা করে। বৃটিশ পক্ষের প্রতিনিধিত্বকারী জর্জ শেরিফ ইঙ্গিত দেন যে, বৃটিশ ভারত সীমান্তের জিনঝিয়াং পাশের রাসকাম ও তাঘদুম্বাশ পামিরের উপর সম্ভবত চায়না সার্বভৌমত্ব মেনে নেয়া হবে (যেটা শেরিফ ও চায়না উভয় পক্ষই চায়নার তাঘদুম্বাশ পামির বাদে ১৮৯৯ এর প্রস্তাব হিসেবে বিবেচনা করেছিলো; সে সময় পর্যন্ত শিমশাল পর্বতাঞ্চল ও দারওয়াজা এলাকার রাসকাম অঞ্চলে কার্জনের ১৯০৫ এর পরিবর্তন ধাপ সম্পর্কে চায়নারা অবহিত নয় বলেই মনে হচ্ছিলো)। শেরিফ একটা বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন যে, হুনজা’র মির সম্ভবত তাঘদুম্বাশ পামিরে গবাদি পশু বিচরণকারীদের উপর কর আদায় জোর করেই অব্যাহত রাখবেন; কেননা এটা পরিমাণে কম হলেও তাঁর সম্মানের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। চীন এ ধরনের আলোচনা প্রস্তাবের বিপরীতে পরিষ্কার ভাবে জানিয়ে দেয় যে, এক্ষেত্রে সমস্যার মুখোমুখি হলে তারা সমাধানের জন্য যে কোন বিধিসম্মত সমাধান এড়িয়ে যাওয়াটাই পছন্দ করবে; এবং অবশ্যই মুখ রক্ষার মতো কোন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। ১৯৩৩ সালের এপ্রিল মাসে চিন শু-জেন শাসন পতনের পর জিনঝিয়াং যখন বড় সংকটের মুখোমুখি হয় তখনও কনস্যুলেট-জেনারেল ও কাশগড় কর্তৃপক্ষের মধ্যে এ ধারাতেই আলোচনা চলছিলো।

জিনঝিয়াং ইতিহাসের এ মাইলফলকের প্রেক্ষাপটটা আসলে বেশ জটিল। ইয়াং তেং-শিন এর গুপ্তহত্যার পর মুসলিম বিদ্রোহ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং ১৯৩৩ সালের এপ্রিল মাসে চিন শু-জেন এর পতনের সাথে সাথে কিছু সময়ের জন্য এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছিলো যেন মনে হচ্ছিলো সম্পূর্ণ রাজ্য হয়তো চায়না মুসলিম (তুনগান অথবা হুই) এবং তুর্ক সেনাপতিদের অধীনে বেশ কয়েকটি সামন্তে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে নেতৃস্থানীয় ছিলেন তুনগান কমান্ডার মা চুং-ইং। ১৯৩৪ সাল নাগাদ জিনঝিয়াং এর বৃহত্তর অংশ কম বেশি অনিরাপদ ভাবে হলেও ব্যতিক্রমী সমরবাদী শেং শি-সাই এর নিয়ন্ত্রণে আসে, যিনি ছিলেন চিন শু-জেন এর প্রধান সেনাপতি। ১৯৩৩ সালের জুলাই মাসে মা চুং-ইং কাশগড় থেকে পামির অতিক্রম করে সোভিয়েত ইউনিয়নে পালিয়ে যান। (সোভিয়েত ইউনিয়নে তার পরবর্তী অদৃষ্ট অজানাই থেকে যায়, খুব সম্ভবত স্তালিনের হাতে তিনি নিহত হন।)

১৯৩৪ সাল থেকে ১৯৩৭ সালের মধ্যে জিনঝিয়াং এর এক অংশ শেং শি-সাই এর হাতছাড়া হয়ে যায়। তারিম বেসিন এর দক্ষিণ ধার বরাবর কানসু সীমান্ত থেকে ইয়ারখন্দের কয়েক মাইল ভেতর পর্যন্ত মা চুং-ইং এর আত্মীয় (ভগ্নিপতি বা শ্যালক) মা হু-শান খোটানকে ভিত্তি করে একটা স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করে (তুনগানিস্তান)। ১৯৩৭ সালে পরাজয় না হওয়া পর্যন্ত মা হু-শান ছিলেন কাশগড়তে পশ্চিম থেকে শেং শি-সাই এর অবস্থানের জন্য স্থির চ্যালেঞ্জ এবং পুরো রাজ্য জুড়ে মুসলিম বিদ্রোহীদের জন্য এক উদ্দীপনা।

