দ্য ডায়মন্ড রিং

(১)

মার্বেল-টপ ডাইনিং টেবিলের চারপাশে বসে আছেন চারজন নারী। লাঞ্চ শেষ করে গল্প করছেন তারা।

টেবিলের দক্ষিণ পাশে বসেছেন অবনি। তিনি বনানীর এই বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের মালিকের স্ত্রী, বয়স ৩৪, গৃহিণী। তার বিজনেস ম্যাগনেট স্বামী আদনান কবির এ মুহূর্তে বাসায় নেই।

অবনির ডান পাশে বসে আছেন ঐশী। ভার্সিটিতে অবনির ক্লাসমেট ছিলেন তিনি। পাশের বিল্ডিং-এ তার বাসা। স্বামী পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের জয়েন্ট সেক্রেটারি।

অবনির বাম পাশে বসেছেন ওয়ালিদা। বয়স ৪০, থাকেন রাস্তার উল্টো পাশের বিল্ডিং-এ। স্বামী আর্কিটেক্ট।

টেবিলের উত্তর পাশে রয়েছেন মিতা, বয়স ২৮। ভার্সিটির পড়া শেষ করে চাকরি আর বিয়ের অপেক্ষায় আছেন। পিছনের রাস্তায় তার ভাইয়ের বাসায় থাকেন। ভাই-ভাবী দুজনই ব্যাংকার। মিতার পোশাকে আভিজাত্য না থাকলেও তিনি চারজনের মধ্যে সেরা সুন্দরী।

কাজের মেয়ে এসে তিনজন গেস্টের সামনে তিন গ্লাস অরেঞ্জ জুস রেখে গেল।

‘তুই খাবি না?’ ঐশী জিজ্ঞেস করলেন।

মাথা নাড়লো অবনি।

‘তোর ডায়মন্ড রিং এনাদেরকে দেখাবি না?’

‘ও হ্যাঁ’ বলে বেডরুমে চলে গেলেন অবনি। একটু পরে ফিরে এলেন হাতে একটা ছোট কালো কুশন আকৃতির বক্স নিয়ে।

বক্সটা খুলতেই ঢাকনার নিচের দিকে সেট করা ছোট্ট LED বাল্ব জ্বলে উঠলো। তার উজ্জ্বল আলো সরাসরি পড়লো আংটির উপর। ঝিকমিক করে উঠলো প্ল্যাটিনাম ব্যান্ডে বসানো রাউন্ড-কাট ডায়মন্ডটি।

তিনজোড়া চোখের মুগ্ধ দৃষ্টি উপভোগ করছেন অবনি। ঐশী আগে কয়েকবার দেখেছেন আংটিটা, তারপরও ওয়ালিদা আর মিতার মতো তিনিও যেন নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেছেন।

‘ডায়মন্ডটা কত ক্যারেট?’ ওয়ালিদা জিজ্ঞেস করলেন।

‘টু পয়েন্ট জিরো টু,’ বললেন অবনি।

‘গোল্ডের ক্যারেট তো ২১, ২২ এরকম হয়,’ বললেন মিতা।

‘গোল্ডের ক্যারেট বানান k-a-r-a-t,’ বললেন অবনি। ‘২১ ক্যারেট মানে ২৪ ভাগের ২১ ভাগ গোল্ড, বাকি ৩ ভাগ অন্য মেটাল। ডায়মন্ডের ক্যারেট বানান c-a-r-a-t, এটা ওজনের একক। ১ ক্যারেট মানে ২০০ এমজি।’

‘আংটিটার দাম কত?’ মিতা জিজ্ঞেস করলেন।

‘৫০ লক্ষ টাকা।’

মিতা হা করে রইলেন।

ওয়ালিদা বললেন, ‘আমার এক বান্ধবী তো ২ ক্যারেটের একটা ডায়মন্ড রিং কিনেছে ১৫ লক্ষ টাকায়।’

হাসলেন অবনি। বললেন, ‘শুধু ক্যারেট দিয়ে তো দাম হয় না। ডায়মন্ডের কোয়ালিটি মাপা হয় Clarity, Color, Cut আর Carat – এই চারটা C দিয়ে। Clarity হলো ডায়মন্ডের স্বচ্ছতা বা বিশুদ্ধতা –’

