দ্য সাউন্ড অব মার্ডার

(১)

কাজিবাড়ি রোড, তালাশপুর।

মফস্বল শহরে রাত এগারোটা মানে গভীর রাত। চায়ের দোকানের ঝাঁপ নামালেন রহিম মুন্সী। তার মুখে বিরক্তির ছাপ। বেচা-বিক্রি তেমন একটা হয়নি।

আশেপাশের সব বাড়ির আলো নিভে গেছে। ঘুমিয়ে গেছে এলাকাটা।

রাস্ত পার হতে গিয়েও থেমে দাঁড়ালেন রহিম মুন্সী। মনে করার চেষ্টা করছেন দোকানের মেইন সুইচ অফ করেছেন কিনা।

হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দে তার কানে তালা লেগে গেল। গুলির আওয়াজ! বাম দিকে, মানে পশ্চিম দিকে তাকালেন তিনি। শব্দটা ওদিক থেকেই এসেছে।

আরও দুটো গুলির শব্দে পুরো এলাকাটা যেন কেঁপে উঠলো। রহিম বুঝতে পারলেন, নাভেদ সাহেবের বাড়ি থেকে শব্দগুলো এসেছে। ত্রিশ-চল্লিশ গজ বামে রাস্তার ওপারে বাড়িটা।

দেরি না করে তালাশপুর থানায় কল দিলেন রহিম। এটা তার গোপন দায়িত্বের অংশ। তিনি পুলিশের সোর্স।

(২)

দুজন কনস্টেবলকে সাথে নিয়ে এসআই শরিয়ত ঘটনাস্থলে পৌঁছালেন মাঝরাতের একটু আগে।

বাদামি সিরামিক ইটের ডুপ্লেক্স বাড়ি, নাম ‘ব্রাউন প্যালেস’। সামনে নানা রঙের প্রিমরোজের সমারোহ। পিছনে বড় জায়গা জুড়ে সবজি আর ফলের বাগান।

দরজা খুললেন বাড়ির মালিকের স্ত্রী। নাম শামীম আরা কেয়া, বয়স ৩৪, গৃহিণী। তার কান্না এখনও থামেনি।

খুন হয়েছেন দুজন ব্যক্তি। একজন বাড়ির মালিক নাভেদ আহমেদ, বয়স ৪০, রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী। অন্যজনের পরিচয় জানা যায়নি, পরনে সাধারণ পোশাক, বয়স আনুমানিক ৫০। দুটো লাশই পড়ে আছে নিচতলার ডাইনিং রুমে। পিছনের দরজা দিয়ে বিল্ডিং-এ ঢুকলে প্রথমেই এই রুমটি।

নাভেদের লাশের কাছে পড়ে আছে একটি শটগান। গ্লাভস পরা হাতে সাবধানে সেটি পরীক্ষা করলেন এসআই শরিয়ত, যাতে কোনও ফিঙ্গারপ্রিন্ট থাকলে নষ্ট না হয়। ১২-গেইজ ২৮-ইঞ্চি ব্যারেলের শটগান, নাভেদের নামে লাইসেন্স করা। একটাই গুলি করা হয়েছে এটা দিয়ে। অপরিচিত লোকটির বুকে শটগানের গুলি লেগেছে বলে মনে হচ্ছে।

লোকটির হাতের কাছে পড়ে আছে একটা .৪৫ কোল্ট পিস্তল। দুটো গুলি করা হয়েছে এটা দিয়ে। একটি লেগেছে নাভেদের বুকে, অন্যটি উরুতে।

দরজার কাছে মেঝেতে একটা কালো ব্যাগ পড়ে আছে। ভিতরে তালা খোলার যন্ত্রপাতি। অপরিচিত লোকটাই কি ব্যাগের মালিক? চুরি করতে এসে নাভেদের সামনে পড়েছে?

বিল্ডিং-এ ঢোকার দুটি দরজাতেই ইয়েল্ লক। কোনও দরজাই বাইরে থেকে খোলার চেষ্টা করা হয়নি। পায়ের ছাপ দেখে মনে হচ্ছে লোকটা পিছনের দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকেছে। দরজাটা কি খোলা ছিল?

