দ্য কাউন্টডাউন

খুনির সন্ধান

ইন্সপেক্টর (অব:) রায়হানের মনে প্রতিশোধের আগুন জ্বলছে। গত পরশু রাতে তার আদরের মেয়ে লতাকে ছুরি মেরে হত্যা করা হয়েছে। প্রায় আটচল্লিশ ঘণ্টা পার হয়ে গেছে, এখনও খুনির সন্ধান মেলেনি।

গত মাসে লতা তার ১৮তম জন্মদিন পালন করেছে। কক্সবাজার সরকারি কলেজে ইন্টারমিডিয়েট সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্রী ছিল সে। একই সাথে ভাল মেয়ে ও ভাল ছাত্রী হিসেবে পরিচিতি ছিল তার। এমন একটি মেয়ে কেন হঠাৎ করে বাবা-মাকে না জানিয়ে কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম শহরে এলো, কেন একটি ছেলের সাথে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে দামপাড়ার হোটেল নীলাচলে উঠলো, কেনই বা হোটেলে ওঠার ঘণ্টাখানেকের মধ্যে খুন হলো – এ সব প্রশ্নের উত্তর এখনও পাওয়া যায়নি। ব্যক্তিগত তদন্তের উদ্দেশ্যে রায়হান চট্টগ্রামে এসে দামপাড়ায় তার এক আত্মীয়ের বাসায় উঠেছেন।

মাত্র কয়েক মাস আগে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ (ডিবি) থেকে অবসর নিয়েছেন রায়হান। চট্টগ্রাম শহরের অলিগলি তার চেনা। এই শহরেই কিনা তার মেয়ে খুন হলো!

তদন্তের দায়িত্ব অফিসিয়ালি যারা পালন করছেন, তাদের মধ্যে একজন হলেন এস.আই. ফিরোজ। এক সময়ে তিনি রায়হানের অধীনস্থ ছিলেন। তার কাছ থেকে হত্যাকাণ্ড সম্পর্কিত সব তথ্য রায়হান জানতে পারছেন।

এ পর্যন্ত যা জানা গেছে, কক্সবাজারেরই একটা ছেলের সাথে গ্রীনলাইনের বাসে লতা চট্টগ্রামে এসেছে। ছেলেটার নাম জাহিদুল ইসলাম, বয়স ২১। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সে, ফিলসফিতে অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে, কবি জসীম উদ্দীন হলে থাকে। ঘটনার পর থেকে জাহিদ পলাতক। মোবাইলে দুটি সিম ব্যবহার করে সে, দুটিই বন্ধ।

ছেলেটিকে চিনতে পেরেছেন রায়হান। লতার সাথে কলেজের সামনে জাহিদকে দু একবার কথা বলতে দেখেছেন। রায়হান মোটামুটি নিশ্চিত, এই ছেলেটিই লতাকে খুন করেছে। ইংরেজিতে একটা কথা আছে, Flight is admission of guilt (পলায়ন মানে দোষ স্বীকার)। খুন না করে থাকলে জাহিদ পালাবে কেন?

এস.আই. ফিরোজ জানিয়েছেন, জাহিদ তার মোবাইলও বন্ধ রেখেছে। ছেলেটি বুদ্ধিমান সন্দেহ নেই। বোকা হলে নতুন সিম কিনে মোবাইলে ব্যবহার করতে শুরু করতো। ডিবি পুলিশ নতুন প্রযুক্তির সাহায্যে মোবাইলটা ট্র্যাক করে সহজেই জাহিদকে খুঁজে বের করে ফেলতো।

এস.আই. ফিরোজের ধারণা, জাহিদ নতুন মোবাইল বা সিম এখনও কেনেনি। বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশন ছাড়া নতুন সিম কেনা কঠিন। পেশাদার অপরাধীরা নিজেদের নাম-পরিচয় গোপন রেখে সিম জোগাড় করে ফেলে ঠিকই, কিন্তু জাহিদ পেশাদার অপরাধী নয়। তাছাড়া, ছেলেটির পরিবারের অন্য তিন সদস্য – বাবা, মা আর ছোট ভাই – কারও মোবাইলেই গত আটচল্লিশ ঘণ্টায় নতুন কোন নাম্বার থেকে কল আসেনি।

