অস্পৃশ্যতার_প্রেমকুঞ্জে

শহরের ব্যস্ত কোনো এক রাস্তার শেষ সীমানায় পড়ে থাকা একটা ডাস্টবিন। প্রতিদিন সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মী এসে ভাগাড়টা ঝাটিয়ে নিয়ে যায়। কাজটি খুব গতানুগতিক আর বিরক্তিরও বটে। তবে বেঁচে থাকার তাগিদে সব বিরক্তিই যে সাচ্ছন্দ্যে বরণ করে নিতে হয় তা এদের থেকে ভালো কে বা জানে। রাশেদা বানু। বয়স বিশ কিংবা একুশ। বাবা মারা যাওয়ায় সৎ মা বিয়ে দিয়েছিল বেশ তড়িঘড়ি করেই চল্লিশোর্ধ্ব এক ব্যক্তির সঙ্গে। তখনো পুতুল খেলাটাও ঠিকভাবে রপ্ত হয়নি, এমনই বয়স হবে। স্বামীর আর্থিক অসংগতি না থাকলেও চরিত্রে মা ভবানি বাসা বেঁধেছিল।চোলাই, গাঁজা কিছুই বাদ রাখেনি। ওকেও খুব মারধোর করতো। টাকার জোগানের জন্য অনৈতিক কিছু করতে গিয়ে ধরাও খেয়েছে। ব্যস! নিশ্চিন্ত হাজতবাস!

ওদিকে রাশেদা তার সন্তান নিয়ে না খেয়ে মৃতপ্রায় অবস্থা। হন্যে হয়ে কাজ খুঁজতে খুঁজতে শেষমেশ এখানেই গতি হলো। যে মজুরি পায় সেটা মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণে পর্যাপ্ত না হলেও অভুক্ত না থাকার জন্যে যথেষ্ট। মৌলিক চাহিদা থাকে ঐ চার দেওয়ালের মধ্যে, সুশীল সমাজে। এখানে তাদের দর্শন মিলবে না! অন্নই এখানে সর্বেসর্বা। মাঝে মাঝে তিনিও বিমুখ হন! যাক সে কথা। প্রতিদিন সকালে একটা ময়লা বহনকারী গাড়ি এসে দাঁড়ায়। রাশেদা তার সাথে দুজন সহকারী মিলে কন্টেইনার থেকে সেগুলো গাড়িতে তোলে। গাড়ির ড্রাইভার গ্লাস আটকিয়ে গাড়িতেই বসে থাকে আর রাইট সাইডের লুকিং গ্লাস দিয়ে রাশেদাকে দেখার চেষ্টা করে প্রতিদিনই। প্রথম প্রথম রাশেদা বিষয়টা ধরতে না পারলেও হঠাৎ একদিন সেও বুঝে ফেলে। ব্যাপারটা তার কাছে বিব্রতকর ঠেকে। একদিন রাগ করেই সামনে এগিয়ে ছেলেটাকে নামতে বললো গাড়ির ভেতর থেকে। ও হাসতে হাসতেই একখানি পানের খিলি নিয়ে গাড়ি থেকে বের হয়ে বললো, “খাবি?”

“না”, খুব বিরক্তি নিয়েই জবাব দিলো রাশেদা। কিন্তু কিছু না বলে আবার ফিরে গিয়ে নিজের কাজ করতে লাগলো।

ছেলেটার নাম কামরুল। রাশেদার সমবয়সীই হবে। সারাক্ষণ মুখে একটা হাসি লেগেই লাগে। অমন নিশ্চিন্ত, সহাস্য বদনে পান চিবানো দেখে যে কোনো মানুষের ঈর্ষার উদ্রেক হতে বাধ্য। কিছু মানুষ থাকে যাদের মন মানসিকতাগুলো ইকোনমিক ক্লাসের! আর ঐ মন দিয়েই ওরা বিজনেস ক্লাসের মজা লুফে নেয় অনায়াসে।

যাইহোক, এভাবে প্রতিদিন দেখা হতে থাকা একটা মানুষকে কতক্ষণ দূরে রাখবে রাশেদা! কথা বললো একদিন। ওদের কথায় কোনো রসের ছিটেফোঁটাও নেই। অশিক্ষিত মানুষগুলো ওভাবে বলতেও জানেনা। এদের ভাবগুলো তাই দিনের আলোতে যেমন, আলো ফুরালেও তেমন। কামরুল নিজেও বিবাহিত। তাই অবান্তর ভাবনা উদয় হওয়া নেহাৎ অলস সময় পার করা ছাড়া কিছুই ভাবে না ও।এভাবেই দিন চলতে থাকে। মাঝে মধ্যে সে নিজের বাড়ি থেকে বউয়ের পুরানো শাড়ি, কাপড় লুকিয়ে দিতো রাশেদাকে। মাঝে মাঝে উপর মহল থেকে কামরুলের রুট পরিবর্তন হতো শহরের অন্য প্রান্তে। তখন ওদের দেখা হতো না। রাশেদার অবচেতন মনে তখন মনে পড়ে যেত হুট করেই।পরক্ষণেই নিজের সত্তাই তার পাপবোধকে জাগিয়ে দিতো।

