Duttaphrynus stomaticus– বাংলাদেশে স্বল্প পরিচিত একটি কুনোব্যাঙ

এখন চলছে বর্ষাকাল। আর বর্ষায় কোলাব্যাঙের রাতভর ‘ঘ্যাঙর-ঘ্যাঙ’ ডাক গ্রামের একটি অতি পরিচিত দৃশ্য। শহরে যারা থাকেন তারাও মাঝেমধ্যে ব্যাঙের ডাক শুনতে পান। সবথেকে বেশি পরিচিত ব্যাঙের মধ্যে আছে কোলাব্যাঙ এবং কুনোব্যাঙ। এছাড়াও, পানাব্যাঙ, গেছোব্যাঙ, কটকটিব্যাঙ সহ আরও নানান প্রজাতির ব্যাঙ আমাদের বাসাবাড়ির আশেপাশে, ফসলি জমিতে, পুকুর, ডোবা ইত্যাদিতে পাওয়া যায়।    

গ্রাম এবং শহরের প্রতিটি বাসার আশেপাশে মোটামুটি সবসময় পাওয়া যায় এরকম একটি ব্যাঙ হল কুনোব্যাঙ।  কুনোব্যাঙ দেখেননি এরকম মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। আমাদের দেশে কুনোব্যাঙের দু’টি প্রজাতি আছে। দু’টো প্রজাতিই Duttaphrynus গণভুক্ত এবং Bufonidae পরিবারের অন্তর্গত। কিন্তু, সাধারণ মানুষ কুনোব্যাঙ বলতে একটি প্রজাতিকেই চিনে যা ইংরেজিতে Asian Common Toad নামে পরিচিত। সাধারণত, এই প্রজাতিটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায় এবং অপর কুনোব্যাঙের প্রজাতিটি কম দেখা যায়। অন্য প্রজাতিটি বাংলায় ‘খসখসে ব্যাঙ’ এবং ইংরেজিতে Marbled Toad নামে পরিচিত। এর বৈজ্ঞানিক নাম Duttaphrynus stomaticus,  Lutken 1864। খসখসে ব্যাঙের সাথে সাধারণ কুনোব্যাঙের বাহ্যিকভাবে খুব একটা পার্থক্য নেই। তবে সাধারণ কুনোব্যাঙের মাথার দিকে ক্রেনিয়াল ক্রেস্ট (Cranial crest) থাকে, যা খসখসে ব্যাঙের থাকে না।     

খসখসে ব্যাঙ একটি নিশাচর, স্থলচর, এবং পতঙ্গভুক ব্যাঙ। এরা সাধারণত গর্তে বাস করে এবং পরিত্যাক্ত পাতায় লুকিয়ে থাকে। সূর্য ডোবার পরপর গর্ত থেকে বের হয়ে খাবার খোঁজা শুরু করে। স্থির অথবা ধীরে প্রবাহিত পানির আশেপাশে প্রজনন করে থাকে। ডিম পরিস্ফুটনের পর এর ব্যাঙাচিরা ছোট জলাশয় এবং পুকুরে দলবদ্ধ ভাবে থাকতে পারে। ব্যাঙাচিগুলো লম্বায় ৩০-৩১ মিলিমিটার, গোলাকার দেহ বিশিষ্ট, হালকা বাদামি রঙের হয় এবং এদের দুর্বল লেজ থাকে। এই ব্যাঙের ব্যাঙাচির মধ্যে একটি বিশেষ আচরণ দেখা যায়। পরিস্ফুটনের সময় যে ব্যাঙাচিগুলো আগে ডিম থেকে বের হয় তারা অন্যান্য ডিম এবং অপরিপক্ক ব্যাঙাচি খেয়ে ফেলে। নিজের প্রজাতির ডিম ও সদস্য খেয়ে ফেলার এই প্রক্রিয়াকে Conspecific Larval Cannibalism বলে।   