কিন্তু, রায়হান মোটামুটি নিশ্চিত, ছেলেটা নতুন মোবাইল কিনেছে, সিমও জোগাড় করেছে। পুলিশের কাছ থেকে পালিয়ে থাকতে চাইলে অনেক নগদ টাকার দরকার হবে। কারও না কারও সাথে জাহিদ যোগাযোগ করতে বাধ্য হবে। ওর ছবি আর নামধাম এখনও পেপারে দেয়া হয়নি, এক পর্যায়ে দেয়া হবে। তখন মোবাইলের সিম জোগাড় করা ওর জন্য আরও কঠিন হয়ে পড়বে – এটা না বোঝার মত বোকা জাহিদ নয়।

তাছাড়া, সিম জোগাড় করা এমন কঠিন কিছু নয়। চট্টগ্রাম শহরে যদি জাহিদের পরিচিত কেউ থাকে, বিশেষ করে বয়স্ক কেউ যিনি মোবাইল খুব বেশি ব্যবহার না করলেও একাধিক সিম রাখেন, তার কাছ থেকে একটা সিম জাহিদ ধার নিতে পারে।

কিন্তু, জাহিদের কাছে নতুন মোবাইল আর সিম থাকলে সে কেন এখনও তার ফ্যামিলিকে কল করেনি? উত্তরটা সহজ, পুলিশ নতুন নাম্বারটা পেয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে, ফ্যামিলি কেন টেনশন করছে না? বড় ছেলের মোবাইল দুদিন ধরে বন্ধ, ছেলে কোন যোগাযোগ করছে না, বাবা-মা কেন পাগল হয়ে থানায় ছুটে যাচ্ছেন না? উত্তরটা সহজ, জাহিদ তাদের সাথে যোগাযোগ করেছে। কিন্তু, কীভাবে?

আরে, তাইতো! পাশের বাসার কাউকে কল দিয়ে জাহিদ বলে থাকতে পারে, মাকে কল দিয়ে পাচ্ছি না, তাকে বলবেন আমার মোবাইলটা হারিয়ে গেছে, আরেকটা মোবাইল কিনতে সময় লাগবে, মা যেন টেনশন না করেন।

জাহিদ কাকে কল দিয়েছে, সেটা বের করা দরকার। রায়হান তার ছোট ভাইয়ের ছেলে সেলিমকে কল করে দায়িত্বটা দিলেন। সেলিম লতার সমবয়সী, লেখাপড়া বাদে আর সব কাজে পারদর্শী।

ত্রিশ মিনিটের মধ্যেই সেলিম কলব্যাক করলো। জানালো, গতকাল সকাল দশটায় (ঘটনার তেরো ঘণ্টা পর) জাহিদ পাশের বাসার আন্টিকে কল দিয়েছে। জাহিদের নতুন নাম্বারটি রায়হানকে এস.এম.এস. করে দিলো সেলিম।

এবার রায়হান কল দিলেন ডিবির এ.এস.আই. মালেককে। তাকে জাহিদের নতুন নাম্বারটি দিয়ে অনুরোধ করলেন ছেলেটির অবস্থান জানাতে। মালেককে বিস্তারিত কিছু না বলে শুধু জানালেন, এই নাম্বারটি যেই লোকের, তার কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য পাওয়া যেতে পারে। এটা খুনির নাম্বার বুঝতে পারলে ডিবির সদস্যরা রায়হানের আগেই জাহিদের কাছে পৌঁছে যাবে। তিনি প্রতিশোধ নিতে পারবেন না।

লতার হত্যাকারীকে তিনি বাঁচিয়ে রাখতে চান না।

মিনিট দশেক পরে এ.এস.আই. মালেক জানালেন, নাম্বারটি এ মুহূর্তে পার্কি বিচে।

ঘড়ি দেখলেন রায়হান। রাত সোয়া নটা। দামপাড়া থেকে পার্কি বিচ প্রায় পঁচিশ কিলোমিটার। মাইক্রোবাসে গেলে রাত দশটার আগেই পৌঁছে যাওয়া যাবে।