কেয়াকে জিজ্ঞেস করে জানা গেল, বাসায় আর কেউ থাকে না। ছুটা বুয়া প্রতিদিনের মতো আজও সন্ধ্যায় চলে গেছে। নাভেদ রাত দশটায় বাসায় ফিরে ড্রাইভারকেও ছুটি দিয়েছেন।

কেয়া জোর দিয়ে বললেন, তিনি নিজের হাতে পিছনের দরজা লক করেছেন, ছিটকিনিও দিয়েছেন। লোকটি তাহলে ঘরে ঢুকলো কীভাবে?

বুকে গুলি খেয়ে মৃতপ্রায় অবস্থায় পাল্টা গুলি করা অসম্ভব। শরিয়তের মনে হলো, প্রথম গুলি করেছে লোকটি, যা নাভেদের পায়ে লেগেছে। এরপর লোকটার দ্বিতীয় গুলি আর নাভেদের শটগানের গুলি একসাথে ছোড়া হয়েছে এবং দুজনই বুকে গুলি খেয়েছে।

নাভেদের দুই হাতে গ্লাভস আর দুই কানে ইয়ারপ্লাগ দেখা যাচ্ছে। হয়তো চোর এসেছে টের পেয়ে শটগান হাতে নেয়ার আগে দুই কানে প্লাগ পরেছেন তিনি। বন্ধ ঘরে শটগানের গুলির শব্দে কানের পর্দা ফেটে যাওয়ার ভয় থাকে।

কিন্তু, গ্লাভস পরার কোনও যুক্তি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। লাইসেন্স করা শটগান দিয়ে অস্ত্রধারী চোর-ডাকাতকে গুলি করলে দোষের কিছু নেই। হাতের ছাপ গোপন করতে হবে কেন?

(৩)

ডাইনিং টেবিলের উপর একটা ছোট ব্রিফকেস, বাদামি রঙের। ডুয়াল কম্বিনেশন লক।

শরিয়তের প্রশ্নের উত্তরে কেয়া বললেন কম্বিনেশন তার জানা নেই। ব্রিফকেসটা নাভেদের।

শরিয়ত একবার ভাবলেন ব্রিফকেসটা ভেঙে ফেলবেন। পরক্ষণেই তার মনে হলো, ‘০০০’ থেকে শুরু করে ‘৯৯৯’ পর্যন্ত সবগুলো কম্বিনেশন এক এক করে ব্যবহার করে দেখা যাক।

দুই হাত দিয়ে দুই দিকের লকে তিনি প্রথমে কম্বিনেশন দিলেন ‘০০০’। কাজ হলো না। এরপর ০০১, ০০২, ০০৩ – এভাবে চেষ্টা চালিয়ে গেলেন। ‘১৩১’ কম্বিনেশনে বাম দিকের লকটা খুলে গেল, কিন্তু ডান দিকেরটা খুললো না। শরিয়ত ডান দিকের লকে ১৩২, ১৩৩, ১৩৪,  কম্বিনেশনগুলো এক এক করে দিয়ে যেতে থাকলেন। অবশেষে ‘২১৯’ কম্বিনেশনে ডান দিকের লকটাও খুললো।

ভিতরে একটা নাইন এমএম পিস্তল! পুরোপুরি লোডেড। কোনও গুলি করা হয়নি এটা দিয়ে।

১৩১ আর ২১৯ কম্বিনেশনের কি বিশেষ কোনও অর্থ আছে? নাকি লক্ষ্যহীনভাবে বেছে নেয়া?

(৪)

ফরেনসিক রিপোর্ট পাওয়া গেল পরদিন দুপুর বারোটায়। শটগান আর .৪৫ পিস্তলই হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়েছে। শটগানে নাভেদের ফিঙ্গারপ্রিন্ট রয়েছে, তবে পুরানো। তার হাতে গ্লাভস ছিলো, তাই নতুন ফিঙ্গারপ্রিন্ট থাকার কথা নয়।

.৪৫ পিস্তলে অপরিচিত লোকটির ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া গেছে, নতুন পুরাতন দুরকমই। নাইন এমএম পিস্তলে কোনও ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেই। আরও জানা গেছে, দুটি পিস্তলই অবৈধ (লাইসেন্স নেই)।

বৈধ শটগান থাকতেও নাভেদের কেন অবৈধ পিস্তলের দরকার হলো?