জিনঝিয়াং এর নতুন অবস্থা ভারত সরকারের কাছে উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্ত নিরাপত্তা বিষয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন দু’টি হুমকি নিয়ে উপস্থিত হয়।

প্রথমত, শেং শি-সাই এর সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিলো বলে জানা যায়। তিনি রুশদের থেকে পরামর্শ পেতেন এবং সুনির্দিষ্ট ক্রান্তিলগ্নে রুশ সৈন্যরা তাকে সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসতো। রুশ ভূতত্ত্ববিদরা জিনঝিয়াং এ খনিজ সম্পদের খোঁজ করতেন। ১৯৩৫ সালে জিনঝিয়াং সরকার মস্কোর কাছ থেকে একটা বড় পরিমাণ ঋণ গ্রহণ করে। এ সমস্ত প্রাপ্ত তথ্য প্রমাণ একটা বিষয় নির্দেশ করছিলো যে শেং শি-সাই এর অধীন রাজ্যটি সোভিয়েতের একটি পুতুল রাষ্ট্রে পরিণত হবে যদি না এটা সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। এটা যদি সত্যি হতো, তাহলে ১৮৬০ এর দশক থেকে কিছু বৃটিশ কৌশলবিদ উত্তরাঞ্চলীয় তুর্কিস্তানের উপর চূড়ান্তভাবে রাশিয়ার আধিপত্য বিস্তার লাভের যে দুঃস্বপ্ন দেখতো তা অন্ততঃ সত্যে পরিণত হতো। যে উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্ত সকল কুটনৈতিক প্রচেষ্টায় ১৮৯৫ সালের পামির চুক্তির মূলে ছিলো এবং কাশগড়ের বৃটিশ প্রতিনিধিদের অর্জন ছিলো, তাই এখন বৃটিশ ভারত সাম্রাজ্যকে এমন এক অঞ্চল থেকে বিভক্ত করছে যা কি না কম-বেশি প্রত্যক্ষ রুশ প্রশাসনভুক্ত। কারাকোরামের ভয়ানক ভৌগলিক অবস্থায় খুব সম্ভবতঃ সামরিক বাহিনীকে প্রত্যাহার করা হয়েছিলো, ফলে যে কোন ব্যক্তির জন্য যাতায়াতে পর্যাপ্ত কোন বাঁধা ছিলো না। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক ভাবে শঙ্কা ছিলো যে, রুশ চররা খুব সহজেই বৃটিশ ভারতে প্রবেশ করে ভারতীয় রাজনীতিবিদদের মাঝে বলশেভিক ‘ভাইরাস’ ঢুকিয়ে দিবে যা বৃটিশদের দৃষ্টিতে বিপজ্জনকভাবে সংক্রমিত হবে।

দ্বিতীয়ত, লাদাখ থেকে পুরাতন চুক্তি সড়কের চায়না প্রান্তে খোটান অঞ্চলে মা হু-শান এর অধীনে তুনগানদের অবস্থানও বিপদমুক্ত নয়। তুনগান সৈন্যদের উত্তরাঞ্চলীয় লাদাখে প্রবেশের সম্ভাবনার যে ঝুঁকি তা সব সময়ই বিদ্যমান, কারণ এ অঞ্চলে কোন বৃটিশ সামরিক শক্তি নেই, এবং প্রকৃতপক্ষে ১৮৯৯ বৃটিশ নোটের নির্দেশনা ব্যতীত কোন সীমানা সংজ্ঞায়িত করা নেই। তাহলে যদি শেং শি-সাই কর্তৃক পরাজিত হয়ে তুনগানরা এই রুট ব্যবহার করে ভারতে পালিয়ে আসে তাহলে কী হবে? শেং এর বাহিনী কি এদের তাড়া করে আসবে? আগেকার দিন হলে সরকার অগ্রসর হওয়ার নীতি অবলম্বন করতো; এ ধরনের সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সংঘাতপূর্ণ এলাকায় প্রত্যক্ষ প্রভাব বিস্তার করতো। কিন্তু ১৯৩০ এর দশকে অর্থনৈতিক মন্দা আর মহাযুদ্ধের পরবর্তী বৃটিশ সাম্রাজ্য সংকোচনের এ অবস্থায় এ ধরনের পদক্ষেপের প্রশ্নই উঠে না।