পরিচিত এক ড্রাইভারকে কল দিলেন রায়হান।

খুনির মুখোমুখি

রাত দশটার কয়েক মিনিট আগে পার্কি বিচ এলাকায় পৌঁছালেন রায়হান। ড্রাইভারকে অপেক্ষা করতে বলে হেঁটে এগোতে শুরু করলেন বিচের দিকে। ঝাউবনের ভিতর দিয়ে যাওয়ার সময় থেমে দাঁড়িয়ে তার ব্যক্তিগত Glock 17 পিস্তলটি পকেট থেকে বের করে চেক করলেন। হাফ-কক পজিশনে আছে এটি। পিস্তলে ম্যাগাজিন ঢোকানোর পর স্লাইড টেনে তিনি সব সময় এটাকে হাফ-কক পজিশনেই রাখেন। এতে সুবিধা হলো, তাক করেই ট্রিগার টেনে গুলি করা যায়।

পিস্তলটা পুরোপুরি লোডেড। আঠারোটি গুলি আছে এটাতে – সতেরোটি ম্যাগাজিনে, একটি চেম্বারে। লতার বয়সও ছিলো আঠারো। অদ্ভুত একটা কো-ইনসিডেন্স। জাহিদকে পেলে গুনে গুনে আঠারোটা গুলিই তিনি তার শরীরে ঢোকাবেন। লতার মা আঠারো বছর ধরে কষ্ট করে মেয়েকে বড় করেছেন, প্রতিটা বছরের জন্য একটি করে গুলি খুনির প্রাপ্য।

ঝাউবন পার হয়ে আরও খানিকটা হেঁটে রায়হান থেমে দাঁড়ালেন। ডানে বায়ে তাকিয়ে দেখলেন বিচে লোকজন নেই বললেই চলে। আশেপাশে থাকার ভাল ব্যবস্থা নেই, তাই সূর্যাস্তের পরই লোকজন চলে যেতে শুরু করে।

ডান দিকে বেশ কিছুটা দূরে একটা লোক দাঁড়িয়ে সাগরের দিকে তাকিয়ে আছে। তবে, লোকটি বয়স্ক। ওদিকে আর কাউকে চোখে পড়ছে না। ধীর পায়ে রায়হান বাম দিকে (দক্ষিণ দিকে) হাঁটতে শুরু করলেন। সামনে, ডানে আর বায়ে চোখ রাখছেন। মাঝে মাঝে থেমে পিছন দিকেও তাকাচ্ছেন।

মিনিট দশেক খোঁজাখুঁজির পর হঠাৎ করে জাহিদের দেখা পাওয়া গেল। রায়হানের কয়েক হাত সামনে একটা পাথরের উপর বসে সাগরের দিকে তাকিয়ে আছে সে। রায়হান থেমে দাঁড়ালেন। জাহিদ হঠাৎ ডানে তাকাতেই রায়হানের সাথে তার চোখাচোখি হলো। তাকে চিনতে পেরে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ালো ছেলেটা।

পকেট থেকে পিস্তলটা বের করে জাহিদের দিকে তাক করলেন রায়হান। বললেন, ‘তুমি আমার মেয়েকে খুন করেছো।’

‘আপনি ভুল করছেন, আংকেল। আমি লতাকে কেন মারতে যাবো?’

‘তাহলে পালিয়ে এসেছো কেন?’ পিস্তলের ট্রিগারে ধীরে ধীরে চাপ বাড়াতে শুরু করলেন রায়হান।

‘আমাকে ব্যাখ্যা করার সময় দিন, প্লিজ।’

গুলি করার পূর্ব মুহূর্তে রায়হানের মনে হলো, প্রতিশোধ নেয়ার আগে ছেলেটার কথা শোনা উচিত। না হলে খুনির সাথে তার কোন পার্থক্য থাকে না। বললেন, ‘তোমাকে দশ মিনিট সময় দিলাম। যদি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারো, বাঁচতে পারবে। না হলে দশ মিনিট পর তোমাকে মরতে হবে।’

