গোলাপী তোয়ালে

“তোমাকে,

তোমাকে বলার ছিল,

পৃথিবীর সবটুকু সুখ যেন তোমার হয়।

বলার ছিল,

শরতের নীল আকাশটা তোমায় দিলাম।

বলার ছিল,

গ্রীষ্মের কাঠফাটা রোদ্দুরে এক পশলা স্নিগ্ধ বৃষ্টির পরশ হয়ে আমি তোমার জীবনে বারবার আসতে চাই।

অনেক সাহিত্য হল, এবার আসল কথা বলি। অনেক অনেক ভালোবাসবে আমার মেয়েকে। দুনিয়ার কোন দুঃখ যেন ওকে স্পর্শ করতে না পারে। জেনে রেখ….”

টুম্পার কেনা গোলাপী তোয়ালেতেই মেয়েকে জড়িয়ে ছিল আবীর, টুম্পা শখ করে বাচ্চার জন্য নিজ হাতে সবকিছু কিনে একটা পুতুল আঁকা ব্যাগে ভরে হাসপাতালে এনেছে, অনেক ঘুরে ঘুরে বাচ্চার জন্য ছোট ছোট জামা, তেল, সাবান, লোশন, পাউডার আরো কত কি কিনে ঘর ভরেছে।

ডাক্তার এসে বিষণ্ণ মুখে কিসব বলে গেল। কিছুই বুঝল না আবীর। মেয়েকে দাদীর কোলে দিয়ে ধপ করে হাসপাতালের মেঝেতেই বসে পড়ল।

মেয়েটাকে এক ঝলক দেখতেও পায়নি? কত স্বপ্ন বুনেছিল মেয়েকে নিয়ে! আর আজ….

ওটিতে ঢোকার আগেও টুম্পা বকা দিয়েছিল, এমন কটকটে লাল টি শার্ট কেন পরেছ? তোমার নাহয় মেয়ে হবে। খুশির খবর। কিন্তু পাশের কেবিনের বৃদ্ধা মৃত্যু পথযাত্রী। কিন্তু কে চলে গেল? কেন গেল? রক্ত রেডি ছিল। ডোনার রেডি ছিল। স্পেশালাইজড হাসপাতাল। নামকরা ডাক্তার। তাহলে? কেন?

আবার গিয়েছিল আবীর সেই হাসপাতালে, ডাক্তারকে প্রশ্ন করতে, কেন এমন হল?

ডাক্তার ওটিতে। খুব জটিল কেস। দুই ঘণ্টা পর পর ওটি থেকে একটা ফুটফুটে ছেলে বাচ্চা বের হল। যে ভদ্রলোক দুশ্চিন্তায় এদিক ওদিক ছটফটিয়ে বেড়াচ্ছিলেন তার কোলে দেওয়া হল বাচ্চাটা। ভদ্রলোক কেঁদে ফেললেন। ডাক্তার হাসিমুখে ওটি থেকে বের হয়ে বললেন, মিষ্টি খাওয়ান ছেলে হয়েছে। বাচ্চার মাও ভালো আছে। আজ আর কথা বলল না আবীর। থাকুক ডাক্তারের মুখের হাসিটা অমলিন। নাহয় অন্য একদিন জানা যাবে কেন টুম্পা আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে গেল!

চিঠিটা আর পড়তে পারেনা আবীর। টুম্পা বড্ড বেশি ছেলেমানুষি করত। এই ছেলেমানুষি দেখেই প্রেমে পড়া। দুই পরিবারের সাথে যুদ্ধ করে বিয়ে করা। অথচ যার জন্য এই যুদ্ধ সে আজ কোথায়? দারোয়ানের হাতে এই চিঠি দিয়ে গিয়েছিল টুম্পা। যদি সে না ফেরে তবে সাহেবকে দিতে। টুম্পাকে কবরস্থ করে ফিরে আসতেই দারোয়ান অধোমুখে চোখ মুছতে মুছতে চিঠিটা দিয়ে যায়। পুরোটা পড়া হয়না। এটুকু পড়েই চোখ ঝাপসা হয় আবীরের।