(চলবে)         

১.  কাশগড়ের বৃটিশ কনস্যুলেট-জেনারেল আনুগত্যে বিভক্ত হয়ে পড়েছিলো। কনস্যাল-জেনারেল প্রায় সব সময়ই ভারত সরকার-এর রাজনৈতিক দপ্তর থেকে নিয়োগ পেতো। কিন্তু সে সময় চীনের কনস্যুলার সার্ভিসের একজন অধ্বস্তন কর্মকর্তা এ দায়িত্বে ছিলেন যার চূড়ান্ত পেশাগত ঊর্ধ্বস্থানীয় পদমর্যাদায় ছিলেন চীনের বৃটিশ মন্ত্রী (১৯৩৫ এর পর থেকে যাকে অ্যাম্বাসেডর বলা হয়)।
২.  শেং শি-সাই ১৮৯৫ সালে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় চীনের লিয়াওনিং-এ জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জাপানে পড়ালেখা করেন এবং ১৯১৭ সাল থেকে ১৯২৭ সাল পর্যন্ত চীনে খুব সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য অবস্থান করেন; পরে চীনে ফিরে এসে কুমিনতাং উত্তরাঞ্চলীয় অভিযানে চিয়াং কাই-শেক এর সাথে যোগ দেন। তিনি ১৯২৯ এর শেষে অথবা ১৯৩০ এর শুরুতে চিন শু-জেন বাহিনীর সদস্য হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৪৯ সালে চীন মূল ভূখণ্ডে কুমিনতাং পরাজয়ের পর তিনি অবসর নিয়ে তাইওয়ান চলে যান।
৩.  মা চুং-ইং এর জিনঝিয়াং অভিযানের প্রাণবন্ত বর্ণনা Seven Hedin, Big Horse’s Flight: the Trail of War in Central Asia, London 1936 দ্রষ্টব্য।
৪.  রাশিয়ায় মা চুং-ইং এর অবস্থানও বৃটিশ দুঃশ্চিন্তার কারণ ছিলো (যদিও সেখানে তার পদমর্যাদা সম্পর্কে কিছু জানা যায় না)। এটা মনে করা হচ্ছিলো যে, রুশরা তাকে দ্বিতীয় তুরুপ হিসেবে হাতে রেখেছে। জিনঝিয়াং এর তুর্ক উপজাতি বিদ্রোহী কর্তৃক যদি শেং শি-সাই কে উচ্ছেদ করা হয় তাহলে স্তালিনের অস্ত্র হিসেবে মা চুং-ইং এর পুনর্আবির্ভাবের সম্ভাবনা ঘটতে পারে এবং সোভিয়েত প্রভাব নিয়ে ইসলামিক অঞ্চলে নেতৃত্ব দিবে।
    ১৯৩৫ সালের মধ্যভাগে লন্ডনে ভারত দপ্তরের এ বিষয়ে স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি ছিলো, যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সোভিয়েতরা “রাজ্যের উপর বাস্তবিক নিয়ন্ত্রণ অর্জন করেছে।” L/P&S/18/C 211, India Office Political Department Memorandum, 18 June 1935 দ্রষ্টব্য।
৫.  ১৯৩৪ সালে এ ধরনের সম্ভাবনা দেখা দেয় যখন খোটানের একজন আমির মোহাম্মদ আমিন তুনগানের হাত থেকে বাঁচতে লাদাখ পালিয়ে যান। এটা মনে হচ্ছিলো যে, জিনঝিয়াং এর দোদুল্যমান রাজনীতির হাওয়া সহজেই জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের গায়ে এসে লাগতে পারে।
কমেন্ট করুন
ব্যবস্থাপক |

সদস‍্য, সম্পাদনা পর্ষদ, প‍্যাপাইরাস

প্রাক্তন শিক্ষার্থী

পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সেশন:১৯৯৯-২০০০

রোকনুজ্জামান

সদস‍্য, সম্পাদনা পর্ষদ, প‍্যাপাইরাস প্রাক্তন শিক্ষার্থী পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেশন:১৯৯৯-২০০০

0