বাটারফ্লাই ইফেক্ট

আমেরিকান এসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অফ সায়েন্স’ এর ১৩৯তম অধিবেশনে গণিতবিদ এবং আবহাওয়াবিদ এডওয়ার্ড লরেঞ্জ একটি বিশেষ প্রশ্নের উত্থাপন করেছিলেন। প্রশ্নটি ছিলো এমন যে, ব্রাজিলে যদি কোনো একটি প্রজাপতি তার ডানা ঝাপটায়, তবে সেই ডানা ঝাপটানোর সুবাদে টেক্সাসে টর্নেডো হতে পারে কি না?

প্রশ্নটি শুনে অনেকেই এডওয়ার্ড লরেঞ্জকে মানসিক বিকারগ্রস্ত সাব্যস্ত করতে পারেন। কারণ- প্রথমত, প্রজাপতির ডানা ঝাপটানোর কারণে আর যা-ই হোক, টর্নেডো হতে পারে না। দ্বিতীয়ত, যদি টর্নেডো হয়েই থাকে, তবে ব্রাজিলে না হয়ে সেটা টেক্সাসে হবে কী করে! কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর: আমরা যা জানি, তা নাও তো হতে পারে। প্রজাপতির ডানা ঝাপটানোর কারণে টর্নেডো হতেও পারে। আসলে এই অদ্ভুত তত্ত্বকেই ‘বাটারফ্লাই ইফেক্ট’ বা প্রজাপতি প্রভাব বলা হয়ে থাকে।

অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে এক প্রজাপতির পাখার ঝাপটায় কিভাবে টর্নেডো হতে পারে? এর উত্তর দেয় Ripple effect। Ripple effect হলো একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে অগোচরে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনেক ঘটনা হতে পারে। যেভাবে লেকে একটি নুড়ি পাথর ফেলা হলে পরপর অনেকগুলো ঢেউ তৈরী হয়। ঢেউগলো লেকে ভাসমান কচুরিপানা গুলো নাড়িয়ে যায়। জলজ প্রাণীগুলো সেই ঢেউ অনুভব করে তাদের চলার দিক পরিবর্তন করতে পারে। এভাবে প্রকৃতিতে চেইন রিয়্যাকশন (Domino Effect) চলতে থাকবে। সুতরাং চেইন রিয়্যাকশানে এক প্রজাপতির পাখার ঝাপটায় একটি টর্নেডো হতেও পারে। “হবে না” এই কথা নিশ্চিতভাবে কেউ বলতে পারবে না।

“সাধারণত ধারণা করা হয় যে, যেসব ঘটনা পৃথিবীকে বদলে দিতে পারে, সেসবের মধ্যে আছে পারমাণবিক বোমা, উন্মাদ রাজনীতিবিদ, বড়সড় ভূমিকম্প অথবা কোনো গণআন্দোলন। কিন্তু আধুনিক চিন্তাধারার কারণে মানুষ উপলব্ধি করতে পেরেছে যে, এসব আসলে তাদের ভুল ধারণা। Chaos Theory বা বিশৃঙ্খলা তত্ত্ব অনুযায়ী, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জিনিস বা ঘটনার পরিবর্তন সমগ্র পৃথিবীর পরিবর্তন করতে পারে। একটি প্রজাপতি যখন আমাজন জঙ্গলে ডানা ঝাপটায়, তখন এর ফলে বাকি অর্ধেক ইউরোপে তখন ঝড় হতে পারে।”

–‘গুড ওমেনস’ (Good Omens)