‘আংকেল -’

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে রায়হান দশ থেকে কাউন্টডাউন শুরু করলেন।

‘দশ।’

জাহিদ অনেক সাহসী ছেলে। কিন্তু, এই মুহূর্তে একটু ভয় লাগছে ওর। লতার বাবার চোখে ও খুনের নেশা দেখতে পাচ্ছে। দশ মিনিটে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করা প্রায় অসম্ভব। ও যা-ই বলুক, সন্তানহারা বাবার কাছে তা গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে।

ভয়ের আরেকটা কারণ হলো, ভদ্রলোক যেভাবে পিস্তলের ট্রিগারে তর্জনী দিয়ে রেখেছেন, যে কোন মুহূর্তে গুলি বের হয়ে যেতে পারে। তাছাড়া, বেফাঁস কিছু বললে তিনি রেগে গিয়ে সাথে সাথে গুলি করতে পারেন।

একটু সাহস সঞ্চয় করে জাহিদ বললো, ‘আংকেল, পিস্তলটা আমার দিক থেকে একটু সরিয়ে রাখলে হয় না?’ রায়হান রেগে যাচ্ছেন দেখে চটপট যোগ করলো, ‘আপনি তো আমার কাছ থেকে কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি নিশ্চয়ই পিস্তলটা কেড়ে নিতে পারবো না।’

রায়হান পিস্তলটা নামিয়ে ফেললেন।

‘আংকেল, আপনি আগেই ধরে নিয়েছেন আমি খুনি। এটা কি ঠিক হচ্ছে?’ একটু থেমে জাহিদ যোগ করলো, ‘জাস্টিস সিস্টেমের মূলনীতি হলো presumption of innocence – আমি দোষী প্রমাণিত হওয়ার আগ পর্যন্ত আমাকে নির্দোষ ধরে নিতে হবে। আপনি যদি আমাকে মৃত্যুদন্ড দিতে চান, আপনাকেই প্রমাণ করতে হবে আমি খুনি।’

‘আমার মেয়ে খুন হয়েছে। আমি এখন presumption of guilt নীতিতে বিশ্বাসী। ফিলসফি কপচালে তোমার জীবন বাঁচবে না।’

‘আসল খুনি কে তা বের করতে না পারলে আমি নির্দোষ এটা প্রমাণ করা কঠিন। দশ মিনিটে তো এটা সম্ভব নয়।’

কথাগুলো বলে জাহিদ বুঝতে পারলো কোন কাজ হচ্ছে না। রায়হান ঘড়ির দিকে তাকালেন।

‘নয়।’

‘আংকেল, লতা আপনাকে বলেছে কিনা জানি না – কিরণ নামের একটা ছেলে ওকে ডিসটার্ব করতো।’

‘কিছুদিন আগে লতা আমাকে এটা বলেছিলো। কিন্তু, অনেক খুঁজেও আমি কিরণ নামের কোন ছেলের সন্ধান পাইনি।’

‘সন্ধান পাননি মানে তো এই নয় যে, কিরণ নামের কোন ছেলের অস্তিত্ব নেই। আপনার মেয়ে নিশ্চয়ই আপনাকে মিথ্যা বলেনি?’

‘এতদিন তো তাই মনে করতাম। ভাবতাম, আমার মেয়ের মত ভাল মেয়ে হয় না। এখন তো মনে হচ্ছে লতা মিথ্যা বলেও থাকতে পারে।’

‘কিন্তু, মিথ্যা বলার তো একটা উদ্দেশ্য থাকে। বিনা কারণে নিশ্চয়ই কেউ মিথ্যা বলবে না। আমি যদিও কিরণকে চিনি না, কিন্তু তার কাছ থেকে বাঁচার জন্যই লতা আমার সাথে এলাকা ছেড়েছে।’

‘ফালতু কথা বলো না। তুমি তো ভাল করেই জানো আমাদের ফ্যামিলি এলাকায় সবচেয়ে প্রভাবশালী। কোথাকার কোন্ কিরণের ভয়ে আমার মেয়ে এলাকা ছেড়ে পালাবে?’