মেয়ে বড় হচ্ছে দাদী আর চাচীর কোলে। কেউ নাম রাখেনি। বাবুনি ডাকতে ডাকতে সেটাই নাম হয়ে যায়। দাদীর অনুরোধে নানাবাড়িতে আকিকা দেয় নানী, খালারা। নাম দেয় তাহিয়া আবেদা।

তাহিয়াকে হাসপাতালে প্রথম ও শেষবার কোলে নিয়েছিল আবীর। তারপর আর ছুঁয়েও দেখেনি। মাঝরাতে কেঁদে উঠলে অদ্ভুত কষ্ট হত আবীরের। তাই দাদীর সাথে গ্রামে পাঠানো হয় মেয়েকে।

আবীরের ব্যবসা ধীরে ধীরে উন্নত হতে থাকে। বিদেশেও শাখা চালু হয়।  আবীরের ধ্যান জ্ঞান হয়ে ওঠে ঐ ব্যবসা। বেশিরভাগ সময় অফিসেই থাকে। রাতে ঘণ্টা চারেক ঘুমায়। দাদীর সাথে ফোনে রোজ কথা হয় বাবার কিন্তু তাহিয়ার সাথে কথা হয় না। বুঝতে শেখার পর থেকে বাবাকে শুধু দূর থেকে দেখেছে তাহিয়া। কখনো কাছে পায়নি। কখনো ঝুঁটি নেড়ে বাবা বলেনি কিরে বুড়ি? মেলায় যাবি?

বালিশকে বাবা বানিয়ে খেলত তাহিয়া। নিজেই প্রশ্ন করত। নিজেই উত্তর দিত। দাদী একদিন দেখে ফেলে কি ভীষণ কান্না। সাথে সাথে আবীরকে ফোন করেন, কিন্তু ছেলে আসে না, বাবুনি বাবা থেকেও এতিম। কিন্তু এই ঘটনার পর থেকে আর খেলে না ওসব তাহিয়া। বরং একা একা মাঠে ঘাটে বেড়ায়। গ্রামের মেয়েরা ওকে একটু এড়িয়ে চলে। তাহিয়াও ওদের সাথে খুব একটা মেশে না। স্কুলের দুই একজন ছাড়া ওর কোন বন্ধু নেই।

স্কুলে দেখেছে বাবারা কোলে করে দিয়ে যায়, নিয়ে যায়। সাইকেলে করে দূরের গ্রামের ছেলেরা, মেয়েরা বাবার সাথে আসে। দুই টাকার নোট দেন বাবা ঝালমুড়ি খাওয়ার জন্য। তারা বলে কয়ে পাঁচ টাকা আদায় করে ! সে দেখে কিছু বলে না। একা একাই বাড়ি ফেরে। মাঝে মাঝে রিতা, স্বপ্না আসে। টুকটাক কথা হয়। সবার মায়েরা বকে, বাবা বাড়ি ফেরার আগেই হোম ওয়ার্ক শেষ হওয়া চাই। তাহিয়ার ওসব বালাই নেই।

নানী, খালারা দেখতে আসেন। অনেক খেলনা, বই, রঙ পেন্সিল, ছবির বই দিয়ে যান। কিন্তু তারা তো মা আনতে পারেন না। শহরে বেড়াতে নিতে চায়। তাহিয়া রাজি হয় না। একবার গিয়েছিল শহরে, কিন্তু তার মামাতো, খালাতো ভাইবোন কারো সাথে তার কোনকিছু মেলে না। তার পাখির বাসার মত ঝাকড়া চুল, গ্রামে সহজলভ্য সস্তা কাপড়ে বানানো রংচঙে জামা, খাবার খাওয়ার টেবিল ম্যানার না জানা খুব বড় সমস্যা তৈরি করে, পদে পদে হাসির পাত্র হয় সে, খালা, মামীরাও কতক্ষণ সামাল দেবে?  ছাদে লুডুর আসরে তাহিয়া জিতে যায়, এক মামাতো ভাই লুডুর বোর্ড ছিড়ে ফেলে চলে যায়, ভীষণ ভয় পায় তাহিয়া, তারপর থেকে আর কখনো সে ঢাকা যায় না৷ তার যাওয়ার  পিছনে একটা লুকানো  আশা ছিল হয়তো তার আসার খবর পেয়ে বাবা তাকে দেখতে আসবে, কিন্তু বাবাও তাকে দেখতে আসেনি…. কী লাভ তবে শহরে গিয়ে?