নিউটনিয়ান বলবিদ্যা অনুসারে কোনো বস্তুর উপর প্রযুক্ত বল তার ভর এবং ত্বরণের গুণফলের সমান। এই তত্ত্ব ব্যবহার করে বিখ্যাত গণিতবিদ ল্যাপলাস বলেন যে, এই পৃথিবীর ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশের উপর যদি বল প্রয়োগ হয়ে থাকে তাহলে সেটা বিশ্লেষণ করে, সেই গতিশীল অণু পরমাণুর ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি নির্ণয় করা সম্ভব। ল্যাপলাস তার এই মতবাদ “ফিলোসফিক্যাল এসে অফ প্রবাবিলিটিস” বইতে প্রকাশ করেন ১৮১৪ সালে। তিনি এও দাবি করেন যে আবহাওয়ার পূর্বাভাস একদম নিখুঁত দেয়া সম্ভব, কারণ প্রাথমিক অবস্থায় পৃথিবীর উপাদানের উপর যে গতিশক্তি দেয়া হয়েছে সেটা নির্দিষ্ট এবং সেই শক্তির সম্পর্কে জানতে পারা গেলেই ভবিষ্যতের উত্তরগুলো পাওয়া যাবে। পরিমাপণবিদ এডওয়ার্ড লরেঞ্জ সেই মতবাদ মেনেই কাজ করছিলেন, যে কিভাবে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ এর ক্ষেত্রে আবহাওয়া পূর্বাভাস একদম নিখুঁত পাওয়া যায়।  লরেঞ্জ আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেয়ার জন্য প্রাথমিক শর্ত হিসেবে একটি গাণিতিক মান ব্যবহার করেন, যার মান ০.৫০৬। এই মান আসলে আরো একটু বিস্তৃত ছিলো, অর্থাৎ দশমিকের পরে 6 অঙ্ক ছিলো। এর মান ছিলো ০.৫০৬১২৭। তিনি যখন দশমিকের পরে ছয় অঙ্ক নিয়ে গণনা করলেন, তখন একটি মান আসলো। কিন্তু যখন দশমিকের পরে তিন অঙ্ক নিয়ে গণনা করলেন, সেই ফলাফল ছিলো পূর্বের ফলাফলের থেকে অনেকখানি আলাদা। অথচ শুধু দশমিকের পরে কেবল তিন অঙ্কই বাদ দেয়া হয়েছিলো, কিন্তু ফলাফলে দেখা গেলো অনেক পরিবর্তন।

এভাবে তিনি কম্পিউটার প্রোগ্রামে প্রায় ১২টি মান প্রদান করেন (এই মানগুলো ছিলো মূলত তাপমাত্রা, বাতাসের গতি, আর্দ্রতা ইত্যাদির)। এর থেকে লরেঞ্জ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, আবহাওয়ার পূর্বাভাসের ক্ষেত্রে মানের সামান্য পরিবর্তনের জন্য এর উপর যে প্রভাব পড়ে, সেটি মোটেও সামান্য নয়, বরং ব্যাপক। এভাবেই জন্ম নিলো বাটারফ্লাই ইফেক্ট নামক বিশৃঙ্খলা তত্ত্ব।

এই ঘটনা ছিলো ১৯৬৩ সালে, পরবর্তীতে আরো গবেষণা করে ১৯৭২ সালে তিনি তার “ডিটারমিনেস্টিক নন পেরিওডিক ফ্লো” গবেষণা প্রবন্ধে ক্যাওস থিওরী তথা বিশৃঙ্খলতার তত্ত্ব এবং বাটারফ্লাই ইফেক্ট এর কথা বলেন। তিনি সেখানে বলেন “কোন ঘটনা স্বতন্ত্রতা, ধারাবাহিক এবং সীমাবদ্ধতার শর্ত সাপেক্ষে, একটি কেন্দ্রিয় ঘূর্ণায়মান গতিপথ (ট্রাজেক্টরি) যা ক্ষণস্থায়ী বৈশিষ্ট্যমুক্ত যদি পর্যায়ক্রমিক না হয় তাহলে সেই ঘটনা অস্থিতিশীল তথা বিশৃঙ্খল। আবার একটি বিকেন্দ্রিক ট্র্যাজেক্টরি যদি পর্যায়ক্রমিক না হয় সেটাও অস্থিতিশীল হবে।“

এই তত্ত্বকে সাধারণ মানুষের বোধগম্য করতে গিয়েই লরেঞ্জ প্রজাপতি প্রভাবের ধারণা দেন। এই ধারণাকে সিস্টেমের ‘প্রাথমিক শর্তাবলীর সংবেদনশীল নির্ভরতা’ নামেও অভিহিত করা হয়। তবে এই প্রভাবকে ‘প্রজাপতি প্রভাব’ বলার পেছনে আরো একটি কারণ আছে। লরেঞ্জ যখন তার এই আবহাওয়ার পূর্বাভাস মডেল নিয়ে কাজ করছিলেন, তখন আবহাওয়ার বিভিন্ন প্রভাবক যেমন তাপমাত্রা, বাতাসের গতি বা আর্দ্রতার অনেকগুলো মান ব্যবহার করেছিলেন, সেটা আগে বলা হয়েছে।

তো তিনি দেখলেন তিনি প্রতিবারই আলাদা ফলাফল পাচ্ছেন। কিছুতেই তিনি একটি নির্দিষ্ট ফলাফল আবার তৈরি করতে পারছেন না। তিনি বিভিন্ন প্রভাবকের মানও একটু হেরফের করে দেখলেন, কিন্তু প্রতিবারই ভিন্ন ফলাফল আসতে থাকে। তার ব্যবহৃত এসব মানকে গ্রাফে বসালে এমন একটি গ্রাফ পাওয়া যায়, যা দেখতে অনেকটা প্রজাপতির মতো। এ কারণেও তার এই তত্ত্বের সাথে প্রজাপতির নাম জুড়ে গেছে।