‘ডায়মন্ড তো স্বচ্ছই হয়,’ বললেন ওয়ালিদা।

‘মোটেই না। খনিতে ডায়মন্ড তৈরি হওয়ার সময় ভিতরে ক্রিস্টাল বা অন্য জিনিস আটকা পড়লে কোয়ালিটি কমে যায়। Clarity-র বেস্ট ক্যাটেগরি হলো FL, মানে Flawless বা নিখুঁত। এক হাজারে একটা ডায়মন্ড এই ক্যাটেগরিতে পড়ে।’

‘এই ডায়মন্ডটা কি FL ক্যাটেগরির?’ মিতা জিজ্ঞেস করলেন।

‘হ্যাঁ। Color-এর বিচারেও এটা সেরা। কালারের ক্যাটেগরি আছে D থেকে Z পর্যন্ত। এই ডায়মন্ডটা D ক্যাটেগরির, মানে পুরোপুরি কালারলেস। এর Cut-ও এক্সেলেন্ট গ্রেডের।’

ভ্রু কুঁচকে আছে ওয়ালিদার। আংটির দাম তার বিশ্বাস হয়নি।

অবনি তাকে বললেন, ‘আইভি আন্টি আপনার মামী, তাই না? তাকে জিজ্ঞেস করলে জানতে পারবেন, অনেক খুঁজেও D-কালারের FL ডায়মন্ড পাননি তিনি। আমার এই আংটির জন্য ৬০ লক্ষ টাকা অফার করেছেন আন্টি, আমি বিক্রি করিনি।’

‘আমি একটু হাতে নিয়ে দেখি?’ বললেন ওয়ালিদা।

‘অবশ্যই’ বলে আংটিটা বক্স থেকে বের করে তার হাতে দিলেন অবনি।

ভাল করে দেখে ফেরত দেয়ার সময় ওয়ালিদা বললেন ‘দারুণ!’

‘আপনিও দেখুন,’ বলে মিতার হাতে আংটিটা দিলেন অবনি।

ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ডায়মন্ডটা দেখছেন মিতা।

হঠাৎ ঐশীর জুসের গ্লাস টেবিলের উপর কাত হয়ে পড়ে গেল। ভাগ্যিস খুব বেশি জুস ছিলো না গ্লাসে। কাজের মেয়েটাকে ডেকে টেবিলটা মুছতে বললেন অবনি।

মিতা আংটিটা ফেরত দিতেই সেটা রাখতে বেডরুমে চলে গেলেন তিনি।

(২)

বিকেল পাঁচটায় বনানী থানায় চুরির মামলা দায়ের করলেন অবনি। এজাহারে লেখা হলো, ‘পঞ্চাশ লক্ষ টাকা মূল্যের ডায়মন্ড রিং পাল্টে অন্য একটি ডায়মন্ড রিং দেয়া হয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য পনেরো লক্ষ টাকার বেশি নয়।’ সন্দেহভাজন হিসেবে উল্লেখ করা হলো মিতা হকের নাম।

তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছেন এসআই ফয়েজ। তার অফিসে বসে দুপুরের ঘটনা বিস্তারিত ব্যাখ্যা করলেন অবনি।

‘আপনার গেস্ট তো ছিলো তিনজন,’ বললেন এসআই ফয়েজ। ‘আপনার কেন মনে হচ্ছে মিতা আংটিটা নিয়েছেন?’

‘আয়রন সেফ থেকে বের করার পর আমি এক সেকেন্ডের জন্যও আংটি থেকে চোখ সরাইনি। যখন ঐশীর জুসের গ্লাস পড়ে গেল, শুধু তখনই কয়েক সেকেন্ডের জন্য আমার মনোযোগ সেদিকে চলে গেল –’

‘তাহলে কি মিতার সাথে ঐশীও আংটি চুরির সাথে জড়িত?’ জিজ্ঞেস করলেন ফয়েজ।

‘আপনি কেন ধরে নিচ্ছেন ঐশী গ্লাসটা ফেলেছে? মিতা ডান হাতে আংটিটা উঁচু করে ধরে ছিলো। আমাদের সবার মনোযোগ ছিলো সেদিকে। হতে পারে, সে বাম হাত দিয়ে গ্লাসটা ফেলেছে।’