এই প্রশ্নের কোন উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না জাহিদ। লতাদের ফ্যামিলি আসলেই এলাকায় সবচেয়ে প্রভাবশালী। যুক্তি খুঁজে না পেয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলো সে, ‘আপনিই তাহলে বলুন, লতা কেন হঠাৎ করে আমার সাথে ঢাকা যেতে চাইলো?’

‘ঢাকা যেতে চেয়েছে, তার তো কোন প্রমাণ নেই। শুধু জানি – ’

‘এই যে দেখুন,’ বলে গ্রীনলাইনের একটি টিকেট এগিয়ে দিলো জাহিদ। ডান হাতের পিস্তল জাহিদের দিকে তাক করে বাম হাতে টিকেটটা নিলেন রায়হান। দুজন যাত্রীর চট্টগ্রাম-ঢাকা টিকেট, সময়টা ছিলো গতকাল সকাল ৮.০০টা, হত্যাকাণ্ডের এগারো ঘণ্টা পর। টিকেটটা কাটা হয়েছে রাত আটটা পঞ্চাশে, খুনের দশ মিনিট আগে।

‘আট।’

‘দেখলেন তো, আংকেল?’

‘টিকেটটা তোমার কথার প্রমাণ নয়,’ বললেন রায়হান। ‘তুমি হয়তো খুন করার পর অন্য কারও সাথে ঢাকা যাবার প্ল্যান করেছিলে। লতা তোমার সাথে ঢাকা যেতে চাইলে তুমি কক্সবাজার-ঢাকা টিকেট কাটোনি কেন?’

‘লতার কলেজ ছুটি হয়েছে ১:৫০এ। ঐ সময়ে কক্সবাজার-ঢাকা কোন বাস ছিল না।’

‘দুপুরেই কেন কক্সবাজার ছাড়তে হলো? সকালে বা রাতে তো কক্সবাজার-ঢাকা সরাসরি বাস থাকে। সেরকম বাসে না উঠে তোমরা চট্টগ্রামে কেন এসেছো?’

‘লতা বলেছিল, কলেজে ঢোকার আগ পর্যন্ত কিরণ ওর গতিবিধি খেয়াল করতো – ’

‘আবার কিরণের গল্প!’ ধমকের সুরে বললেন রায়হান।

‘আপনার কাছে গল্প মনে হতে পারে,’ মরিয়া হয়ে বললো জাহিদ। ‘কিন্তু, আমি লতার কথা বিশ্বাস করেছি।’

‘তো, কলেজ থেকে বের হবার পর কিরণ লতার গতিবিধি খেয়াল করতো না?’ বিরক্তির সাথে বললেন রায়হান। ‘চট্টগ্রামের বাসে চড়লো কী করে লতা?’

‘কলেজ ইউনিফর্মের সাদা ওড়না এমনিতে ও মাথায় দিতো না। সেদিন কলেজ থেকে বের হওয়ার সময় মাথায় হিজাবের মত করে ওড়নাটা পরেছিল লতা। এক বান্ধবীর সাথে স্যান্ডেল জোড়াও পাল্টে নিয়েছিল। ওর ব্যাকপ্যাক দেখে ওকে চিনে ফেলতে পারে, তাই সেটা ওর বান্ধবীকে রাখতে বলেছে। সব সময় যেই গেট দিয়ে বের হয়, সেখান দিয়ে বের না হয়ে অন্য গেট দিয়ে বের হয়েছে।’

‘লতাকে কখনও বলোনি কিরণকে চিনিয়ে দিতে?’

‘বলেছি। কিন্তু, ও রাজি হয়নি। বলেছে, অনর্থক ঝামেলায় জড়াতে হবে না।’

‘তোমাকে তো আমি লতার সাথে কলেজের সামনে কথা বলতে দেখেছি। লতা তখন কেন কিরণকে ভয় পায়নি?’

