বর্গি এলো দেশে

“ছেলে ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো
বর্গি এলো দেশে,
বুলবুলিতে ধান খেয়েছে
খাজনা দেব কিসে?”
                          – লোকছড়া

এক

কুয়োর পানিতে গোসল করে ভেজা কাপড়ে ঘরে ঢুকলো গীতা।

        প্রতিদিন বাড়ির অন্য বউদের সাথে পুকুরেই গোসল করে ও। আজ মনে হলো, কুয়ো থেকে পরিষ্কার পানি তুলে ভালো করে সাফসুতরো হতে হবে।

        এই কুয়োটা শালগাছা গ্রামের একমাত্র কুয়ো, ওর স্বামীর স্বচ্ছলতা আর বিচক্ষণতার প্রতীক। বাড়িতে দুটি পুকুর রয়েছে, চার শ ধনু (আট শ গজ) উত্তরে রয়েছে দামোদর নদী – তারপরও অনেক টাকা খরচ করে ঘরের পাশে কুয়োটি কাটা হয়েছে। গ্রামের প্রায় সবাই এখন এই কুয়োর পানি খায়।

        বছর তিনেক আগে, ১১৪৬ সালের বৈশাখে (১৭৩৯ খৃ:) মিত্র বাড়ির বউ হয়ে এসেছে গীতা। ওর বয়স তখন এগারো, আর ওর স্বামী বিকাশের বয়স ছিলো বিশ।

        গীতার শ্বশুর অনেক আগেই গত হয়েছেন। বিকাশ তখন খুব ছোট বলে ওর মা সহমরণে যাননি, বা তাঁকে সহমরণে যেতে হয়নি। বছর দেড়েক আগে তিনিও ওদেরকে ছেড়ে চলে গেছেন।

        আজ ভালো করে সাজবে গীতা। বিকাশ জরুরি কাজে বনগ্রামে গেছে, জায়গাটা এখান থেকে এক ক্রোশ  (সোয়া দুই মাইল) দক্ষিণে। সে ফিরে এসে ওকে দেখে যেন মুগ্ধ হয়। ভেবেচিন্তে গোলাপি শাড়ি বেছে নিলো ও। ধূতি স্টাইলে পরলো শাড়িটা, সবাই যেমন পরে। ঊর্ধ্বাঙ্গে পরার আকাশি কাপড়খন্ডটি হাতে নিতেই ওর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠলো।

        কিছুদিন আগেও আর সবার মতো শাড়ি পরা বলতে গীতা বুঝতো শরীরের নিচের অংশ আবৃত করা। শাড়ির কিছু অংশ বাম কাঁধে ফেলে রাখতো ঠিকই, তবে অনেকটা অলংকার হিসেবে, আবরণ হিসেবে নয়। একদিন বর্ধমান শহর থেকে ঘুরে এসে বিকাশ জানালো, ভদ্রঘরের মেয়েরা এখন ঊর্ধাঙ্গও ঢাকতে শুরু করেছে। কাপড় সেলাই করে খাটো জামা বানিয়ে পরছে তারা – একে বলা হয় ‘চোলি’। যেসব মেয়ে মনে করে সেলাই করে কাপড় পরলে অধর্ম হবে, তারা এক টুকরো কাপড় ঊর্ধ্বাঙ্গে জড়িয়ে পাশের দিকে গিঁট দিয়ে রাখে। এর কোনো নাম এখনও কেউ দেয়নি, তবে পুরানো দিনের কিছু সংস্কৃত বইয়ে একে বলা হয়েছে ‘স্তনপাট্টা’। ভারিক্কি নাম শুনে খিল্‌খিল্‌ করে হাসতে শুরু করলো গীতা। তবে, বিকাশ যখন তিন রঙের তিনটি স্তনপাট্টা (হলুদ, গোলাপি আর আকাশি) ওর হাতে দিলো, তখন আগ্রহ নিয়ে সেগুলো দেখতে শুরু করলো ও।

        সেই থেকে নিয়মিত পাট্টা পরছে গীতা। নিজে থেকে বুদ্ধি করে এক রঙের শাড়ির সাথে অন্য রঙের পাট্টা পরে ও, আজ যেমন পরেছে। ঊর্ধ্বাঙ্গ কেন ঢাকতে হবে, তা এখনও ও বোঝে না। তবে, স্বামীর যে কোনো কথাই শিরোধার্য।

        প্রথম প্রথম অন্যরা হাসতো। বলতো ‘কলিকালের ঢঙ’। এখন গ্রামের প্রায় সব বউ-ঝি পাট্টা পরতে শুরু করেছে।

        বিকাশ ওকে বলেছে, কিছুদিন পরে ওর জন্য চোলি নিয়ে আসবে। ও যখন জানতে চাইলো অধর্ম হবে কিনা, তখন সে বলেছে, “এত অল্পেই অধর্ম হলে ধর্ম টিকবে কেমন করে?”

        গত তিন বছর ধরে গীতা দেখেছে, ওর স্বামী আজ যা ভাবে, অন্যরা কিছুদিন পরে তেমন করেই ভাবতে শুরু করে। অথচ, মাঝের দিনগুলোতে সমালোচনা করতে ছাড়ে না। তবে, সবাই একবাক্যে স্বীকার করে, বিকাশের মতো বুদ্ধিমান, সাহসী ও শক্তিশালী ছেলে পুরো বর্ধমান খুঁজে আর একটা পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ।

        সিঁথিতে সিঁদুর দেয়ার সময় হঠাৎ অজানা আশংকায় গীতার বুক কেঁপে উঠলো। ওর স্বপ্নে পাওয়া রাজপুত্রকে ভগবান কেড়ে নেবে না তো! “এত নিষ্ঠুর তুমি হয়ো না ভগবান,” মনে মনে বললো গীতা। “আমার কিছু আয়ু তুমি ওর সাথে যোগ করে দাও। যদি আমাকে সন্তান দাও, বিধবার বেশে একা একা যেন সন্তান মানুষ করতে না হয়। যদি সন্তান দেয়ার আগেই ওকে তুলে নাও, আমাকে সহমরণে যাবার সাহস আর সুযোগ দিও।”

        গীতা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে, মৃত স্বামীর সাথে সহমরণে গেলে পরের জনমে তাঁকে আবার স্বামী হিসেবে পাওয়া যাবে।

        হঠাৎ উত্তর দিক থেকে ঘোড়ার ক্ষুরের আওয়াজ পাওয়া গেলো। গ্রামে ঢোকার মূল পথ ওদিকেই। একটা দুটো নয়, অনেকগুলো ঘোড়া এগিয়ে আসছে। একটু পরেই ক্ষুরের আওয়াজ পূবে আর পশ্চিমে ছড়িয়ে পড়লো। দু দলে ভাগ হয়ে গ্রামের দু দিকে গেছে অশ্বারোহী লোকগুলো।

        গীতা হঠাৎ বুঝতে পারলো, এরা বর্গি। মারাঠা দস্যুর দল। বিকাশের কাছে ও শুনেছে, বাংলার নবাব আলিবর্দি খানের কাছ থেকে খাজনা আদায় করার জন্য এরা এসেছে। মহারাষ্ট্রের নাগপুর থেকে সপ্তাহ দুই আগে এসেই এরা গ্রামে গ্রামে লুটপাট আর অগ্নিসংযোগ শুরু করেছে।