‘ওয়ালিদাও তো আংটিটা হাতে নিয়ে দেখেছেন,’ বললেন ফয়েজ।  

‘তখন তো আমি আংটির দিকে চোখ রেখেছিলাম,’ বললেন অবনি।

‘কম দামের আংটিটা কোথায়?’ ফয়েজ জানতে চাইলেন।

পার্স থেকে বের করে অবনি আংটিটা ফয়েজের হাতে দিলেন। ভাল করে দেখে সেটা ফেরত দিলেন ফয়েজ। বললেন, ‘আপাততঃ আপনার কাছেই রাখুন। আংটিটা দেখতে তো সুন্দর –’

‘আপনি তো আমার আংটিটা দেখেননি, তাই এমন বলছেন। এই যে ছবি দেখুন।’

অবনির আইফোনে চুরি যাওয়া আংটির ছবি দেখে ফয়েজ বললেন, ‘দারুণ!’

‘এবার দুটো আংটির ছবি পাশাপাশি দেখুন।’

ভাল করে দেখে ফয়েজ বললেন, ‘পার্থক্য তো পরিষ্কার!’

‘এখানে আসার আগে আমি ডায়মন্ডের দোকান Bellissima-তে গিয়েছিলাম, যেখান থেকে আমি আংটিটা কিনেছিলাম। ওরা জানিয়েছে, এই কম দামের ডায়মন্ডটা G-কালারের, SI ক্যাটেগরির।’

‘SI মানে কী? আমরা তো SI বললে সাব-ইন্সেপেক্টর বুঝি,’ ফয়েজ হেসে বললেন।

‘SI মানে Slightly Included– খনিতে ডায়মন্ডটা তৈরি হওয়ার সময় সামান্য পরিমাণে অন্য জিনিস ভিতরে আটকা পড়েছে।’

‘এমন কিছু তো দেখলাম না –’

অবনি বললেন, ‘ম্যাগনিফায়িং গ্লাস দিয়ে দেখলে বোঝা যায়।’ দুটো ডায়মন্ডের কোয়ালিটির পার্থক্য ব্যাখ্যা করলেন তিনি।  

‘মিতা যখন আপনাকে কম দামের ডায়মন্ডটা দিলো, আপনি কেন বুঝতে পারলেন না?’ জিজ্ঞেস করলেন ফয়েজ।

‘টেবিলে জুস পড়ায় আমার মনোযোগ নষ্ট হয়েছিলো। মিতা রিংটা দিতেই আমি বক্সে ভরে ফেললাম, ভাল করে দেখলাম না। গেস্টরা চলে যাওয়ার পর হঠাৎ সন্দেহ হলো –’

‘আপনি কি এখন বাসায় যাবেন?’ ফয়েজ জানতে চাইলেন।

‘হ্যাঁ, কেন?’

‘আমরা মাইক্রো নিয়ে আপনার গাড়ির সাথে যাব। মিতার বাসাটা চিনিয়ে দিবেন।’

(৩)

সন্ধ্যা সাতটায় মিতাদের গলিতে ঢুকলো পুলিশের মাইক্রো।

এসআই ফয়েজের সাথে চারজন কনস্টেবল রয়েছেন– দুজন নারী, দুজন পুরুষ। মিতাকে গ্রেফতার করতে হতে পারে, তাই টিমে নারী কনস্টেবল রাখা হয়েছে।

অবনির দেয়া তথ্য অনুযায়ী ২০ নম্বর বিল্ডিং-এর সামনে মাইক্রোটা দাঁড়ালো।

চারতলা বাড়ি, লিফট নেই। বুড়ো দারোয়ান টুলে বসে দেয়ালে হেলান দিয়ে ঘুমাচ্ছেন। ফয়েজের ডাকে ধড়মড়িয়ে উঠে জানালেন, ‘মিতা আফা বাসায় আছে। তার ভাই-ভাবী অফিস থেইকা ফেরে নাই।’

ফয়েজ তার টিম নিয়ে তিনতলায় উঠে বামদিকের ফ্ল্যাটে কলিংবেল বাজালেন। কোনও সাড়াশব্দ নেই। কয়েকবার কলিংবেল বাজিয়েও কোনও সাড়া পাওয়া গেল না।

