পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় রাজনীতি

প্রায় এক যুগ আগে ৩ সেপ্টেম্বর ২০০৮ এ দেশের বহুল প্রচারিত দৈনিক পত্রিকা ‘দৈনিক ইত্তেফাক’-এর ৪র্থ পৃষ্ঠায় একটা ছোট্ট খবর প্রকাশিত হয়েছিলো; খবরের শিরোনাম ‘একটি অপশক্তি ছাত্র রাজনীতি বন্ধের পাঁয়তারা করছে।’ পত্রিকার বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার সে খবরে জানিয়েছেন, ২ সেপ্টেম্বর ২০০৮ তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুনীর চৌধুরী কনফারেন্স রুমে আয়োজিত ‘সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সংকট ও উত্তরণের পন্থা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা এমন মতামত ব্যক্ত করেন। সে সময়ে দেশে জরুরি অবস্থা জারি ছিলো এবং রাজনৈতিক সংকট চলছিলো। সে সঙ্কটে সম্ভবতঃ ‘জন প্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ ১৯৭২’ বাতিল করে ‘গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ ২০০৮’ জারি করার যে সরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিলো তার প্রেক্ষিতেই এমন বক্তব্য এসেছে বক্তাদের থেকে। ঐ বছরের জুলাই ১৪ তারিখে প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেফাক-এর অন্য একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী ‘গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ ২০০৮’ এ রাজনৈতিক দলসমূহের অঙ্গ সংগঠন সম্পর্কে যা বলা হয়েছিলো তা হচ্ছে: “রাজনৈতিক দলে কোন অঙ্গ সংগঠন থাকতে পারবে না। রাজনৈতিক দলের অধীনে শিক্ষক, ছাত্র, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক সংগঠন থাকবে না। তবে কোন ব্যক্তি ইচ্ছা করলে যে কোন রাজনৈতিক দলের সদস্য হতে পারবেন।” পরবর্তীতে অবশ্য এ ধরনের কোন কিছু আর প্রণয়ন বা বাস্তবায়ন হয়নি। চলতি মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১০০ বছরে পদার্পণ করেছে। দীর্ঘ জীবনে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতির বিরল ও গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে। সে ইতিহাসকে মনে রেখেও আজকের এই দিনে এটা ভাবার বোধ হয় অবকাশ রয়েছে যে, বর্তমান সময়ে যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে সব ধরনের রাজনীতি (ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতি) বন্ধ করার কোন উদ্যোগ নেয়া হয় তবে তাকে ‘পাঁয়তারা’ বলা যাবে কি না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ‘রাজনীতি’র বিষয়ে এখানে বলা হচ্ছে সে রাজনীতি প্রকৃত অর্থে ছাত্র-ছাত্রী বা শিক্ষক বা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থে রাজনীতি না কি ছাত্র-ছাত্রী বা শিক্ষক বা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক দলীয় রাজনীতি সে বিতর্কের অবতারণা করাটা বোধ করি অসমীচীন হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বলতে যদি এই বোঝায় যে – দুর্নীতির দায়ে আটক রাজনৈতিক নেতাদের মুক্তির জন্য রাজনৈতিক তৎপরতা, সাধারণ ছাত্র অধিকার আন্দোলনকে হাতুড়ি পেটা করা, জাতীয় রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তির মাধ্যমে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে প্রশাসন ও পুলিশ ক্যাডারের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের হল দখলে রেখে সীমিত আবাসিক সুবিধার আওতায় বাড়তি সুবিধা আদায়, দলীয় ছত্রছায়ায় টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজি করার সুবর্ণ সুযোগ, দলীয় রাজনৈতিক পরিচয় বহনকারী শিক্ষক হিসেবে ভবিষ্যতে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের থেকে পদ প্রাপ্তির সুযোগ কিংবা বর্তমানে বিভিন্ন উপদেষ্টা পরিষদ বা কমিশনে উচ্চতর পদ প্রাপ্তির দুর্লভ সুযোগ এবং শিক্ষক ও ছাত্র রাজনীতির নামে বিশ্ববিদ্যালয়কে জ্ঞান ও গবেষণা কেন্দ্রের পরিবর্তে রাজনীতি চর্চার অভয়ারণ্যে পরিণত করা তবে সে রাজনীতির আদৌ প্রয়োজন রয়েছে কি?

বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে সোচ্চার না হয়ে যে রাজনীতি জাতীয় রাজনৈতিক দলের বিশেষ সুবিধা আদায়ের লক্ষ্যে পরিচালিত হয় সে রাজনীতি দুর্জন রাজনীতিবিদের স্বার্থ রক্ষা ভিন্ন অন্য কোন অবদান জাতীয় জীবনে রাখতে অক্ষম। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের একজন বিবেকবান শিক্ষার্থী বা শিক্ষকের এ ধরনের রাজনৈতিক চর্চা করতে কুণ্ঠিত বোধ করা উচিত কেননা অতি মেধাবীদের এ ধরনের চর্চা জাতিগত ভাবে উন্নয়ন ধারাকে বাধাগ্রস্ত করে। জাতীয় রাজনৈতিক দলসমূহের সুবিধা দানে রাজনীতির নামে এ ধরনের তৎপরতায় যখন দেশের মেধাবী জনশক্তি নিজেদের মূল্যবান মেধাকে বিনিয়োগ করে তখন সাধারণ জনগণ হিসেবে জাতীয় প্রজ্ঞার বিষয়ে বিভ্রান্ত হওয়া ও দেশকে নিয়ে হতাশায় ডুবে যাওয়াটা খুব অস্বাভাবিক নয়।