দুজন সাক্ষীর দেয়া তথ্যে এসআই শরিয়ত আরেকটি বিভ্রান্তিতে পড়লেন। এরা কেউ প্রত্যক্ষদর্শী (eye-witness) নন, হত্যাকাণ্ড-সম্পর্কিত কিছু দেখেননি। এদেরকে বলা যায় প্রত্যক্ষশ্রোতা (ear-witness)।

প্রথম প্রত্যক্ষশ্রোতা রহিম মুন্সী (পুলিশের সোর্স)। তিনি বলেছেন, ‘প্রথম গুলির চাইতে দ্বিতীয় আর তৃতীয় গুলির শব্দ অনেক বেশি জোরে হইছে। শব্দগুলার মাঝে সময়ের ব্যবধান ছিলো ৪/৫ সেকেন্ড।’

দ্বিতীয় প্রত্যক্ষশ্রোতা মিসেস সুলতানা, বয়স ৫৫, বিধবা। দুই সন্তানসহ ‘ব্রাউন প্যালেস’-এর পশ্চিম পাশের একতলা বাড়িতে থাকেন। তিনি বলেছেন, ‘প্রথম শব্দটার চেয়ে দ্বিতীয় আর তৃতীয় শব্দ দ্বিগুণ জোরে হয়েছে।’

শরিয়তের ধারণা, পিস্তলের চেয়ে শটগানের গুলির শব্দ বেশি। সাক্ষীদের কথা সত্যি হলে ধরে নিতে হয়, পিস্তলের গুলি হয়েছে একটি আর শটগানের গুলি হয়েছে দুটি। কিন্তু, ফরেনসিক রিপোর্ট বলছে উল্টো কথা। ব্যাপারটা কী?

শরিয়ত তার মোবাইলে Google করলেন “12-gauge 28-inch barrel shotgun sound”। জানা গেল, এই ধরনের শটগানের গুলি প্রায় ১৫২ ডেসিবেল (১৫.২ বেল) শব্দ তৈরি করে। .৪৫ কোল্ট পিস্তলের গুলিতে প্রায় ১৫৫ ডেসিবেল (১৫.৫ বেল) শব্দ তৈরি হয়। দুটি শব্দের তীব্রতা তো প্রায় সমান মনে হচ্ছে! সাক্ষী দুজন এমন বলছেন কেন?

এসআই শরিয়ত তার এক বন্ধুর ছোটভাইকে কল দিলেন। পদার্থবিজ্ঞানে মাস্টার্স করছে ছেলেটা। তার কাছ থেকে জানা গেল, ‘বেল’ হিসাব করা হয় ১০-ভিত্তিক লগ স্কেলে। তাই, কোল্ট পিস্তল আর শটগানের শব্দের তীব্রতার অনুপাত = ১০১৫.৫/১০১৫.২ = ১.৯৯৫। অর্থাৎ, কোল্ট পিস্তলের শব্দের তীব্রতা প্রায় দ্বিগুণ।

সাক্ষী দুজন তো ঠিকই বলেছে!

তার মানে, প্রথমে শটগানের গুলি, তার ৪/৫ সেকেন্ড পরে পিস্তলের প্রথম গুলি, আরও ৪/৫ সেকেন্ড পরে পিস্তলের দ্বিতীয় গুলি হয়েছে।

অপরিচিত লোকটির পরিচয় জানা গেছে। তার নাম হিরণ, সিঁধেল চোর। থাকতো বেলতলা। জায়গাটা ঘটনাস্থল থেকে দুই কিলোমিটার উত্তরে, নাভেদের পৈত্রিক বাড়ির কাছে।

শুরুতেই হিরণের বুকে শটগানের গুলি লেগেছে। এর ৪/৫ সেকেন্ড পরে (অনেক রক্তক্ষরণের পরে) তার পক্ষে কাউকে গুলি করা অসম্ভব। নাভেদকে তাহলে কে গুলি করলো?

(৫)

শরিয়তের হঠাৎ মনে হলো, কেয়াকে সন্দেহের তালিকা থেকে বাদ দেয়া ঠিক হচ্ছে না। বাসায় তিনজন লোক ছিলো। দুজন খুন হলো, কিন্তু কেয়ার কিছুই হলো না!