এই ইফেক্ট এর কিছু উদাহরণ (ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত)

১. এ্যাডলফ হিটলারের নাম শোনেনি বা তার সম্পর্কে জানে না এমন মানুষও আসলে পাওয়া অসম্ভব। কিন্তু হিটলার কখনোই হিটলার হতেন না, যদি না ফাইন আর্ট একাডেমি তার আবেদনপত্র প্রত্যাখ্যান করতো। হিটলার যখন ফাইন আর্ট একাডেমিতে ভর্তি হওয়ার জন্য আবেদন করলেন, তখন তাকে সেখান থেকে প্রত্যাখ্যান করা হলো। একবার নয়, দু দু’বার। তার এই আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছিলেন একাডেমির একজন ইহুদি অধ্যাপক। যদি হিটলারকে দ্বিতীয়বারেও একাডেমি গ্রহণ করতো, তাহলেও আজ হিটলার সবার কাছে একজন স্বৈরাচারী হিটলার হিসেবে পরিচিত না হয়ে একজন শিল্পী হিসেবে পরিচিত হতে পারতেন। ইহুদীদের প্রতি তার পরবর্তীকালের অত্যাচার সকলেরই জানা আছে। এখানেও আছে এই বাটারফ্লাই ইফেক্ট। সামান্য প্রত্যাখ্যান হিটলারের জীবনের গতিপথই পাল্টে দিলো।

২. স্নায়ু যুদ্ধের সময় কিউবার উপকূলে রাশিয়া পারমাণবিক অস্ত্রবাহী সাবমেরিন মোতায়েন করে। আমেরিকার নাকের ডগায় পারমাণবিক সাবমেরিন থাকায় তারা বেশ অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়ে যায়, এরপর আমেরিকার বিমান বাহিনী এবং নৌবাহিনী ডেপথ চার্জ নিক্ষেপ করা শুরু করে যাতে সাবমেরিনটা সমুদ্র পৃষ্ঠে ভেসে ওঠে। পানির নিচে থাকা সাবমেরিন এর কর্মীরা এই ডেপথ চার্জের সিগন্যালকে মনে করে যে যুদ্ধের সংকেত বেজে গেছে। সেই অনুযায়ী তাদের উপর নির্দেশ ছিলো পারমাণবিক টর্পেডো নিক্ষেপ করা। নিক্ষেপের দায়িত্বে থাকা ভ্যাসিলি আরকিপভ সেটার বিরোধীতা করেন। এবং তার দৃঢ়তায় সে যাত্রায় আর টর্পেডো নিক্ষেপ হয় নি। সেই টর্পেডো নিক্ষেপ হলে, ইউরোপের অর্ধেক জনগোষ্ঠী বিলীন হয়ে যেত। এজন্য ভ্যাসিলি আরকিপভ কে “দ্যা ম্যান হু সেভস দ্যা ওয়ার্ল্ড” বলে ডাকা হয়।  

এছাড়াও আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বাটারফাই ইফেক্টের প্রভাব দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সামান্য একটা পোস্ট এর কারণে হামলা পর্যন্ত হয়ে যায়। সম্পর্কের ক্ষেত্রে ছোট একটা ভুল বোঝাবুঝির কারণে সেটা ভেঙে যাওয়ার নজিরও দেখা যায়। আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা একদম ভেস্তে দিতে পারে বর্তমান সময়ের একটি ভুল।

Butterfly Effect নিয়ে Ray Bradbury ‘র ছোটগল্প A Sound of Thunder পড়ে খুব ভালো লাগবে। একটি ভুল ধারণা আছে যে A sound of thunder থেকেই বাটারফ্লাই ইফেক্ট নামের জন্ম। উল্টোটা সত্যি। ছোটগল্পটি বাটারফ্লাই ইফেক্টের একটা ইলাস্ট্রেশন মাত্র।

পরিশেষে বেঞ্জামিন ফ্রাংকলিন এর চমৎকার একটি কবিতা। যেখানে দেখা যায় যে, একটা ঘোড়ার নালের জন্য একটা যুদ্ধ হেরে যাওয়া সম্ভব-

For want of a nail the shoe was lost,
For want of a shoe the horse was lost,
For want of a horse the rider was lost,
For want of a rider the battle was lost,
For want of a battle the kingdom was lost,
And all for the want of a horseshoe nail.  

তথ্যসূত্র:

কমেন্ট করুন
শিক্ষার্থী | পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শিক্ষাবর্ষঃ ২০১৯-২০

মোঃ সাবিত আল-সাবা রিয়ন

শিক্ষাবর্ষঃ ২০১৯-২০