হ্যান্ডেল ঘোরাতেই দরজা খুলে গেল। ভিতরে ঢুকে পড়লেন ফয়েজ।

বাম দিকের বেডরুমে আলো জ্বলছে। কেমন একটা শব্দও পাওয়া যাচ্ছে। ফয়েজের ইংগিত পেয়ে দুজন নারী কনস্টেবল রুমটিতে ঢুকলেন। পরক্ষণেই তাদের ‘স্যার’ চিৎকার শুনে ফয়েজ দৌড়ে গেলেন।

বিছানায় একটা মেয়ে ছটফট করছে। প্রচন্ড খিঁচুনিতে তার শরীর ধনুকের মতো বেঁকে যাচ্ছে – একবার সামনের দিকে, একবার পিছন দিকে। মানুষের শরীর এতখানি বেঁকে যেতে পারে!

বয়স আর পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনা করে ফয়েজ বুঝলেন, এই মেয়েটাই মিতা।

চারজন কনস্টেবল বহু কষ্টে মেয়েটাকে নিচে নামিয়ে মাইক্রোতে তুললেন। এর মধ্যেই দারোয়ানের কাছ থেকে তালা-চাবি জোগাড় করে মিতাদের বাসায় তালা দিয়েছেন ফয়েজ। চাবি রেখেছেন নিজের কাছে।

একজন পুরুষ কনস্টেবলকে বাসা পাহারা দেয়ার নির্দেশ দিলেন তিনি। বললেন, ‘মিতার ভাই-ভাবী এলেও বাসায় ঢুকতে দিবেন না। আমরা ফিরে এসে সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করবো। এটা এখন attempt-to-murder কেইস। আমি মোটামুটি শিওর, মিতাকে বিষ খাওয়ানো হয়েছে।’

(৪)

‘খিঁচুনি’ আর ‘বিষ’ শব্দ দুটো শুনে হাসপাতালের ডাক্তার ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।

আটটার দিকে মিতাদের বাসায় ফিরে তদন্তের কাজ শুরু করলেন ফয়েজ।

ডাইনিং টেবিলে অর্ধেক খাওয়া হোয়াইট ফরেস্ট পেস্ট্রি দেখা যাচ্ছে। প্যাকেটে দোকানের নাম লেখা রয়েছে মিলি’স ফ্যামিলি। ফয়েজের মনে হলো, এই খাবারেই বিষ মেশানো হয়েছে। ল্যাব টেস্ট করাতে হবে।

দারোয়ান জানালেন, মিতা তিনটার দিকে বাসায় ফিরেছেন। চারটার দিকে হিজাব-নেকাব পরা একজন ভদ্রমহিলা মিতাদের বাসায় এসেছেন, ছয়টার দিকে চলে গেছেন।

‘ভদ্রমহিলার নাম জিজ্ঞাসা করেছিলেন?’

মাথা চুলকে দারোয়ান বললেন, ‘করছি স্যার। নামটা মনে করতে পারতেছি না।’

‘ওয়ালিদা?’

‘না, স্যার।’

‘ঐশী?’

‘না।’

‘অবনি?’

‘হ স্যার, অবনি।’

এই ব্যাটা বলে কী! ভাবলেন ফয়েজ। অবনি তো পাঁচটা থেকে সাতটা পর্যন্ত আমাদের সাথে ছিলেন!

‘আপনি শিওর, নামটা অবনি?’

‘হ স্যার, এখন মনে পড়ছে।’

ফয়েজ বুঝতে পারলেন, অবনিকে ফাঁসানোর জন্য তার নাম ব্যবহার করা হয়েছে।

মিতার ভাই-ভাবীকে জিজ্ঞেস করে কিছু জানা গেল না।

রাতে ডাক্তারকে কল দিলেন ফয়েজ। ডাক্তার বললেন, ‘আপনার ধারণাই ঠিক। মেয়েটাকে স্ট্রিকনিন খাওয়ানো হয়েছে। তার অবস্থা এখনও আশংকাজনক, ফিফটি ফিফটি চান্স।’

‘স্ট্রিকনিন কোথায় পেলো?’