‘শামীম আরা কেয়া’ নামটাকে শরিয়তের এখন মনে হচ্ছে ‘স্বামী-মারা কেয়া’।

থানায় ডেকে পাঠানো হলো কেয়াকে। শরিয়ত নিজেই তাকে জেরা করলেন।

‘গুলির শব্দ যখন হলো, আপনি তখন কোথায় ছিলেন?’

‘নিচতলার গেস্টরুমে।’

‘কী করছিলেন?’

‘রেস্ট নিচ্ছিলাম।’

‘আপনি কি গেস্টরুমেই থাকতেন? মানে, আপনার স্বামীর সাথে তো আপনার সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিলো না–’ শরিয়ত আন্দাজে ঢিল ছুড়লেন।

‘দেখুন, আমার ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আমি কথা বলতে চাই না।’

‘খুনের সাথে আপনার ব্যক্তিগত বিষয়ের সম্পর্ক থাকতে পারে। দয়া করে আমার প্রশ্নের উত্তর দিন।’

চুপ করে রইলেন কেয়া।

‘দেখুন,’ বিরক্তির সাথে বললেন শরিয়ত, ‘সব প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আপনি থানা থেকে যেতে পারবেন না।’

বাধ্য হয়ে কেয়া সবকিছু ব্যাখ্যা করলেন। তার বিয়ে হয়েছে দেড় বছরও হয়নি। নাভেদ যে লম্পট, তা কেয়ার জানা ছিলো না। বিয়ের কয়েকমাস পর নাভেদ আবার তার লাম্পট্য শুরু করলো। এক পর্যায়ে বাসাতেও মেয়ে নিয়ে আসা শুরু করলো। তার সাথে থাকা সম্ভব নয় বলে গত দু’মাস ধরে কেয়া নিচতলার গেস্টরুমে থাকছেন।

‘চলে যাননি কেন?’ শরিয়ত জানতে চাইলেন।

‘আমার বাবার লাং ক্যানসার। স্টেজ ফোর। আর বেশিদিন বাঁচবেন না। এ অবস্থায় তাকে বাড়তি অশান্তি দিতে চাইনি। ভেবেছি, বাবা মারা যাওয়ার পর নাভেদকে ডিভোর্স দিবো।’

শরিয়ত কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর জানতে চাইলেন, ‘গুলির শব্দ শুনে আপনি কী করলেন?’

‘প্রথম শব্দটা শুনেই তাড়াতাড়ি রুমের দরজায় ছিটকিনি দিলাম। গুলির শব্দ থেমে যাওয়ার পরেও অনেকক্ষণ ভয়ে বের হইনি।’

‘কীসের ভয় পাচ্ছিলেন?’

‘ভেবেছি নাভেদ আমাকে খুন করতে পারে।’

অবাক হলেন শরিয়ত। বললেন, ‘নাভেদ সাহেব তো চাইলেই আপনাকে ডিভোর্স দিতে পারতেন। খুন করতে চাইবেন কেন?’

‘তা তো জানি না। ঐ সময়ে এটাই মনে হচ্ছিলো।’

কেয়ার ধারণাটা আমূলক নাও হতে পারে! নাভেদের অবৈধ পিস্তল, হাতের গ্লাভস – এগুলো হয়তো কেয়াকে হত্যার পরিকল্পনার অংশ! কিন্তু, মোটিভটা কী?

‘আপনার বিয়ের কাবিন কত?’ শরিয়তের জিজ্ঞাসা।

‘বিশ লাখ।’

টাকা ‍একটা মোটিভ হতে পারে, ভাবলেন শরিয়ত। কেয়াকে বিদায় দিয়ে রহিম মুন্সীকে কল দিলেন তিনি। নাভেদ আর হিরণের পূর্ব-পরিচয় ছিলো কিনা খোঁজ নিতে বললেন।

(৬)

পরদিন রহিম মুন্সী জানালেন, নাভেদ হিরণকে চিনতেন। ‍শুধু তাই নয়, ঘটনার আগের দিন হিরণের বাসার কাছে দুজনের কথা হয়েছে।