পেয়ারা গাছ থেকে পড়ে যখন হাত ভেঙে গেল সবাই এলো বাবা ছাড়া। এমনকি স্কুলের ঐ দুষ্টু বাঁদর টগরও এসেছিল। সবাই হাতে কিছু একটা এনেছিল। টগর এনেছিল পচা হাতের লেখা আর জঘন্য ডিজাইন করা Get well soon লেখা কার্ড!

টগরটা ভীষণ দুষ্টু। বলে কিনা তুই না এলে ক্লাস করতে ভালো লাগে না। দুজন একসাথে কোচিং ও করে। সেই ছোটবেলাতেই তাহিয়া বোঝে সে এই গ্রামের মেয়ে। আর এই গ্রামের কাউকেই বেছে নিতে হবে তাকে। দূর আকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্রে পা রাখবে না সে। হবে না নাসার বিজ্ঞানী, হিমালয় জয় করবে না, পদানত করবে না কোন বিদেশি শক্তিমান সেনা সদস্যকে!  উত্তাল সাগর পাড়ি দেবে না নাবিক হয়ে। হবে না দেশ সেরা ক্রিকেটার।

সে হবে নিতান্তই আটপৌরে ঘরের বৌ। খুব বেশি হলে স্কুল শিক্ষক। স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা মরে গিয়েছিল শৈশবেই। নতুন করে তাকে বাঁচতে শিখিয়েছে টগর। তার একলা একা নিস্তরঙ্গ জীবনে এক ফোটা শিশির হয়ে ঝরেছিল টগর, ঐ এক ফোটাতেই পুরো মন পুকুরে ঢেউ উঠেছিল। টগর ঢাকায় গেল পড়তে, তাহিয়া ভর্তি পরীক্ষাই দিল না, উপজেলার ডিগ্রি কলেজে ভর্তি হল, এটাই ছিল টগরের জন্য পরীক্ষা, কিন্তু টগর স্বাভাবিক যোগাযোগ রাখত, তাহিয়া ভেবেছিল ঢাকায় গিয়ে টগরও বাবার মত তাকে ভুলে যাবে… টগর আসে, বাবার মত হারিয়ে যায় না। এসে শক্ত করে হাত ধরে তাহিয়ার, নিজের করে নেয়।

টগরের ঐ কার্ডটা ঝুলছে এখন টগর, তাহিয়ার বেডরুমে। টগর এখন নামকরা গ্রাফিক্স ডিজাইনার। তাহিয়া বাচ্চাদের স্কুলের শিক্ষিকা। ভালোই চলছে ওদের সংসার। দাদী নেই পাঁচ বছর হল। নানী ভীষণ অসুস্থ। এদিকে খালারাও যে যার মত ব্যস্ত। তাহিয়ার সংসারে নতুন অতিথি আসবে। টগরের বাবা,মা, ভাই সবাই উপস্থিত। তাহিয়ার কেউ নেই।

ওটি থেকে ফুটফুটে একটা মেয়ে বের হল নার্সের কোলে। টগর কেঁদে ফেলল মেয়েকে কোলে নিয়ে। একে একে সবার কোল ঘুরল তাহিয়ার মেয়ে। আরেকজন মানুষ এসেছেন বাচ্চাটাকে একবার কোলে নিতে। টগর চিনেছে মানুষটাকে। অনেকক্ষণ ধরে বুকে জড়িয়ে রাখলেন নরম উষ্ণ শিশুটিকে। তারপর মানুষটা মাথা নিচু করে একটা গোলাপী তোয়ালে দিয়ে চলে গেলেন।

কমেন্ট করুন
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ

0