        কিন্তু, এদের তো থাকার কথা দামোদরের ওপারে, কাটোয়ায়! নবাবের সৈন্যদের সাথে বর্গিদের সেখানে যুদ্ধ চলছে। জায়গাটা এখান থেকে প্রায় চার যোজন (ষোল ক্রোশ বা ছত্রিশ মাইল) দূরে। নিশ্চয়ই সম্মুখযুদ্ধে হেরে বর্গিরা নানাদিকে ছড়িয়ে পড়ে লুটপাট চালিয়ে যাচ্ছে। একটা দল দামোদরের এপারে চলে এসেছে।

        চারিদিকে হৈ চৈ, ছুটোছুটি, কান্নার আওয়াজ। উত্তর দিকের বেড়ার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকালো গীতা। ও জানতো, ভয়ংকর একটা দৃশ্য চোখে পড়বে। তারপরও, যা দেখলো তাতে ওর গা শিউরে উঠলো।

        কয়েকটি ঘরে আগুন দিয়েছে বর্গিরা, দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুনের লেলিহান শিখা। বেশ কিছুটা দূরে মাঝ বয়সী একজন লোকের লাশ রাস্তার পাশে পড়ে আছে। লোকটি কে তা এখান থেকে বোঝা যাচ্ছে না। একটি গরু আগুনে পুড়ছে। দড়ি ছিঁড়ে ছুটে যাবার চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না। গরুটির আর্তচিৎকারে আকাশ-বাতাস কাঁপছে।

        ওদের পাশের ঘরটি বিকাশের কাকাতো ভাই সাধন মিত্রের। দুজন বর্গি দরজা ভেঙে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়লো। দূর্গা বৌদিকে ছুটে বের হতে দেখলো ও। পরক্ষণেই একজন বর্গি ছুটে এসে বৌদিকে ধরে ফেললো -।

        আর সহ্য করতে না পেরে বেড়ার কাছ থেকে সরে এলো গীতা। এই নরপিশাচগুলোও নাকি হিন্দু! একই ধর্মের লোক এত আলাদা হয় কী করে?

        ওর মনে পড়লো মাধবীর কথা। দত্তবাড়ির বউ সে, ওর সমবয়সী। দুজনই মেদিনীপুরের মেয়ে বলে ওদের মধ্যে বেশ ভাব। শালগাছায় ঢোকার মুখেই হাতের বায়ে মাধবীদের ঘর। কী অবস্থা মেয়েটির?

        গীতা বুঝতে পারছে, মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে ওর ঘরেও বর্গিরা চলে আসবে। চরম বিপদের মুহূর্তে পরম ভালবাসার মানুষটি কাছে নেই। কিন্তু, দ্বিধা করার সময় নেই। সম্মান হারালে সমাজে ও মুখ দেখাতে পারবে না। ওর স্বামীরও উঁচু মাথা নীচু হয়ে যাবে। মরণ বেছে নেয়া ছাড়া ওর তখন পথ থাকবে না। সম্মান হারিয়ে মরার চেয়ে আগে মরাই ভালো।

        গরু বাঁধার দড়ি খুঁজে নিলো ও। তিনটা পিঁড়ি ব্যবহার করে কড়িকাঠের নাগাল পেলো। ওদের ঘরটা পূর্বদুয়ারী, তাই পূব দিকে ফিরে গলায় ফাঁস পরলো গীতা। ওর স্বামী ঘরে ঢুকে যেন ওর মুখটি দেখতে পায়।

        ভগবানের নাম নিতে গিয়ে অভিমানে গীতার চোখে দু ফোঁটা জল এলো। “তোমাকে তো বলার কিছু নেই,” মনে মনে বললো ও। “অন্তত: আমার লাশটির অপমান হতে দিও না।”

        শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মুখ বন্ধ করে রাখলো গীতা। কামনা করলো, যেন জিভ বেরিয়ে না পড়ে। ওর চেহারা বিকৃত হয়ে গেলে সেটাই ওর স্বামীর মনে থাকবে। ও তা চায় না। ওর সুন্দর মুখটি মনে রাখুক সে। প্রার্থনা করুক, পরের জনমে ওকেই যেন বউ হিসেবে পায়।

        বিধাতা তাঁর বিচিত্র পদ্ধতিতে গীতার শেষ ইচ্ছেগুলো পূরণ করেছেন। ওকে তিনি বিধবা করেননি – ওর পরনে এখনও গোলাপি শাড়ি আর আকাশি পাট্টা, সিঁথিতে জ্বলজ্বল করছে লাল সিঁদুর।

        ওর লাশটির কোনো অপমান বিধাতা হতে দেননি। একজন বর্গি দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকলেও ওর ঝুলন্ত লাশ দেখে চমকে উঠে ছুটে পালিয়েছে। ঘরটি লুট করার কথাও ভুলে গেছে। বর্গিরা নৃশংস হলেও সাহসী নয়।

        গীতার চেহারাও বিধাতা বিকৃত করেননি। ও বেঁচে থাকতে যেমন ছিল, এখনও তেমনই আছে – ভদ্রঘরের এক সুন্দরী তরুণী বধু যেন ঘুমিয়ে আছে।

        এখনও আধা ক্রোশ দূরে রয়েছে বিকাশ। শালগাছা গ্রামে আগুন জ্বলছে বুঝতে পেরে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে আসছে সে।

দুই

ধীর পায়ে হেঁটে শালগাছা থেকে বের হয়ে উত্তরের বড় রাস্তায় উঠলো বিকাশ। রাস্তাটি পূব-পশ্চিমে লম্বা, দামোদর নদীর প্রায় সমান্তরাল। তবে, রাস্তা থেকে নদীর দূরত্ব ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ ধনু (ষাট-সত্তর গজ)। মাঝের এ জায়গায় অসংখ্য শাল গাছ আর ঝোপঝাড়।

        এখন চৈত্র মাসের মাঝামাঝি, বছর প্রায় শেষ। বর্গিরা বাংলায় এসেছিলো বৈশাখে, প্রায় এগারো মাস আগে। বিকাশ জানে, ওরা আবার আসবে। বাংলার নবাব আলিবর্দি খান মারাঠা রাজাকে ‘চৌথ’ (শাব্দিক অর্থ ‘চার ভাগের এক ভাগ’, ব্যবহারিক অর্থ ‘খাজনা’) দিতে রাজি হননি।

        বিকাশের ধারণা, বর্গিরা শালগাছা গ্রামেও আবার আসবে। এমন মনে করার সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে ওর। তবে, এবার তাদেরকে মোকাবিলা করার জন্য তৈরি ও। প্রতিশোধের আগুন জ্বলছে ওর মনে।