গত বর্ষায় কামরুল আবার ওর সেই পুরানো জায়গায় বদলি হলো। কিন্তু রাশেদা বেশ কিছুদিন যাবত কাজে আসছে না। অবস্থা এমন যে সে কাউকে সরাসরি মুখ ফুটে জিজ্ঞাসাও করতে পারছে না। পরে সে জানতে পারলো রাশেদার স্বামী মারা গেছে। ও বাড়ি চলে গেছে। জেল থেকে মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পেয়েছিল বটে। কিন্তু নেশা তো! নেশায় তো মুচলেকা খাটে না। শেষে লাংস ড্যামেজ হয়ে মারা গেছে।

হাই ভলিউমে লালনের একখান দেহতত্ত্বের গান ছেড়ে দিয়ে ময়লা ভর্তি গাড়ি খানা শা শা করে নদীর সীমানায় টেনে নিয়ে যাচ্ছে কামরুল। আজ অজান্তেই মনের কারখানায় অন্ধকার নেমেছে ওর!মানবমন এজন্যই বিচিত্র। নিজের কষ্ট সহাস্য বদনে মেনে নেওয়া মানুষগুলিও অন্যের বেলায় থমকে যায়! অন্যকে জাপটে ধরা অন্ধকার এদেরকেও যেন দূর থেকে চপেটাঘাত করতে থাকে বিরামহীনভাবে।

দিনশেষে বাড়ি ফিরলো কামরুল। কামরুলের বউ সেজেগুজে বসে ছিল। এটা আজকের নতুন কোনো চিত্র নয় বরং রোজদিনকার চিত্রায়নের প্রতিচ্ছবি। কিছু কিছু মানুষ থাকে তারা যে সুন্দরী নয় এটা তারা মানতে নারাজ। তাই এই আয়োজন। তবে কামরুলের নিরুত্তাপ ভঙ্গিতে সবকিছু অগ্রাহ্য করা ওর বউ কিছুতেই মেনে নিতে পারলো না। দুজনেই দুদিকে মুখ করে শুয়ে পড়লো বটে তবে ঘুম এলো না। একজনের রাগ মিশ্রিত অভিমান, অন্যজনের নিষিদ্ধ আকাঙ্খার বিষাদময় যন্ত্রণা মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছিলো অন্ধকার ঘরের প্রতিটা কোনায়। সকালে যথারীতি নিজের কাজেই বের হলো। আজ রাশেদার জায়গায় অন্যকাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এটাও বুঝা গেলো নতুন মুখের উপস্থিতিতে।

দিন শেষে রাত নামে। এই সাইকেলেই দিন গড়িয়ে মাস এগিয়ে যায়। ক্যালেন্ডারের পাতাও ঘুরতে থাকে নতুন দিনের খোঁজে।

সেদিন কামরুল বাজার করে ফিরছিল। হঠাৎ একটা ফার্মেসির সামনে জটলা দেখে একটু এগিয়ে গেল। একটু উঁকি দিয়ে দেখলো ভিতরে একটা মহিলা একটা বাচ্চা কোলে নিয়ে বসে আছে। মনে হচ্ছে খুব মারধোর করা হয়েছে। মারের চোটে ত্যানা কাপড় ছিড়ে গিয়ে অর্ধনগ্ন অবস্থা। লোকজনের কথাবার্তা শুনে বুঝতে কষ্ট হলো না, দোকান থেকে ঔষুধ নিয়ে টাকা না দিয়েই দৌড় দিয়েছিলো। পরে লোকজন ধরে এমন অবস্থা করেছে। মাথার উপর দিয়ে চুলগুলো সামনে ঝুলছিল। তাই মুখ দেখা যাচ্ছিল না। একটা অস্ফুট গোঙানি বের হচ্ছিল থেমে থেমে। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চলেই আসছিল কামরুল। দু’পা এগোতে শাড়ির মলিন আঁচলখানা ওর চোখে বিধলো। খুব চেনা চেনা লাগছে! এমন একটা শাড়ি গত ঈদে নিজের বউকে কিনে দিয়েছিলো ও। আর পুরোনো হয়ে গেলে ওখানা রাশেদা কে…। মুহূর্তে একটু থতমত খেয়ে গেলো। এবার একটু ভয়েভয়ে কাছে গিয়ে ভালো করে দেখার চেষ্টা করলো। যা ভেবেছিলো তেমনটাই হলো। কিন্তু এভাবে তো ফিরে আসার আশা করেনি ও। এমন এক পরিস্থিতি, যে নিজেকেই সান্ত্বনা দিতে পারছে না। পারছে না ভিড় ঠেলে সবার সামনে থেকে তাকে উদ্ধার করতে। আশেপাশে পরিচিত মানুষজনও কম নেই। সমাজে পরিচিত মানুষজন পাশে থাকা যেমন সৌভাগ্য তেমনি কখনো এরাই আবার কোনো কাজের বাধা হয়ে দাড়ায় পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ ভাবে। কামরুল একটু বুদ্ধি করেই ফার্মেসির মালিককে পাশে ডেকে ও যে ওষুধ নিয়েছে তার টাকাটা পরিশোধ করে দিলো। আর অনুরোধ করলো যেন ওকে ছেড়ে দেয়। মালিক কোনো প্রশ্ন না তুলেই টাকা পেয়েই ওর কথা রাখলো। লোকজন একটু ফাঁকা হয়ে যাবার পর কামরুল ওর সাথে কথা বলতে চাইলো। রাশেদা ভয় পেয়েই লম্বা পা ফেলে হাঁটা শুরু করলো। একবার ফিরেও তাকালো না।