নতুন তথ্যের ভিত্তিতে শরিয়ত হত্যাকাণ্ডের একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে চেষ্টা করলেন: নাভেদের প্ল্যান ছিলো কেয়াকে খুন করে হিরণকে খুনি সাজানো। লোকটার সাথে দেখা করে নাভেদ তাকে ঘটনার দিন রাত এগারোটায় বাসায় আসতে বলেছেন এবং পিছনের দরজা খুলে রেখেছেন। হিরণ ঘরে ঢুকতেই নাভেদ তাকে শটগান দিয়ে গুলি করেছেন। তার প্ল্যান ছিলো হিরণের .৪৫ পিস্তলটা দিয়ে কেয়াকে খুন করা। হিরণ .৪৫ পিস্তলটা সাথে না আনলে নাভেদ তার নাইন এমএম পিস্তলটা ব্যবহার করে সেটাই হিরণের পিস্তল বলে চালিয়ে দিতেন। নিজের পিস্তলটা দরকার না হলে পুলিশ আসার আগে নাভেদ সেটা লুকিয়ে ফেলতেন।

আর কোনও ব্যাখ্যা শরিয়ত দাঁড় করাতে পারছেন না।

হিরণের পিস্তলটা নাভেদ নেয়ার আগেই কেউ একজন তুলে নিয়ে নাভেদকে গুলি করেছে। কে সে? কেয়া?

শরিয়ত চিন্তা করে দেখলেন, কেয়ার পক্ষে কাজটা অসম্ভব। গুলির শব্দ শুনে গেস্টরুম থেকে ডাইনিং রুমে এসে নাভেদকে পার হয়ে হিরণের কাছে যেতে হয়েছে। নাভেদ কি ততক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকেছে?

কেয়া নয়, অন্য কেউ কাজটা করেছে।

খোঁজখবর নিয়ে জানা গেল, কেয়ার সাথে নাভেদের ছোট ভাই পুলকের বেশ ভাব। তার বয়স ৩৬, অবিবাহিত। পৈত্রিক বাড়িতে থাকেন, বাবার বিজনেস দেখাশোনা করেন।

পুলককে থানায় ডেকে এনে জেরা করলেন শরিয়ত। পুলকের দাবি, তিনি ঘটনার সময় নিজের বাসায় ছিলেন। সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের উপায় নেই।  

‘আপনি কি হিরণকে চিনতেন?’ শরিয়ত জিজ্ঞেস করলেন।

‘হিরণ কে?’

‘আপনার ভাইয়ের সাথে যিনি খুন হলেন।’

‘না, তাকে চিনতাম না।’

‘সে তো আপনাদের এলাকারই।’

‘চিনতাম না,’ আবার বললেন পুলক।

শরিয়ত ভেবে দেখলেন, পুলকের পক্ষেও নাভেদকে খুন করা কঠিন। ধরা যাক, নাভেদের প্ল্যানটা জেনে বা কিছুটা আঁচ করে পুলক কিচেনে লুকিয়ে ছিলেন। তাহলেও তিনি আর নাভেদ একসাথে হিরণের কাছে পৌঁছাতেন এবং পিস্তলটা নিয়ে দু’জনে কাড়াকাড়ি হতো। কিন্তু, নাভেদ তো কিছুটা দূর থেকে গুলি খেয়েছেন।

হতে পারে, পিস্তলটা কেড়ে নিয়ে পুলক নাভেদকে ধাক্কা মেরে দূরে সরিয়ে তারপর গুলি করেছেন।

আরেকটু ভেবে দেখা দরকার, ভাবলেন শরিয়ত।

(৭)

রহিম মুন্সীর দোকান থেকে দুই প্যাকেট ড্রাই কেক কিনলেন মিসেস সুলতানা (দ্বিতীয় প্রত্যক্ষশ্রোতা)। এই মুহূর্তে তিনি দোকানের একমাত্র কাস্টোমার।

‘এক কাপ চা খান, ভাবী?’

‘না, রহিম ভাই। আজকাল কিছুই ভালো লাগে না। খুনের ঘটনা ভুলতেই পারছি না।’

‘হ, ভাবী। দুই দুইটা খুন –’

‘আমি আসলে পুলিশকে সব কথা বলি নাই। ঝামেলায় পড়তে চাই না।’ সুলতানা গলা নামিয়ে কথা বলছেন।

‘কী বলেন নাই, ভাবী?’ রহিম নির্লিপ্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন।

‘শুনলাম, লোকটার নাম হিরণ। তার একজন সাগরেদ আছে জানেন?’