        বর্গিদের সম্পর্কে অনেক খোঁজখবর নিয়েছে বিকাশ। ‘বর্গি’ শব্দটি মারাঠি ‘বর্গির’ শব্দটি থেকে এসেছে। এর অর্থ অনিয়মিত অশ্বারোহী সৈন্য, যাকে ঘোড়া আর অস্ত্র (সাধারণত: বর্শা) ধার দেয়া হয়েছে। এদেরকে মোকাবিলা করা অত কঠিন হবে না।

        রাস্তা থেকে নেমে শালবনে ঢুকলো বিকাশ। সরু একটা পথ এখানে রয়েছে বটে, তবে তেমন ব্যবহৃত হয় না, আগাছা জন্মেছে। এখান থেকে দু শ গজ দূরে নদীটা ডানে বাঁক নিয়েছে। দক্ষিণে খেয়াঘাট রয়েছে বলে গ্রামের মানুষের যাতায়াত ওদিকেই।

        নদীর পারে এসে একটা শাল গাছের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়ালো ও। অপেক্ষা করছে, ওর কাকাতো ভাই প্রতাপ একটু পরেই আসবে। বিকাশের বছর পাঁচেক ছোট সে, ওর একনিষ্ঠ ভক্ত।

     সকালের আলোয় চিক্‌ চিক্‌ করছে দামোদরের জল। নদীটি এখন শান্ত, কিন্তু বর্ষা এলেই ভয়ানক ক্ষেপে উঠবে সে, বানের জলে দুকূল ভাসিয়ে দেবে। সবাই তাই দামোদরকে বলে ‘বাংলার দুঃখ’। তবে, শালগাছা গ্রামটি একটু উঁচুতে হওয়ায় এখানে বন্যার প্রকোপ কম।

       পিছনে পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেলো। প্রতাপ এসেছে মনে করে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই চমকে উঠলো ও। গীতা! পরক্ষণেই ভুল বুঝতে পারলো। মাধবী আসছে! গোলাপি শাড়ির সাথে আকাশি পাট্টা পরে আছে!

        মেয়েটা কি পাগল হয়ে গেলো? লোকে দেখলে কী মনে করবে!

        “তোমার সাথে কথা আছে, বিকাশদা,” বললো মাধবী।

        চোখে প্রশ্ন নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইলো বিকাশ। কিছু বললো না।

        “তার আগে বলো, তুমি কি কোনো কারণে আমার উপর রেগে আছো?” মাধবীর প্রশ্ন।

        “কেন এমন মনে হলো তোমার?”

       “গীতা বৌদি মারা যাবার পর থেকে যতবারই তোমার সাথে দেখা হয়েছে, তুমি আমাকে এড়িয়ে গেছো।” মাধবীর কন্ঠে অনুযোগ।

        “এড়িয়ে যাবো কেন?” বললো বিকাশ। তবে, গলায় তেমন জোর আনতে পারলো না। মাধবীর অনুযোগটি সত্য।

        “বৌদি কিছু বলে গেছে আমার কথা?”

        “না তো। কী কথা?” জানতে চাইলো বিকাশ।

        “ঘটনার আগের দিন বৌদির সাথে আমার কথা হচ্ছিলো। বৌদি বললো, তোমার কিছু হলে ও সহমরণে যাবে। পরের জনমে তোমাকেই ও স্বামী হিসেবে চায়। আমি তখন বললাম, আমার স্বামীর কিছু হলে আমি সহমরণে যাব না। এমন একটা লোকের সাথে পরের জনমে আমি ঘর করতে চাই না। বৌদি কি এ কথা তোমাকে বলেছে?”

        “না। তোমাকে যদি কথা দিয়ে থাকে কাউকে বলবে না, তাহলে তো আমাকেও বলার কথা না।”

        “না না, আমি তা জানি,” তাড়াতাড়ি বললো মাধবী। “আমি কাউকে বলতে নিষেধ করিনি। কিন্তু, এরপর থেকে তুমি আমাকে এড়িয়ে চলছো। তাই মনে হলো, তুমি নিশ্চয়ই ভাবছো আমি খারাপ মেয়ে, স্বামীর সাথে সহমরণে যেতে চাই না -”

        “তুমি মোটেই খারাপ মেয়ে নও,” মাধবীকে থামিয়ে দিয়ে বললো বিকাশ। “শালগাছা গ্রামে তোমার মত ভাল মেয়ে আর মাত্র দুজন ছিল, দুজনকেই আত্মহত্যা করতে হয়েছে। বুঝতেই পারছো, আমি গীতা আর দূর্গা বৌদির কথা বলছি।”

        “আমাকেও হয়তো আত্মহত্যাই করতে হবে,” চোখের জল মুছতে মুছতে বললো মাধবী।

        “কেন?” প্রশ্ন করলো বিকাশ। ভাবছে, মাধবী কি কিছু জানতে পেরেছে?

        কিছু না বলে চুপ করে রইলো মেয়েটি।

        “তুমি কী যেন বলতে চেয়েছিলে?” প্রসঙ্গ পাল্টাতে চাইলো বিকাশ।

        “কদিন আগে তুমি আর প্রতাপদা কী নিয়ে আলাপ করছিলে?” জানতে চাইলো মাধবী।

        বিকাশ বুঝতে পারলো মেয়েটি কোন্ দিনের প্রসঙ্গ তুলেছে। ও আর প্রতাপ বাড়ির সামনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথা বলছিলো। হঠাৎ করে মাধবী চলে এসেছিলো। মেয়েটি কতটুকু শুনেছে, তা ওরা বুঝতে পারেনি।

        “তুমি কী শুনেছো?” পাল্টা প্রশ্ন বিকাশের।

        “এই গ্রামে কার সাথে বর্গিদের যোগাযোগ?” মেয়েটির কন্ঠে উদ্বেগ।

        উত্তর না দিয়ে চুপ করে রইলো বিকাশ।

        “বলবে না?” মেয়েটির কন্ঠে অনুনয়।

        “আগে তুমি বলো আত্মহত্যার কথা কেন ভেবেছো।”

        “তোমাদের আলাপ কিছুটা শুনে ফেলার পর থেকেই আমার মনে হচ্ছে, বর্গিদের দালাল লোকটা আমার স্বামী। তখন থেকে আমার গলায় দড়ি দিতে ইচ্ছা করছে। সমাজে মুখ দেখাবো কেমন করে?”

        মেয়েটি কি এজন্যই গীতার মত কাপড় পরেছে?

        “সমাজে মুখ দেখাতে না পারলেই আত্মহত্যা করতে হবে?” তিরস্কারের সুরে বললো বিকাশ। “এক জায়গায় টিকতে না পারলে অন্য জায়গায় চলে যাওয়া যায়। দূর্গা বৌদির কথা ধরো। আত্মহত্যা না করে সাধনদাকে নিয়ে অন্য কোথাও চলে যেতে পারতেন।”

        “যদি সাধনদা রাজি না হতেন?” জানতে চাইলো মাধবী।

        “তাহলে দূর্গা বৌদি একা চলে যেতে পারতেন। নতুন জায়গায় নতুনভাবে জীবন শুরু করতেন। মুশকিল হলো, ধর্মের ব্যাখ্যা মূর্খ আর সুবিধাবাদী লোকদের হাতে চলে গেছে। সে কারণে সাধারণ লোকদের, বিশেষ করে মেয়েদের, জীবন অতিষ্ঠ হয়ে গেছে।”

        “তুমি আসলেই আলাদা, বিকাশদা,” বললো মাধবী। “সবাই কেন তোমার মতো করে ভাবে না?”