‘নাক্স ভোমিকা গাছের ফলে স্ট্রিকনিন থাকে, বিশেষ করে বীজে। বাংলায় গাছটাকে কী যেন বলে? ও হ্যাঁ, কুঁচিলা।’

(৫)

পরদিন এসআই ফয়েজ একটি ব্যস্ত দিন পার করলেন।

প্রথমে তিনি গেলেন Bellissima-তে। দোকানের নামের নিচে লেখা রয়েছে ‘GIA Certified Diamonds’।

‘GIA-তে কী হয়?’ ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করলেন ফয়েজ।

‘Gemological Institute of America,’ বললেন ম্যানেজার। ‘ডায়মন্ডের কোয়ালিটি যাচাইয়ের জন্য এটা পৃথিবীর সেরা প্রতিষ্ঠান। আমরা শুধু ওদের সার্টিফাই করা ডায়মন্ড বিক্রি করি।’

আংটি চুরির প্রসঙ্গ তুললেন ফয়েজ। অবনির কাছ থেকে নেয়া দুটো আংটির ছবি দেখিয়ে ম্যানেজারের বক্তব্য শুনলেন। 

অবনির দেয়া সব তথ্যই নির্ভুল।

‘কম দামের আংটিটা কি আপনার দোকান থেকে কেনা?’

‘না।’

আরও দু’তিনটা দোকান ঘুরে ফয়েজ ঢুকলেন Magnifique-এ। চুরির প্রসঙ্গ না তুলে ম্যানেজারকে কম দামি আংটির ছবি দেখালেন তিনি।

‘এ রকম একটা আংটি কয়েকদিন আগে আমরা বিক্রি করেছি,’ বললেন ম্যানেজার।

দোকানের রসিদ বই খুঁজে দেখা গেল, নয় দিন আগে ষোল লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা নগদ দিয়ে আংটিটা কেনা হয়েছে। ক্রেতার নাম মিতা হক।

ভ্রু কুঁচকে একটু ভাবলেন ফয়েজ।

‘ভদ্রমহিলা দেখতে কেমন ছিলেন?’ জিজ্ঞেস করলেন তিনি। ‘আপনাদের দোকানে তো সিকিউরিটি ক্যামেরা আছে –’

‘আমরা তো সাত দিন পর পর আগের রেকর্ড ডিলিট করে ফেলি,’ বললেন ম্যানেজার।

‘আপনার মনে নেই?’

ম্যানেজার মাথা নাড়লেন। একজন কর্মচারী জানালেন, ভদ্রমহিলা হিজাব-নেকাব পরে ছিলেন।

আবার ভ্রুকুটি করলেন ফয়েজ।

(৬)

বিকেলে ডাক্তারকে ফোন করে জানা গেল, মিতার অবস্থা আগের চেয়ে একটু ভালো। তবে, দেখা করার অনুমতি পাওয়া গেল না।

ল্যাব টেস্টের রিপোর্টে দেখা গেল ফয়েজের ধারণাই ঠিক, পেস্ট্রিতে স্ট্রিকনিন মেশানো হয়েছিলো।

পরদিন সকালে তার অনুরোধে ডাক্তার পাঁচ মিনিটের জন্য মিতার সাথে কথা বলতে দিলেন।

‘গত পরশু বিকালে কে এসেছিলো আপনার কাছে?’ মিতাকে জিজ্ঞেস করলেন ফয়েজ।

‘চিনি না। দারোয়ানের কথায় ভেবেছি অবনি ভাবী। কিন্তু, দরজা খুলে দেখি– নাম বললো হালিমা।’

এটা তার আসল নাম নয়, ভাবলেন ফয়েজ। ‘বয়স কত?’ জানতে চাইলেন তিনি।

‘৪০-এর বেশি হবে।’

‘কেন এসেছিলো?’

‘বললো অবনি ভাবীর আংটিটা কিনতে চায়। আমি বললাম, যার আংটি তার কাছে যান।’

‘আংটিটা আপনার কাছে ছিলো না?’

‘আমার কাছে থাকবে কেন?’ অবাক হয়ে বললেন মিতা।

মামলার কথা মেয়েটা জানে না, ভাবলেন ফয়েজ।

‘কয়েকদিন আগে আপনি একটা ডায়মন্ড রিং কিনেছিলেন না?’ জিজ্ঞেস করলেন তিনি।

‘না তো!’

‘মিলি’স ফ্যামিলি থেকে পেস্ট্রি কে কিনেছিলো?’