অনেকেই বলে থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতি বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রকৃত জ্ঞান, প্রজ্ঞা, মানসিকতা ও বিবেকের দিক থেকে দৃঢ় নেতৃত্ব তৈরিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে থাকে। এ বিষয়ে দ্বিমত নেই যে, দৃঢ় নেতৃত্ব তৈরিতে গঠনমূলক দলীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনার মাধ্যমে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ গ্রহণে সক্ষম হওয়া জরুরি। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কি এ ধরনের ইতিবাচক দলীয় কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে? যদি তাই হতো তবে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা জাতীয় রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে ভাঙচুর, জ্বালাও-পোড়াও এর মতো ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হতো না বিভিন্ন সময়ে; উচ্চ শিক্ষায় আগত শিক্ষার্থীরা ক্ষোভের বহিঃ প্রকাশ ঘটাতে সম্মানিত শিক্ষকদের প্রতি অশ্রাব্য ভাষা ব্যবহার করতো না। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান রাজনৈতিক চর্চা যদি যোগ্য নেতৃত্বই তৈরি করতে পারতো তবে জ্ঞান ও গবেষণা কর্মের জন্য সুপরিচিত আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান দিন দিন ম্লান হয়ে যেতো না। এটা সবারই জানা যে, এশিয়ার সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নাম ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। ’৫২, ’৬৯, ’৯০ এর যে রাজনীতির গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সে রাজনীতির চর্চা কি আদৌ হয় এখন এ বিশ্ববিদ্যালয়ে? ডাকসু নির্বাচন হয়েছে, কিন্তু শিক্ষার্থীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রাণ কেন্দ্র কি হতে পারছে ডাকসু? অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চিত্রও তো ব্যতিক্রম নয়। নইলে বুয়েট-এর মত মেধাবীদের প্রতিষ্ঠানে ‘আবরার হত্যা’ হয় কি করে? এ সকল পরিস্থিতির জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতির সাথে জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর সংশ্লিষ্টতা যে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি বন্ধের দাবি নয় শুধু মাত্র প্রসঙ্গ তুললেই অনেকেই জোরালো প্রতিবাদ করে উঠেন। অনেকেই এ ধরনের দাবিকে বা প্রসঙ্গকে ‘অপশক্তি’র ‘পাঁয়তারা’ বলে আখ্যায়িত করেন। তারা এ ধরনের তথাকথিত ‘পাঁয়তারা’য় লজ্জা, ঘৃণা ও ক্ষোভে মুষড়ে পড়েন এটা ভেবে যে, এতে দেশ ও জাতি যোগ্য নেতৃত্ব থেকে হয়তো বা বঞ্চিত হবে। এক্ষেত্রে এটা বিস্ময়কর যে, যখন দুর্নীতিবাজ রাজনৈতিক নেতাদের নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক সমাজ বিবৃতি প্রদান করেন, শিক্ষার্থীরা স্মারকলিপি প্রদান করেন তখন দেশ ও জাতির মাথা ক্ষোভ ও হতাশায় কতটা অবনত হয় তা বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতি বন্ধের এ প্রতিবাদকারীরা ভেবে দেখেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের এ ধরনের নষ্ট রাজনীতির অংশ হিসেবে দেখতে জাতি লজ্জা বোধ করে এটা ভেবে দেখা উচিত। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক ও ছাত্র সমাজের কাছে বাংলাদেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষ জনগণের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও চাহিদার শিক্ষিত, মার্জিত ও রুচিসম্মত প্রতিনিধিত্ব আশা করে যার মাধ্যমে তারা গর্ববোধ করতে পারে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট স্বাধীনতা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময় থেকে যথেষ্ট পরিবর্তিত হয়েছে। তাত্ত্বিকভাবে হলেও গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা চলছে তিন দশক ধরে। আর তাই স্বাধীনতা প্রাপ্তির প্রায় অর্ধ শতাব্দী পরও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে জাতীয় অধিকার আদায়ের অস্ত্র হিসেবে রাজনৈতিক দলের আজ্ঞাবহ করে রাখার আর প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে হয় না। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্বাধীন ও স্বতন্ত্র জ্ঞান চর্চা কেন্দ্রে পরিণত করতে উদ্যোগ নেয়া অতীব জরুরি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষে পদার্পণে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্র সমাজেরই উচিত নিজেদের গৌরব রক্ষায় এ বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করা।

কমেন্ট করুন
ব্যবস্থাপক |

সদস‍্য, সম্পাদনা পর্ষদ, প‍্যাপাইরাস

প্রাক্তন শিক্ষার্থী

পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সেশন:১৯৯৯-২০০০

রোকনুজ্জামান

সদস‍্য, সম্পাদনা পর্ষদ, প‍্যাপাইরাসপ্রাক্তন শিক্ষার্থীপরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সেশন:১৯৯৯-২০০০