        “তুমি ভগবানের দিব্যি দিয়ে বলো, আত্মহত্যার কথা কখনো চিন্তা করবে না।”

        “তার মানে কি বর্গিদের দালাল -”

        “আমরা নিশ্চিত হতে পারিনি। দালাল যেই হোক, তোমার মত ভাল মেয়ে কেন আত্মহত্যা করবে?”

        “তুমি আমাকে বেঁচে থাকার পথ দেখাবে?”

        “দেখাবো,” বললো বিকাশ।

        “বেশ, ভগবানের দিব্যি, আত্মহত্যার চিন্তা আর কখনও করবো না।”

        “আর একটা কথা,” বললো বিকাশ, “বর্গিদের দালালি নিয়ে অলোকদার সাথে তোমার আলাপ হয়েছে?” অলোক দত্ত মাধবীর স্বামী।

        “না, কেন?”

        “কথা দাও, এ নিয়ে তার সাথে বা অন্য কারও সাথে কোনো আলাপ করবে না।”

        “আচ্ছা, কথা দিলাম।”

        মাধবী চলে যাবার কয়েক সেকেন্ড পরেই পাশের একটা শালগাছের আড়াল থেকে প্রতাপ বের হয়ে এলো। দুষ্টু হাসি লেগে আছে ওর মুখে।

        “আড়ালে দাঁড়িয়ে সব শুনছিলি?”

        “মাধবী বৌদি দেখতে খুব সুন্দর,” প্রতাপের হাসি আরও চওড়া হচ্ছে। “মনটাও খুব ভালো।”

        “বুঝতে পেরেছি, তোর বিয়ের বয়স হয়েছে।”

        “আমি তোমার মনের কথা বলছিলাম।” প্রতাপ এখনও হাসছে।

        “ফাজলামো বন্ধ কর।”

        “তার কপালটা কত খারাপ দেখেছো? এই জনমে তো তোমাকে পাবেই না, অলোক দত্তের মতো অমানুষের হাতে পড়েছে – আবার পরের জনমেও তোমাকে পাবে না, গীতা বৌদি তোমার অপেক্ষায় বসে আছে।”

        বিকাশের মুখটা হঠাৎ কালো হয়ে গেলো। বললো, “আমাকে পেতে চায়, তা তোকে কে বললো?”

        “এটা একটা প্রশ্ন হলো? অমানুষের ঘর করলে তোমার মত ভালো মানুষের প্রেমে পড়বেই। তার উপর, তুমি তার হারানো বান্ধবীর স্বামী।”

        ঠিক এই ভয়টা করছিলো বলেই মাধবীর কাছ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করেছে ও।

        মেয়েটির জন্য কষ্ট হচ্ছে বিকাশের। ওরা নিশ্চিত হয়েছে, বর্গিদের সাথে যোগাযোগটা অলোক দত্তেরই। বর্গিদের হামলায় গ্রামের সব বাড়িরই অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু, দত্তবাড়ি গ্রামে ঢোকার মুখে হলেও তেমন কোনো ক্ষতির শিকার হয়নি। বর্গিরা শুধুমাত্র ওদের খড়ের গাদায় আগুন দিয়েছে। এ কারণেই বিকাশের সন্দেহ হয়েছে। ও আর প্রতাপ অনেক খোঁজখবর নিয়েছে। মীর হাবিব নামের এক লোক নবাব আলিবর্দি খানের দল ছেড়ে বর্গিদের দলনেতা ভাস্কর পন্ডিতের সাথে হাত মিলিয়েছে। মীর হাবিবের ঘনিষ্ঠ লোকজনের সাথে অলোক দত্তের দহরম মহরম। বর্গিরা বাংলার পথ ঘাট চেনে না। স্থানীয় লোকদের সহায়তা পেয়েছে তারা।

        “মুসলমানদের মতো হিন্দু ধর্মেও তালাক থাকলে ভালো হতো,” বললো প্রতাপ। “তাহলে মাধবী বৌদি অমানুষটাকে তালাক দিয়ে তোমাকে বিয়ে করতে পারতো।”

        “আমি তাকে বিয়ে করতাম কে বলেছে?”

        “এটা বোঝাও কঠিন কিছু নয়,” হাসতে হাসতে বললো প্রতাপ। “আজকের কথাই ধরো। তুমি তাকে একবারও বৌদি বলে ডেকেছো?”

        চুপ করে রইলো বিকাশ। ওর এই ছোট ভাইটা বুদ্ধি-সাহস-শক্তিতে দিন দিন ওর সমকক্ষ হয়ে উঠছে। দূর্গা বৌদি বেঁচে থাকলে কত খুশী হতেন! প্রতাপকে সন্তানের মতো তিনিই মানুষ করেছেন।

        “হিন্দু ধর্মের ব্যাখ্যা অপদার্থদের হাতে চলে গেছে,” বললো বিকাশ। “তালাকের ব্যবস্থা চালু হতে দু শ বছর লাগবে। বাদ দে এসব। চল্, কাজে নামি।”

তিন

একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা করে গত নয়-দশ মাস ধরে বিকাশ আর প্রতাপ নিজেদেরকে তৈরি করেছে। প্রথমেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, গ্রামের সবার কাছ থেকে ওদের উদ্দেশ্য আর কর্মপদ্ধতি গোপন রাখবে। এমনকি সাধনদাকেও ওরা কিছু বলেনি। একটা বড় ছইওয়ালা নৌকা কিনে ওরা দুভাই বের হয়ে পড়েছিলো। সাধনদাকে বলে গিয়েছিলো, “তুমি একটু কষ্ট করে জমি-জমা দেখাশুনা করো। আমরা দু এক মাসের জন্য বের হচ্ছি।”

        বহু পথ পাড়ি দিয়ে সাঁওতালদের গ্রামে গিয়ে দু মাস থেকেছে ওরা। কানু নামের একজন সাঁওতাল যুবকের কাছে তীর-ধনুকের ব্যবহার শিখেছে। আরও শিখেছে, তীরের ফলায় কীভাবে ধুতুরার বিষ মাখাতে হয়। কানুর সাহায্য নিয়ে চারটি ধনুক আর অসংখ্য তীর বানিয়েছে ওরা।

        রাতের আঁধারে নৌকা নিয়ে শালগাছায় ফিরেছে ওরা। যুদ্ধের নানা সরঞ্জাম শালবনে লুকিয়ে রেখে নৌকা নিয়ে খেয়াঘাট গেছে। ওখানেই সবাই নৌকা রাখে।

        এখন ওরা এসেছে ওদের ঘাঁটির স্থান নির্বাচন করতে।

        নদীর তীরে দুটি জায়গা বাছাই করলো ওরা। একটি হলো সরু পথের শেষ মাথা, যেখানে দাঁড়িয়ে এতক্ষণ ওরা কথা বলছিলো। আরেকটি প্রায় ষাট গজ পশ্চিমে। দুটি জায়গাই এমন, তীর ছুঁড়লে প্রায় সত্তর গজ দূরের রাস্তা পর্যন্ত অনায়াসে পৌঁছে যাবে, কোনো শালগাছে বাধাগ্রস্ত হবে না।