‘আমি।’

‘হালিমাকে বসিয়ে রেখে কিচেনে বা বাথরুমে গিয়েছিলেন?’

‘চা বানাতে কিচেনে গিয়েছিলাম।’

‘তাকে আবার দেখলে চিনবেন?’ 

‘অবশ্যই।’

‘আপনি পেস্ট্রি খাওয়ার পর কী হলো?’

‘১৫/২০ মিনিট পর অসুস্থ হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লাম।’

‘হালিমা তখন কী করলো?’

‘খোঁজাখুঁজি করছে মনে হলো। এক পর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম। জ্ঞান ফেরার পর তাকে দেখিনি। একটু পর খিঁচুনি শুরু হলো।’

ডাক্তার এসে ফয়েজকে বললেন, ‘ব্যস’।

(৭)

অনেক প্রশ্ন একসাথে ভিড় করছে ফয়েজের মনে। ‘হালিমা’ হঠাৎ কোথা থেকে উদয় হলো? সে কীভাবে জানলো অবনির আংটি চুরি হয়েছে? আংটিটা মিতার কাছে, তা-ই বা তাকে কে বললো?

প্রথম থেকে শুরু করা যাক, ভাবলেন ফয়েজ।

গত পরশু বিকেল চারটায় ‘হালিমা’ মিতার বাসায় গেছে। ঐ সময় পর্যন্ত অবনি ছাড়া আর কে কে জানতো আংটি চুরির কথা? মিতা, ঐশী আর ওয়ালিদা প্রত্যেকে হয়তো জানতো – নিজে চুরি না করলেও অন্যকে চুরি করতে দেখেছে।  

একজন এএসআই-এর সাহায্য নিয়ে গত পরশু লাঞ্চের পর থেকে বিকেল ৪:০০টা পর্যন্ত চারজনের গতিবিধি আর ফোনালাপের তথ্য জোগাড় করলেন ফয়েজ। টুকরো টুকরো তথ্য জোড়া দিয়ে একটি নোট তৈরি করলেন –

অবনি: গেস্টদেরকে বিদায় দিয়ে বাসাতেই ছিলেন। ৩:০০টায় ওয়ালিদাকে কল দিয়ে আংটি চুরির খবরটা জানিয়েছেন, যুক্তি দিয়ে বলেছেন মিতাই সেটা নিয়েছে। ৪:০০টায় বাসা থেকে বের হয়ে Bellissima-তে গিয়েছেন। সেখান থেকে থানায় গিয়েছেন ৫:০০টায়।

মিতা: অবনির বাসা থেকে বের হয়ে মিলি’স ফ্যামিলি-তে গিয়ে পেস্ট্রি কিনেছেন। ৩:০০টার আগেই বাসায় ফিরেছেন। কারও সাথে ফোনে কথা বলেননি।

ঐশী: অবনির বাসা থেকে নিজের বাসায় চলে গেছেন, আর বের হননি। স্বামীকে আর ছোট বোনকে কল করেছেন। আংটি সংক্রান্ত কোন কথা বলেননি।

ওয়ালিদা: নিজের বাসায় ফিরে গিয়ে আর বের হননি। ২:৫০-এ তার মামী আইভিকে কল দিয়ে জানতে চেয়েছেন, অবনির আংটির দাম সত্যিই ৫০ লক্ষ টাকা কিনা, আর আইভি সেটা ৬০ লক্ষ টাকায় কিনতে চেয়েছেন কিনা। ৩:০৫-এ আইভিকে আবার কল দিয়ে বলেছেন, ‘অবনির আংটি তো মিতা চুরি করেছে। তোমার কাছে বিক্রি করলো না, নিজেও রাখতে পারলো না।’

একমাত্র সূত্র এখন আইভি। তার ফোনালাপের তথ্য সংগ্রহ করলেন ফয়েজ। জানা গেল, ৩:১০-এ ওয়ালিদা কথা শেষ করতেই শবনম নামের একজনকে কল করেছেন আইভি। ‘সাত-পাঁচ’ শপিং মলে দেখা করতে বলেছেন। 

মোবাইল ট্র্যাকার ব্যবহার করে শবনমকে খুঁজে বের করে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হলো। মোবাইলে তার ছবি দেখে মিতা জানালেন, ইনিই ‘হালিমা’।

আইভিকেও গ্রেফতার করা হলো। 

(৮)

পরদিন বেলা এগারোটায় অবনির বাসায় গেলেন ফয়েজ। টিমকে বাইরে অপেক্ষা করতে বলে ভিতরে ঢুকলেন তিনি। 

‘আংটিটা উদ্ধার করতে পারলেন?’ অবনি জিজ্ঞেস করলেন।

‘না।’

‘দুজনকে অ্যারেস্ট করেছেন শুনলাম। তাদের বাসায় সার্চ করেননি?’