‘না তো, ভাবী!’

‘তার নাম লাল মিয়া। ভয়ংকর লোক। হিরণের পিস্তলটা সে-ই বেশি ব্যবহার করতো।’

‘বলেন কী!’

‘হ্যাঁ, রহিম ভাই। ঘটনার সময় আমি আমার বাসার পূব দিকের জানালায় বসেছিলাম। দেখলাম দুইজন লোক নাভেদের বাসার পিছনে এসে দাঁড়ালো। একজন ভিতরে ঢুকতেই গুলির শব্দ হলো। সাথে সাথে অন্যজন পকেট থেকে পিস্তল বের করে ভিতরে দৌড়ে গেল। আরও দুটো গুলির শব্দ পেলাম। এরপরই দ্বিতীয় লোকটা বের হয়ে দৌড়ে চলে গেল।’

‘পুলিশকে বলেননি কেন, ভাবী?’

‘বললাম না, ঝামেলায় জড়াতে চাই না। সবাই যা জানে, শুধু সেটুকুই পুলিশকে বলেছি। আপনি কাউকে বলবেন না, প্লিজ।’

‘ঠিক আছে, ভাবী।’

সুলতানা চলে যাওয়ার সাথে সাথে রহিম এসআই শরিয়তকে কল দিলেন।

সুলতানার কথা সত্যি হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি, ভাবলেন শরিয়ত। নাভেদ আর পুলক হিরণের পিস্তল নিয়ে কাড়াকাড়ি করেছে, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।

পুলিশ বেলতলায় হিরণের বাসায় তল্লাশি চালালো। দুটো এন.আই.ডি. পাওয়া গেল। একটা হিরণের, অন্যটা লাল মিয়ার। পুলিশ পূর্ণ উদ্যমে লাল মিয়ার সন্ধানে লেগে গেল।

(৮)

তৃপ্তির হাসি হাসছেন পুলক।

পুলিশ হন্যে হয়ে লাল মিয়াকে খুঁজছে। তারা জানে না, লাল মিয়া আর হিরণ একই মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ।

লাল মিয়া ছিলো তার আসল নাম, হিরণ ছদ্মনাম। মানুষকে ধোঁকা দিতে তিনি দুটো এন.আই.ডি. বানিয়েছিলেন। একটাতে আসল নামের সাথে নকল ছবি, অন্যটাতে নকল নামের সাথে আসল ছবি।

‘লাল মিয়া’কে কেউ ধরতে এলে তিনি ‘হিরণ’-এর এন.আই.ডি. দেখিয়ে বলতেন, ‘আমি তো হিরণ।’ ‘হিরণ’-কে কেউ খুঁজতে এলে বাসায় লাল মিয়ার এন.আই.ডি. (ভুয়া ছবিসহ) রেখে নিজে সরে পড়তেন। তার কাছের লোকেরা বলতো, ‘এখানে তো লাল মিয়া থাকে, হিরণ নামের কেউ থাকে না।’

লাল মিয়া জীবনে একটাই ভুল করেছেন। পুলকের সাথে অনেক দিনের যোগাযোগ থাকায় তাকে বিশ্বাস করেছেন। পুলক যে নারী আর সম্পত্তির লোভে ভাইকে খুনের প্ল্যান করেছে, তা তিনি বুঝতে পারেননি।

পুলিশ বুঝে ফেলেছে, হিরণ নাভেদকে গুলি করেনি। তাই হিরণের ‘সাগরেদ’ লাল মিয়ার গল্প ফেঁদেছেন পুলক। রহিমকে ‘পুলিশের সোর্স’ বলা হলে সুলতানাকে বলতে হয় ‘অপরাধীর সোর্স’। রহিমকে তিনি মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন। স্বামী মারা যাওয়ার পর পুলক নানা সময়ে তাকে আর্থিক সহযোগিতা করেছে। তাই পুলকের অনুরোধ তিনি ফেলতে পারেননি।