        পশ্চিমের জায়গাটি হবে বিকাশের ঘাঁটি। বর্গিরা এলে পশ্চিম দিক থেকেই আসবে, গতবার যেমন এসেছিলো। প্রথম আক্রমণটা ওরই করা উচিৎ।

        পূবের ঘাঁটিতে থাকবে প্রতাপ। বিকাশের তীর এড়িয়ে কোনো বর্গি গ্রামের প্রবেশ পথ পর্যন্ত এলে প্রতাপ তীর ছুঁড়বে। ওর কাজটি তুলনামূলকভাবে সোজা। ডানে ঘুরে গ্রামে ঢোকার সময় ঘোড়ার গতি কম থাকবে।

        রাস্তার উপরে, পশ্চিমের ঘাঁটির উনিশ-বিশ গজ বামে একটি জায়গা বাছাই করলো ওরা। বিকাশ কোনাকুনিভাবে বাম দিকে তীর ছুঁড়ে ওখানেও লক্ষ্যভেদ করতে পারবে, শালগাছ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে না। প্রতাপের জন্যেও ওর ঘাঁটির পনেরো-ষোল গজ ডানে রাস্তার উপরে একটি জায়গা পাওয়া গেলো।

        তার মানে দাঁড়ালো, ওরা দুজনে মিলে রাস্তার উপরে ষাট গজ জায়গার চারটি নির্দিষ্ট স্থানে লক্ষ্য ভেদ করতে পারবে। একই সাথে নিজেরা শালগাছের আড়ালে থাকতে পারবে। কোনো উপায়ে বর্গিরা যদি ওদের কাছাকাছি চলে আসে, দুজনই সাঁতার কেটে দামোদরের ওপারে চলে যাবে। আগেও একাধিকবার ওরা নদীটা সাঁতরে পার হয়েছে।

চৈত্রের শেষ দিকে বর্গিরা আবার বাংলায় ঢুকলো। গতবারের মতো বর্ধমানের কাটোয়ায় ঘাঁটি গাড়লো তারা। যে কোনো দিন ওদের একটি দল শালগাছায় চলে আসতে পারে।

        প্রস্তুতির শেষ পর্যায়ে আর একজন বিশ্বস্ত লোকের প্রয়োজন। বেশ ছুটোছুটি করতে হবে নতুন সদস্যকে, তাই সাধনদাকে দিয়ে হবে না। অনেক ভেবেচিন্তে গোপাল নামের এক নিম্নবর্ণের হিন্দু ছেলেকে বাছাই করলো ওরা, বয়স পনেরো-ষোল বছর হবে। ছেলেটি যে ওদের প্রতি বিশ্বস্ত থাকবে, তাতে ওদের সন্দেহ নেই। নিম্নবর্ণের হিন্দু বলে ওরা অনেক সামাজিক অবিচারের শিকার হয়। কিন্তু, বিকাশ আর প্রতাপ সব সময়ই ওদের পাশে থেকেছে, ওদের বিপদে আপদে সাহায্য করেছে।

        গোপালদের ঘর থেকে পশ্চিম দিকে তাকালে অনেক দূরে বড় রাস্তাটির প্রায় মাইলখানেক অংশ চোখে পড়ে। গোপালকে দায়িত্ব দেয়া হলো, প্রতিদিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে সারাদিন ধরে রাস্তাটির উপর নজর রাখতে হবে। দু-চার মিনিটের জন্যে এদিক ওদিক যেতে হলে ওর ছোট ভাইকে দায়িত্ব দিয়ে যেতে হবে। সারাদিন অন্য কাজ করলে গোপাল যা পেতো, তার দ্বিগুন পারিশ্রমিক ওকে প্রতিদিন দেয়া হবে। পুরো ব্যাপারটি গোপন রাখতে হবে।

        বর্গিদেরকে দেখা গেলে গোপালের কাজ হবে ছুটে বিকাশদের বাড়ির কাছে গিয়ে ‘বর্গি এলো, বর্গি এলো’ বলে চিৎকার করা। এতে গ্রামের সবাই যেমন নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে পারবে, তেমনি বিকাশ আর প্রতাপ ওদের ঘাঁটিতে পৌঁছানোর সময় পাবে। গোপালও ওদের সাথে যাবে, তবে নদী তীরে পৌঁছে সে পূব দিকে ছুটবে। প্রতাপের ঘাঁটি থেকে প্রায় দু শ গজ পূবে দামোদরের বাঁকের কাছে গিয়ে অপেক্ষা করবে।

        যুদ্ধের এক পর্যায়ে লাল পতাকা নেড়ে বিকাশ সংকেত পাঠাবে প্রতাপকে, সাথে সাথে প্রতাপ লাল পতাকা নেড়ে সংকেত পাঠাবে গোপালকে। গোপাল তখন দৌড়ে ওখানকার জঙ্গলে ঢুকে পড়বে। একটি দামামা লুকিয়ে রাখা হয়েছে সেখানে। যত জোরে সম্ভব দামামাটি বাজাবে সে। থেমে থেমে, বার বার।

        যদি দেখে বিকাশ আর প্রতাপ দামোদরের জলে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, তাহলে ও নিজেও সাঁতরে নদীর পূব পারে চলে যাবে। ওদিকে বরং নদীর প্রস্থ কম।

চার

তিন দিন পর দুপুরের কিছু আগে বর্গিরা এলো। গোপাল তার দায়িত্ব ঠিক মতোই পালন করেছে, গ্রামের সব লোক পালিয়ে যাবার সময় পেয়েছে। বিকাশ আর প্রতাপ নিজ নিজ ঘাঁটিতে অপেক্ষা করছে। গোপালও দামোদরের বাঁকে তার নির্ধারিত জায়গায় চলে গেছে।

        প্রত্যেক ঘাঁটিতে দুটি ধনুক আর রাস্তার দিকে মুখ করে স্তূপ করে রাখা প্রায় দু শ তীর। প্রত্যেকটি তীরের ফলায় ধুতুরার বিষ মাখা।

        ওদের পরিকল্পনা হলো প্রথমে ঘোড়াকে লক্ষ্যবস্তু করা। এত বড় প্রাণী একটি তীরের আঘাতে হয়তো সাথে সাথে ধরাশায়ী হবে না, তবে থেমে গিয়ে ব্যথায় লাফালাফি করে পিঠে বসে থাকা বর্গিকে বেসামাল করে দিবে। তখন আবার তীর ছুঁড়ে লোকটিকে গেঁথে ফেলতে হবে।

        বর্গিদের অগ্রবর্তী দলটিকে দেখা গেলো, আনুমানিক দশজন ঘোড়সওয়ার। বেশ কিছুটা পিছনে আরও প্রায় ত্রিশজন আসছে।