প্রাপ্তবয়স্ক ব্যাঙের পৃষ্ঠীয় অংশ (dorsal) বাদামী, জলপাই-ধূসর রংয়ের হতে পারে যা কালো-বাদামী স্তরে আবৃত থাকে। পেটের (ventral) দিকে সাদাটে হয় কিন্তু প্রজননকালে উভয় লিঙ্গে হলুদাভ হয়। পুরুষ ব্যাঙ মহিলা ব্যাঙের তুলনায় আকৃতিতে ছোট কিন্তু উজ্জ্বল হয়। অপ্রাপ্তবয়স্করা সাধারণত হালকা বাদামী রঙের হয় এবং তাদের কালো স্তর থাকে। বহিঃকর্ণ বা Tympanum স্পষ্ট, যা চোখের তুলনায় দুই-তৃতীয়াংশ বড়। নাসিকা ছোট এবং সামনের দিকে ভোঁতা। নাসারন্ধ্র নাসিকার কাছাকাছি থাকে এবং চোখের সম্মুখে অবস্থিত। মাথা লম্বার চাইতে প্রশস্ত বেশি। সামনের পা পিছনের পায়ের তুলনায় ছোট। দৈর্ঘ্য অনুসারে সামনের পায়ের আঙ্গুলের ক্রমবিন্যাস ৩>১>২>৪। দেহের পৃষ্ঠীয়দেশ বিভিন্ন আকারের গ্রন্থিসমৃদ্ধ। প্যারোটিড গ্রন্থি (Parotid gland) চ্যাপ্টার তুলনায় বেশি লম্বা, উপবৃত্তাকার এবং মাথার দুইপাশে অবস্থান করে। 

লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা এই ব্যাঙটি বাংলাদেশের মধ্যভাগ থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকায় পাওয়া যায়। তবে এখন পর্যন্ত পদ্মা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদীর আশেপাশে এবং রংপুর, রাজশাহী এবং সুন্দরবন থেকে এই ব্যাঙ রেকর্ড করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় পাওয়ার রেকর্ড থাকলেও আমি প্রথম ২০১৮ সালে সমুদ্র তীরবর্তী নিঝুম দ্বীপে এই ব্যাঙটিকে দেখার সুযোগ পাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রফেসর ড. নিয়ামুল নাসের স্যারের ব্যবস্থাপনায়, প্রফেসর ড. মোহাম্মদ ফিরোজ জামান স্যারের তত্ত্বাবধানে এবং IUCN (International Union for Conservation of Nature) এর আর্থিক সহযোগিতায় নিঝুম দ্বীপে একটি জরিপ কাজে প্রায় এক মাস কাটানোর সুযোগ হয়। সেখানেই প্রথম আমার বন্ধু নূর মোহাম্মদ ও দীপঙ্করসহ আমি প্রথমবারের মত এই কুনোব্যাঙটি দেখতে পাই। কিন্তু এর আগে বিভিন্ন সময় ফিল্ড ডাটা সংগ্রহ করার সময় খোঁজাখুঁজি করলেও একে দেখার সৌভাগ্য হয়নি। আমরা ব্যাঙটিকে হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করি। এটি ছিল একটি মহিলা ব্যাঙ। ব্যাঙটিকে হাতে নেয়ার সাথে সাথে এর শরীরের গ্রন্থি থেকে নিঃসরণ শুরু হয়। নিঃসৃত তরলের সুমিষ্ট গন্ধ ছিল। সাধারণ কুনোব্যাঙের (Asian Common Toad) নিঃসরণ কখনো সুমিষ্ট গন্ধযুক্ত হয়না। সবচেয়ে মজার বিষয় হল আমরা ব্যাঙটিকে সমুদ্র সৈকতের খুব কাছে বালুর উপরে পেয়েছিলাম। এর আগে ড্যানিয়েল নামের একজন বিখ্যাত গবেষক ১৯৬৩ সালে ভারতের মুম্বাইয়ে এই ব্যাঙকে সমুদ্র থেকে মাত্র ৯০ মিটার দূরে প্রজনন করতে দেখেছিলেন। বাংলাদেশ ছাড়াও আফগানিস্তান, ভারত, ইরান, নেপাল, ওমান এবং পাকিস্তানে এই প্রজাতিটি পাওয়া যায়। বাংলাদেশে দুর্লভ হলেও কোন রকমের হুমকি না থাকায় এই ব্যাঙটিকে বিপদমুক্ত (Least Concern) হিসেবে ২০১৫ সালে IUCN Red list of Bangladesh অন্তর্ভুক্ত করা হয়।  

তথ্যসূত্রঃ

১। IUCN Red list of Bangladesh, Volume 4: Reptiles and Amphibian

২। Amphibians and Reptiles of Bangladesh – A Field Guide

৩। https://amphibiaweb.org/ এবং https://indiabiodiversity.org/

কমেন্ট করুন
ফিল্ড অফিসার | পদ্মা সেতু জাদুঘর

সেশনঃ ২০১২-২০১৩
প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মোঃ ফজলে রাব্বী

সেশনঃ ২০১২-২০১৩ প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়