নাভেদের ব্রিফকেসে রাখা নাইন এমএম পিস্তলটা আসলে পুলকের। এসআই শরিয়তের মতো পুলকও ব্রিফকেসের কম্বিনেশন উদ্ধার করতে পেরেছিলেন।

ঘটনার আগের দিন পুলকের প্ল্যান অনুযায়ী হিরণ নাভেদকে ডেকে নিয়ে নানা ছুতায় ব্যস্ত রেখেছেন। হিরণকে পুলক বুঝিয়েছেন, ‘আমি নাভেদ ভাইয়ের বাসায় একটা কাগজ খুঁজবো।’

ঘটনার দিন রাত এগারোটায় পুলক হিরণকে নাভেদের বাসায় যেতে বলেছেন, কারণ ‘একটা সেফ খুলে কিছু কাগজপত্র সরাতে হবে।’

সেদিন রাত সাড়ে দশটা থেকে ‘ব্রাউন প্যালেস’-এর নিচতলায় ড্রয়িংরুমে পুলক নাভেদের সাথে কথা বলেছেন। হিরণ আসার সময় হতেই ‘পানি খেয়ে আসি’ বলে ‍ডাইনিং রুমে গিয়ে গ্লাভস আর ইয়ারপ্লাগ পরে তৈরি হয়েছেন তিনি। নাভেদের শটগান আর ব্রিফকেস আগেই সেখানে লুকিয়ে রেখেছিলেন।

হিরণ ঘরে ঢুকতেই তাকে গুলি করে তার .৪৫ পিস্তলটা হাতে নিয়েছেন পুলক। নাভেদ গুলির শব্দ শুনে ডাইনিং রুমে আসতেই তাকেও গুলি করেছেন – দূর থেকে একবার, কিছুটা এগিয়ে গিয়ে আরেকবার। তারপর নাভেদের কানে প্লাগ আর হাতে গ্লাভস পরিয়ে চলে গেছেন পুলক।

(৯)

কাজিবাড়ি রোডের হত্যাকাণ্ডের রিপোর্ট লিখছেন এসআই শরিয়ত।

নাভেদ কীভাবে কেয়াকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন, তা রিপোর্টে বিস্তারিত উল্লেখ করতে হবে। দুজনের বিয়ের তারিখ দরকার হলো তার। চেক করে দেখলেন তারিখটা ১৩ই ডিসেম্বর, ২০১৯।

কী একটা ব্যাপার তার মনে পড়তে গিয়েও পড়ছে না!

হঠাৎ তড়াক করে উঠে দাঁড়ালেন শরিয়ত। কাগজপত্র ঘেঁটে দেখলেন, নাভেদের ব্রিফকেসের কম্বিনেশন ছিলো ১৩১-২১৯। একে ছয় অংকের তারিখ হিসেবে লিখলে দাঁড়ায় ১৩.১২.১৯ নাভেদের বিয়ের তারিখ!

খোঁজ নিয়ে জানা গেল, নাভেদ ব্রিফকেসটা কিনেছেন মাস দুয়েক আগে। কেয়ার ভাষ্য অনুযায়ী তখন নাভেদের লাম্পট্যের কারণে দুজনের সেপারেশন চলছে এই অবস্থায় নাভেদ তার বিয়ের তারিখ কম্বিনেশন হিসেবে ব্যবহার করলেন!

একজন লম্পটের কাছে তার বিয়ের তারিখ কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ?

কেয়া যদি স্বামীর চরিত্র নিয়ে মিথ্যা বলে থাকে, তাহলে ধরে নিতে হবে কেয়া নিজেই চরিত্রহীন। পুলকের সাথে কি তার অবৈধ সম্পর্ক?

শরিয়ত খুনের ঘটনাটা নতুন করে ‍বিশ্লেষণ করতে শুরু করলেন।

এক পর্যায়ে তিনি অধীনস্থ একজন এএসআই-কে ডেকে পাঠালেন। তিনজন সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করতে হবে।

(শেষ)

কমেন্ট করুন

প্রাক্তন শিক্ষার্থী

পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সেশনঃ ১৯৮৩ - ৮৪

জাফর আহমেদ খান

প্রাক্তন শিক্ষার্থী পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেশনঃ ১৯৮৩ - ৮৪

0