        ধনুকে তীর লাগিয়ে অপেক্ষা করছে বিকাশ। তিনটি ঘোড়াকে ও পার হয়ে যেতে দিলো। ওদের চলার ছন্দ মনে গেঁথে নিচ্ছে। চতুর্থ ঘোড়াটি আসার পূর্বমুহূর্তে তীর ছুঁড়লো ও। অব্যর্থ নিশানা! পেটে তীর ঢুকতেই সামনের দুই পা তুলে দাঁড়িয়ে পড়লো ঘোড়াটি।

        দেরি না করে বাম দিকে কোনাকুনিভাবে আবার তীর ছুঁড়লো বিকাশ, এগিয়ে যাওয়া তৃতীয় ঘোড়াটিকে গেঁথে ফেললো। প্রায় একই সাথে প্রতাপের তীর প্রথম ঘোড়াটির গায়ে বিঁধলো।

        বিকাশের পরের তীরটি তৃতীয় ঘোড়ার আরোহীর বাম বাহুতে ঢুকলো। প্রতাপের তীর ঢুকলো প্রথম ঘোড়ার আরোহীর পেটে। অন্য দুই ঘোড়ার আরোহী লাফিয়ে নেমে রাস্তায় শুয়ে পড়েছে। দ্বিতীয় ঘোড়াটি রাস্তা ধরে পূব দিকে ছুটে গেলো, পিঠে কোনো আরোহী নেই।

        পিছনের বর্গিরা ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে উল্টো দিকে ছুটলো। প্রায় একশ গজ দূরে গিয়ে থামলো ওরা। সাঁওতালদের তীর একশ গজ দূরেও বিধ্বংসী, কিন্তু মাঝে শালগাছগুলির প্রতিবন্ধকতা রয়েছে।

        তীরবিদ্ধ ঘোড়া তিনটি পুরোপুরি অকেজো করে দেয়ার জন্য আরও তিনটি তীর ব্যবহার করলো ওরা। আহত বর্গি দুজন একটু পরেই বিষক্রিয়ায় মারা যাবে।

        বিকাশদের তীর নিশানা ভেদ করছে ঠিকই, কিন্তু এ পর্যন্ত ওদের অর্জন শুধুমাত্র দুজন বর্গি আর চারটি ঘোড়া (তিনটি ঘোড়া তীরবিদ্ধ হয়েছে আর একটি ছুটে পালিয়েছে)। রাস্তায় উপুড় হয়ে শুয়ে থাকা বর্গি দুজনের গায়ে তীর লাগানোর উপায় নেই।

হঠাৎ বিকাশের মাথায় একটা বুদ্ধি এলো। যেহেতু পর্যাপ্ত তীর রয়েছে, বসে না থেকে দুজন বর্গির ডান দিকের জনকে বেছে নিয়ে একের পর এক তীর ছুঁড়তে শুরু করলো ও। তীরগুলো লোকটির শরীরের একটু উপর দিয়ে চলে যাচ্ছে।

        একটি তীর লোকটির মাথা ছুঁয়ে যেতেই আতংকে সে উঠে দাঁড়িয়ে ছুটে পালানোর চেষ্টা করলো। বিকাশের পরের তীরটি তার ডান উরুতে ঢুকলো। খোঁড়াতে খোঁড়াতে কিছুদূর গিয়ে রাস্তায় মুখ থুবড়ে পড়লো লোকটি।

        ঘাড় ঘুরিয়ে প্রতাপের ঘাঁটির দিকে তাকালো ও। চোখাচোখি হতেই হাত তুলে বিকাশকে অভিবাদন জানালো সে।

        কোনো ঘটনা ছাড়াই কিছুটা সময় পার হলো।

        হঠাৎ রাস্তার উপরে অলোক দত্তকে দেখা গেলো। হয়তো দেখতে এসেছে বর্গিদের এত দেরি হচ্ছে কেন। তীব্র ঘৃণায় বিকাশের অন্তর পূর্ণ হয়ে গেলো।

        অলোক দাঁড়িয়ে আছে বড় রাস্তা আর গ্রামের প্রবেশপথের সংযোগস্থলে। জায়গাটি প্রতাপের আওতায়। তারপরও ধনুক তুললো বিকাশ। পরক্ষণেই মনে হলো মাধবী বিধবা হবে। হিন্দু ধর্মের বিধান অনুযায়ী বিধবাদের আর বিয়ে হয় না।

        কোনটি ভালো, অমানুষের সাথে সারা জীবন ঘর করা, না কি একা একা থাকা?

        হঠাৎ একটি তীর ছুটে গিয়ে অলোকের তলপেটে বিঁধলো। প্রতাপ কোনো দ্বিধা করেনি। দূর্গা বৌদির অপমানের জন্য এই নরাধমই দায়ী। আবার তীর ছুঁড়লো প্রতাপ। এবার গীতা বৌদির নাম নিয়ে। অলোকের গলায় ঢুকলো তীরটি।

        বর্গিদের দালালের লাশ বর্গিদের পাশেই পড়ে রইলো। হাত তুলে প্রতাপকে অভিবাদন জানালো বিকাশ।

        বর্গিদের এগিয়ে আসার ইচ্ছা উবে গেছে। কিন্তু, একজন বর্গি এখনও আটকা পড়ে আছে। তাকে ফেলে ওরা যেতে পারছে না।

        আর কিছু ভেবে বের করতে না পেরে একই কৌশল আবার প্রয়োগ করলো বিকাশ। একের পর এক তীর ছুঁড়তে থাকলো বর্গিটার দিকে। প্রতাপও যোগ দিলো। দু একটা তীর লোকটিকে প্রায় ছুঁয়ে গেলো, কিন্তু সে কোনো নড়াচড়াই করলো না – আগের লোকটির দশা সে দেখেছে।

        হাল ছেড়ে দিলো ওরা। সময় গড়িয়ে চললো।

        এক পর্যায়ে বিকাশ ভাবলো, অনেক হয়েছে। লাল পতাকা নেড়ে সংকেত দিলো ও। দেখতে পেয়ে প্রতাপও গোপালকে সংকেত পাঠালো।

        দামামা বেজে উঠতেই বর্গিরা ভাবলো, নবাবের সৈন্যদল এসেছে। ঘোড়া ছুটিয়ে পালাতে শুরু করলো ওরা। সঙ্গীর কথা বেমালুম ভুলে গেছে।

        হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে তীর-ধনুক হাতে রাস্তার দিকে ছুটলো বিকাশ। ও কী করতে চায় বুঝে ফেললো প্রতাপ, শুয়ে থাকা বর্গিটাকে আক্রমণ করবে। তীর-ধনুক হাতে সেও ছুটলো রাস্তার দিকে। বিকাশদার তীর ফস্‌কে গেলে সে বর্গিটার বর্শার আওতায় পড়ে যাবে, তাকে তখন সাহায্য করতে হবে।

        বিকাশ রাস্তার কাছাকাছি পৌঁছাতেই বর্শা হাতে উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করলো বর্গিটা। ঠিক তখনই থেমে দাঁড়ালো বিকাশ। তীর ছুঁড়ে লোকটির পেট এফোঁড় ওফোড় করে দিলো।