এটাই সম্ভবত ওদের শেষ দেখা। কামরুলের মেয়ে ক্লাস থ্রিতে উঠেছে। প্রতিদিন কাজ শেষে বাড়ি ফিরলে মেয়েকে কোলে নিয়ে বাপ মেয়ের খুনসুটি জমে। আর মাঝে মধ্যেই, মেয়ে গল্প বলে ওদের স্কুল গেটে বসে থাকা এক পাগলি বুড়ির।

“জানো বাবা, আমার সাথে বুড়িটা কথাও বলে।

আমি কিছু বুঝি না। ও তো খেতে পায় না। তাই আমি মাঝে মাঝে ওকে টিফিন বক্স থেকে ওকে কিছু দিয়ে দিই। তুৃমি মাকে আবার বলো না কিন্তু।” মেয়েটা বলেই চলে।

কামরুল হাসিমাখা মুখের সমান্তরালে ছুটে চলে সাত-আট বছর আগের কয়েকটা মাসের জন্য!

বারবার মেয়ের মুখে এমন শুনতে শুনতে একদিন নিজেই মেয়েকে স্কুলে এগিয়ে দেওয়ার ছলে গেলো।

স্কুলের সামনে যাত্রী ছাউনির নিচে একবুড়ি শুয়ে আছে। কনকনে ঠান্ডায় ছেড়া কম্বল জড়িয়ে।স্টেশনারি দোকানের মালিক ওকে ডাকছে। কিন্তু সাড়া নেই। অনেক ডাকাডাকিতে সাড়াশব্দ না মিললে দোকানি বাধ্য হয়ে পাশের চেম্বার থেকে এক চিকিৎসককে অনেক অনুরোধ করে নিয়ে আসলো। চিকিৎসক এসে সেটাই জানালো যেটা ধর্তব্য হয়ে গিয়েছিল সকলের কাছে! কামরুল দোকানির কাছে জানতে চাইলে সে জানালো যে, অনেক মাস হলো এই পাগলী এখানে থাকতো। নাম ধাম কিছু জানা নেই। স্কুলের ছেলেমেয়েদের সাথে সখ্যতাও ছিল, আবার কেউ কেউ মজাও করতো।ওরা কেউ কেউ খাবার দাবার দিতো।

কামরুলের মেয়েটার কাঁদো কাঁদো অবস্থা। বাবাকে জাপটে ধরে ফুঁপিয়ে কাদছে আর বলছে,”বাবা বুড়িকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? “

মরা দেহটা লোকজন ধরাধরি করে যখন গোরস্তানের উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দিচ্ছিলো, মাথাটা কামরুলের দিকেই হেলে পড়েছিলো ক্ষনিকের জন্যে। আর তো অচেনা থাকার উপায় রইলো না। কিন্তু মুখটা দেখে বুঝবার উপায় নেই এই সেই রাশেদা বানু! মনে হচ্ছে কোনো ক্ষুধার্ত রক্তপিপাসু প্রাণী সব চুষে বের করে নিয়েছে এমন ভাবে যেন মলিন চামড়া ছিড়ে অস্থি বের হয়ে আসতে চাইছে। স্কুলের অনেক বাচ্চারই মন খারাপ। আজ থেকে কোনো পাগলি আর টিফিনের সময় হাত পেতে বসবে না বাচ্চাগুলোর সামনে। ওরা পারবে তো এখন থেকে পাগলিটাকে ছাড়া পুরোটা খাবার খেতে?

মেয়েকে স্কুলের ভিতর দিয়ে ছাউনিতে গিয়ে বসে পড়লো কামরুল। একটা সিগারেট ধরিয়ে ছাই করে ফেললো মুহূর্তেই। তবে এই ছাইগুলোর মূল্য সামাজিক মূল্যবোধের তূল্যমূল্য বিচারে বড়ই বেমানান! নিষিদ্ধতার বেড়াজালে বড়জোর এই স্থূল শরীরটাকে আটকানো সম্ভব; আত্মাটাকে আটকাবে কে?

কমেন্ট করুন
প্রাক্তন শিক্ষার্থী | সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, চুয়েট

0