‘না, জানি পাওয়া যাবে না। কারণ, মিতা আংটিটা নেননি।’

‘কেন এমন মনে হলো আপনার?’ অবনি জিজ্ঞেস করলেন।

‘মিতা যদি কম দামের আংটিটা কিনতেন, তাহলে রিসিটে তার নাম থাকতো না।’

‘তাহলে কে কিনেছে?’

‘আপনি। আর কেউ তো জানতো না ৭/৮ দিন পর মিতা আপনার বাসায় দাওয়াত পাবে। ঐশীর জুসের গ্লাসও আপনি ফেলেছেন, যাতে মিতার বিরুদ্ধে আংটি চুরির অভিযোগ বিশ্বাসযোগ্য হয়।’

‘এসব করে আমার কী লাভ?’ অবনি জিজ্ঞেস করলেন।

‘শুনেছি আপনার সাথে আদনান সাহেবের সম্পর্ক ডিভোর্স পর্যায়ে। আপনি অন্য একজনের সাথে জড়িয়েছেন, আদনান সাহেবও মিতার প্রতি দুর্বল। হতে পারে আপনি এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চেয়েছেন– মিতাকে শায়েস্তা করা আর ডায়মন্ড রিং-এর দখল নিশ্চিত করা। ডিভোর্স হলে রিংটা তো আপনার না-ও থাকতে পারে।’

‘সব তো আপনার কল্পনা,’ বললেন অবনি।

‘আপনার বাসা সার্চ করলেই বোঝা যাবে কল্পনা কিনা। আমি সার্চ ওয়ারেন্ট নিয়ে এসেছি। এই বাসায় রিংটা পাওয়া না গেলে আপনার পৈত্রিক বাড়ি, ব্যাংকের লকার – সব জায়গায় খোঁজা হবে।’

অবনি চুপ হয়ে গেলেন। একটু পরে বললেন, ‘সামান্য একটা চুরির মামলায় আপনি এত সিরিয়াস!’

‘এটা এখন attempt-to-murder কেইস। আপনি খুনের প্ররোচনা দিয়েছেন।’ 

‘এটা কী বললেন! আমি কি আইভি আন্টিকে বলেছি বিষ খাওয়াতে?’

‘আপনি জানেন লোকে তাকে বলে পয়জন আইভি। আরও জানেন, ডায়মন্ড রিংটার জন্য তিনি ডেসপারেট।’

‘তাই বলে –’

‘আপনার প্ল্যানটা ইন্টারেস্টিং। কোনও উপলক্ষ ছাড়াই মিতা আর ওয়ালিদাকে দাওয়াত দিলেন। আংটি চুরির কথা ওয়ালিদাকে বললেন, কিন্তু আপনার বান্ধবী ঐশীকে বললেন না– তিনি হয়তো হৈ চৈ বাধিয়ে আইভির কাজটা কঠিন করে ফেলতেন। আবার, ওয়ালিদাকে চুরির কথা বললেন তিনটায়, কিন্তু মামলা করতে গেলেন পাঁচটায়– যাতে আইভি যথেষ্ট সময় আর সুযোগ পায়।’  

‘আপনি তো প্রমাণ ছাড়া কথা বলে যাচ্ছেন,’ বললেন অবনি।

‘আংটিটা পাওয়া গেলেই প্রমাণ হবে আপনি চুরির গুজব ছড়িয়েছেন। পরের ঘটনার জন্যও আপনি দায়ী।’ 

অবনির মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেল।

(শেষ)

কমেন্ট করুন

প্রাক্তন শিক্ষার্থী

পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সেশনঃ ১৯৮৩ - ৮৪

জাফর আহমেদ খান

প্রাক্তন শিক্ষার্থী পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেশনঃ ১৯৮৩ - ৮৪

0