লোকজন গ্রামে ফিরে আসার আগেই ওরা তীর-ধনুক জঙ্গলে লুকিয়ে ফেললো। অলোকের শরীর থেকে তীর দুটো বের করে ছুঁড়ে ফেলে দিলো বিকাশ। লোকজন মনে করুক, বর্গিদের হাতে অলোক মারা পড়েছে। মাধবীর কথা ভেবে এমনটা করলো ও।

গোপাল রটিয়ে দিলো, নবাবের তীরন্দাজদের আক্রমণে বর্গিরা পালিয়েছে। বিকাশ মিত্রবাড়িকে সার্বক্ষনিক বিপদের মধ্যে রাখতে চায় না।

পাঁচ

সেদিনই বিকেলবেলা নদীর তীরে বিকাশ আর প্রতাপকে আবার পরিকল্পনায় বসতে হলো।

        অলোকের বড় ভাই গোলক দত্ত নতুন ঝামেলা শুরু করেছে। মাধবীকে জোর করে সহমরণে পাঠাতে চায় সে। মেয়েটিকে তার ঘরে তালা মেরে রাখা হয়েছে।

        কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছে না বিকাশরা। তালা ভেঙে মাধবীকে বের করে আনা কোনো কঠিন কাজ নয়, ওরা দু ভাই গিয়ে দাঁড়ালে দত্তবাড়ির কারও এতটুকু নড়াচড়া করার সাহস হবে না। কিন্তু, এলাকার সব লোক ওদের বিপক্ষে চলে যাবে। বলবে, তোমরা এখানে নাক গলাচ্ছো কেন? অলোকের বউ তোমাদের কী হয়?

        সহমরণকে নিতান্তই পারিবারিক ব্যাপার হিসেবে দেখা হয়। সম্রাট আকবরের আমল থেকে যদিও কাগজে-কলমে আইন আছে, কারও ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে সহমরণে পাঠানো যাবে না, তবে এ আইনটির খুব একটা প্রয়োগ নেই। কোনো সদ্য বিধবার ‘অভিভাবক’ যদি তাকে জোর করে সহমরণে পাঠায়, কেউ নালিশ করতে যায় না। লোকে ভাবে, বিধবা বেঁচে থেকে কী করবে? দু একটি ক্ষেত্রে নালিশ করা হয় বটে, কিন্তু কোতোয়াল (পুলিশ প্রধান) কিছু নজরানা নিয়ে ‘সদ্য বিধবা স্বেচ্ছায় সহমরণে গিয়াছেন’ মর্মে একটি রিপোর্ট জমা দিয়ে দেন।

        প্রতাপ বললো,“কোতোয়ালকে আমরা নজরানা দিয়ে শালগাছায় নিয়ে আসি। তিনি এসে বৌদির সহমরণ ঠেকাবেন।”

        “নদীর ওপারে যাওয়া, কোতোয়ালকে রাজি করে নিয়ে আসা – এত সময় তো পাওয়া যাবে না। ওরা সন্ধ্যার কিছু পরেই দুজনকে চিতায় তুলবে।” বিকাশের কন্ঠে উদ্বেগ।

        “পুরোহিতকে নজরানা দিলে কি সহমরণ ঠেকাতে রাজি হবেন?” প্রতাপের জিজ্ঞাসা। “তিনি বলবেন, জোর করে সহমরণে পাঠানো অধর্মের কাজ।”

        “লোকে যদি বলে, বেঁচে থাকলে তো মেয়েটি অধর্ম করে বেড়াতে পারে, তখন তিনি কী বলবেন? পুরোহিতরাই তো বিধান দিয়েছেন, একজনের বিধবা স্ত্রীকে অন্য কেউ বিয়ে করতে পারবে না।”

        “দশগুন নজরানা দিলে হয়তো পুরোহিত বিধান বদলে ফেলবেন,” প্রতাপের কন্ঠে বিদ্রুপ। “তখন তিনি বলবেন, কেউ বিয়ে করতে রাজি থাকলে সহমরণে পাঠানোর প্রয়োজন নেই।”

        “এলাকার লোকজন মেনে নিবে না। তাদের দৃষ্টিতে মাধবী অলোকের সম্পত্তি। পুরোহিত নিজেও সমালোচনার মুখে পড়বেন।” 

        “তাহলে কী করা যায়?” প্রতাপের প্রশ্ন।

        “মাধবীকে নিয়ে এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। কিন্তু, লোকজন তোদেরকে একঘরে করবে।” 

        “এক ঘরে করুক। ধার ধারি না।” প্রতাপের কন্ঠে তেজ।

        “তোরা একঘরে হলে নিজেরা তো কষ্ট পাবিই, গ্রামটাও উচ্ছন্নে যাবে। গোলক দত্ত তার শয়তানি ইচ্ছে মতো চালিয়ে যাবে।”

        দু ভাই কিছুক্ষন চুপ করে রইলো।

        হঠাৎ বিকাশের মাথায় একটা বুদ্ধি এলো। এই অনুযায়ী কাজ করতে পারলে ও মাধবীকে নিয়ে চলে গেলেও মিত্রবাড়ির কোনো সমস্যা হবে না। বিস্তারিত শুনে প্রতাপও এটা পছন্দ করলো। কারন, এতে গোলক দত্তকেও শায়েস্তা করা যাবে।

        গোপালকে রাজি করানো হলো – সে ওদেরকে সাহায্য করবে এবং কিছুদিনের জন্য বিকাশের সাথে যাবে।

        পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতাপ ওদের নৌকাটি খেয়াঘাট থেকে চালিয়ে ওর ঘাঁটি বরাবর নিয়ে এলো। তিনটি বড় পাথর খন্ড আর তিন টুকরো দড়িও জোগাড় করে রাখলো।

        সন্ধ্যার পূর্বমুহূর্তে হঠাৎ গোপাল ‘বর্গি এলো, আবার বর্গি এলো’ বলতে বলতে গ্রামে ঢুকলো। শালগাছার সব লোক এক নিমেষে হাওয়া হয়ে গেলো। অনেকে এমনিতেই বলাবলি করছিলো, বর্গিরা সঙ্গীদের লাশের জন্য আবার আসতে পারে। দত্তবাড়ির লোকজন পলায়নের দৌড় প্রতিযোগিতায় প্রথম হলো, কারণ আজ দুপুরেই ‘বর্গি হামলায়’ অলোক দত্তের মৃত্যু হয়েছে।

        এরপরের ঘটনাগুলো দ্রুত গতিতে ঘটে গেলো। বিকাশ গিয়ে তালা খুলে মাধবীকে মুক্ত করলো। প্রতাপ আর গোপাল ছোটখাটো গড়নের এক বর্গির লাশ মাধবীর ঘরে ঢুকালো। ইতোমধ্যে মেয়েটি কাপড় পাল্টে ফেলেছে, পরনের গয়নাও খুলে ফেলেছে। তার খুলে রাখা কাপড়ে লাশটিকে জড়িয়ে ভালোভাবে আগুনে পোড়ানো হলো। গয়নাগুলি অল্প পুড়িয়ে (যাতে বোঝা যায় এগুলো মাধবীর) লাশের সাথে ফেলে রাখা হলো।

        আঁধার নামতেই মাধবী গিয়ে নৌকায় উঠলো। অন্য তিনজন বর্গির লাশও নৌকায় তোলা হলো।

        গোলক আর অলোকের ঘর থেকে টাকা-পয়সা আর সোনা-দানা বের করে নিয়ে দুটি ঘরেই আগুন দেয়া হলো।

        সবাই উঠে বসতেই নৌকা ছাড়লো গোপাল। দামোদর পাড়ি দেয়ার সময় বিকাশ আর প্রতাপ একে একে তিনটি লাশ পাথর বেঁধে নদীতে ডুবিয়ে দিলো।

        নদীর উত্তর পারের একটা অংশে জনবসতি নেই, ঘন জঙ্গল। সেখানে নৌকা ভিড়িয়ে ওরা কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলো, ধকলটা সামলে নিচ্ছে।

        এখান থেকে দু ভাইকে দু দিকে যেতে হবে। বিকাশ মাধবীকে নিয়ে নৌকায় করে এগোবে পায়রাডাঙ্গার দিকে। পথে কোনো মন্দিরে মাধবীকে বিয়ে করবে ও, সম্ভব হলে আজ রাতেই। পায়রাডাঙ্গা ওদের শেষ গন্তব্য নয়। পরিচিত দু একজন লোক ওদিকে থাকে, তাদের সামনে পড়লে মুশকিল। তাই ভাবছে, আরও পূবে যশোরের দিকে চলে যাবে। কোথাও জমি-জমা কিনে থিতু হওয়ার আগ পর্যন্ত গোপাল ওদের সাথেই থাকবে।

        প্রতাপ যাবে খেয়াঘাট, তবে তার আগে নদীর জলে একটা ডুব দিতে হবে ওকে, যাতে বলতে পারে ও সাঁতরে দামোদর পাড়ি দিয়েছে। খেয়া নৌকায় চড়ে শালগাছা ফিরবে ও। ওর পুরো গল্পটা হবে এরকম: বর্গিরা আবার যখন এলো, ওরা শালবনে লুকিয়ে ছিলো। কিন্তু বিকাশদা আর গোপাল ধরা পড়ে গেলো। ওদের কোমরে দড়ি বেঁধে ওদেরকে দিয়ে বর্গিরা চারটি লাশ নৌকায় তোলে। একদল বর্গি নৌকায় চড়ে রওয়ানা হয়। গোপাল নৌকা বেয়ে নিয়ে যায়। অন্য বর্গিরা এ সময়ে দত্তবাড়িতে আগুন দিচ্ছিলো। কারণ, গোলক আর অলোক নাকি ওদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে বা কাজে গাফিলতি করেছে। নবাবের সৈন্য আসবে, তা নাকি ওদেরকে বলেনি। (গ্রামবাসীরা যাচাই করলে অন্তত: অলোক দত্তের দালালির প্রমাণ পাবে, তখন পুরো গল্পই বিশ্বাস করবে।) বিকাশদা হঠাৎ বাঁধন খুলে ওদের সাথে লড়াই শুরু করে। এক পর্যায়ে বর্শার আঘাতে নদীতে পড়ে ডুবে যায়। ভাইকে বাঁচাতে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো প্রতাপ। রক্ষা তো করতে পারেই নি, বরং বর্গিরা দেখে ফেলায় সাঁতরে দামোদরের ওপারে চলে যেতে হয়েছে ওকে।

        দত্তবাড়ির লোকেরা ভাল করে পরীক্ষা করলে বুঝবে পোড়া লাশটি মাধবীর নয়। কিন্তু, ঘর-বাড়ি টাকা-কড়ি হারিয়ে ওরা এ দিকে মন দিতে পারবে না।

        প্রতাপের আর দেরি করার উপায় নেই। একটু পরেই গাঁয়ের লোকেরা ফিরতে শুরু করবে। আগে ভাগে গিয়ে পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নিতে হবে।

        মাধবীকে প্রণাম করলো প্রতাপ। বললো, “বৌদি, বিয়ের পর যে প্রণামটা পেতে, তা আগাম দিয়ে দিলাম। আমার বৌদি-ভাগ্য ভালো না। বছরের গোড়ায় দুজন বৌদিকে হারালাম। বছর শেষে আরেক বৌদিকে পেয়েও হারাচ্ছি।”

        “আমরা তো মাথা কুটে মরলেও আর কোনদিন এদিকে আসতে পারবো না,” আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে বললো মাধবী। “তুমি আমাদেরকে দেখতে যাবে তো ঠাকুরপো?”

        “অবশ্যই যাবো বৌদি।”

        গোপালের দিকে ফিরলো প্রতাপ। “তুই তো আমাদের জন্য অনেক করলি,” বললো সে। “দাদা-বৌদির নতুন সংসার ভালো করে গুছিয়ে দিয়ে তবেই ফিরবি। তোর মা আর ভাইয়ের দায়িত্ব আমার।”

        “তুমি কোনো চিন্তা করো না, প্রতাপদা। যদি দরকার হয়, আমি প্রতি বছর একবার গিয়ে দাদা-বৌদিকে দেখে আসবো।”

        বিকাশের কাছে গিয়ে প্রতাপ কোনো কথা বলতে পারলো না। হাত দিয়ে চোখ মুছতে লাগলো। এক পর্যায়ে বললো, “শালগাছা তো কানা হয়ে গেলো।”

        বিকাশের চোখও ছল ছল করছে। পরম স্নেহের ছোট ভাইটির কাঁধে হাত রেখে সে বললো, “বিকাশ নেই, কিন্তু প্রতাপ তো আছে। ঠান্ডা মাথায় সব কাজ করবি। মন খারাপ করিস না। আমাদের শীঘ্রই আবার দেখা হবে।”

        দাদাকে প্রণাম করে ঘুরে দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করলো প্রতাপ। আর পিছনে ফিরলো না।

        বিকাশ আর মাধবী নৌকায় উঠে বসতেই গোপাল আবার নৌকা ছাড়লো।

বিকাশের মনে ওর চব্বিশ বছরের জীবনের নানা স্মৃতি ভিড় করছে। গত এক বছরে তিনবার বর্গি এলো শালগাছায়। প্রথম বর্গি আক্রমণে ওরা গীতা আর দূর্গা বৌদিকে হারালো। দ্বিতীয়বারের বর্গি আক্রমণ প্রতিহত করলো ওরা। তৃতীয়বার নিজেরাই বর্গি সেজে মাধবীকে বাঁচালো।

কিন্তু, শেষ পর্যন্ত বর্গিদেরকে এক রকম খাজনা দিতেই বাধ্য হলো বিকাশ, এলাকা ছেড়ে চলে যেতে হলো ওকে। একটি মেয়ের জীবন বাঁচাতে শালগাছার মুকুটহীন রাজা রাজ্য ছাড়লো।

(শেষ)

কমেন্ট করুন

প্রাক্তন শিক্ষার্থী

পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সেশনঃ ১৯৮৩ - ৮৪

জাফর আহমেদ খান

প্রাক্তন শিক্ষার্থীপরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সেশনঃ ১৯৮৩ - ৮৪