‘আপনি আমাকে সর্বশেষ দেখেছেন কমপক্ষে ছয় মাস আগে। তখনও কিরণ ঝামেলা শুরু করেনি। ঝামেলা শুরু হওয়ার পর লতা আমাকে বলে দিয়েছে ওর সাথে সরাসরি দেখা না করতে।’

‘সাত।’

‘আংকেল, আপনি নিশ্চয়ই এখন -’

‘লতাকে নিয়ে ঢাকা যাওয়ার ইচ্ছে থাকলে তোমরা চট্টগ্রামে এসেই ঢাকার কোচ ধরোনি কেন? কেন সামাজিক রীতি-নীতির কথা চিন্তা না করে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে হোটেলে উঠেছো? এটা কোন্ ধরণের ফিলসফি?’ ইচ্ছে করেই জাহিদের সাবজেক্টের নামটি বললেন রায়হান, ছেলেটাকে রাগিয়ে দিয়ে ওর মুখ থেকে সত্য কথাটি বের করতে চান।

জাহিদ সত্যিই রেগে গেলো। বললো, ‘ফিলসফি পড়ে যা যা শিখেছি, তার মধ্যে একটা টপিক হলো অক্‌হামের ক্ষুর (Ockham’s Razor)। একটি ঘটনা যদি একাধিকভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়, তাহলে সবচেয়ে সহজ ব্যাখ্যাটি গ্রহণ করা ভাল। অর্থাৎ, জটিল শর্ত বা অনুমান ছেঁটে ফেলা ভাল। রাস্তায় খুরের শব্দ শুনলে ধরে নেয়া উচিত ঘোড়া দৌড়ে যাচ্ছে। এটা ধরে নেয়া ঠিক নয়, চিড়িয়াখানা থেকে একটা জেব্রা বের হয়ে রাস্তা দিয়ে দৌড়ে যাচ্ছে।’

‘কী বোঝাতে চাচ্ছো?’ রায়হান একটু ধাঁধাঁয় পড়ে গেছেন।

‘লতা আর আমি স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে হোটেলে উঠেছি – এই ঘটনাটা একাধিকভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। সবচেয়ে সহজ ব্যাখ্যাটি হলো, আমরা বিয়ে করেছি।’

রায়হান ফাঁকা দৃষ্টিতে জাহিদের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর সম্বিত ফিরে পেয়ে ঘড়ি দেখলেন।

‘ছয়।’

‘হ্যাঁ, আংকেল। গত পরশু চট্টগ্রামে এসেই আমরা বিয়ে করেছি।’

রায়হান মনে-প্রাণে কথাটা বিশ্বাস করতে চান। কিন্তু, এরা দুজন হোটেলের যে রুমে উঠেছিলো, সেখানে ডিবির লোকেরা তন্ন তন্ন করে খুঁজেছে, কোন বিয়ের কাগজ পায়নি। প্রাক্তন সহকর্মীদের কাছে রায়হানের মাথা হেঁট হয়ে গেছে। তার অনুরোধে ডিবির লোকেরা ব্যাপারটা গোপন রেখেছে। হোটেলের কর্মচারীদেরকেও বিষয়টি গোপন রাখতে বলা হয়েছে, অন্যথায় তাদেরকে ফাঁসিয়ে দেয়ার হুমকি দেয়া হয়েছে। আজকের পত্রিকায় খুনের খবরটা ছাপা হলেও হোটেলের প্রসঙ্গ আসেনি, শুধু বলা হয়েছে দামপাড়া এলাকায় লতা নামের এক অষ্টাদশী মেয়ে খুন হয়েছে। লতা সত্যিই বিয়ে করে থাকলে রায়হানের মুখরক্ষা হয়।

‘কাবিননামাটা কোথায়?’ জানতে চাইলেন রায়হান।

‘কাবিননামাটা আমার ব্যাগের পকেটে ছিল। হোটেলে ওঠার কিছুক্ষণ পর আমি ঢাকার টিকেট কাটতে বের হলাম। ফিরে এসে দেখি লতার লাশ পড়ে আছে। ব্যাগের পকেট চেক করে দেখি কাবিননামাটা নেই।’

‘ব্যাক টু স্কয়ার ওয়ান,’ ক্ষোভের সাথে বললেন রায়হান। ‘বিয়ের কোন প্রমাণ নেই।’

‘এ কথা কেন বলছেন? কাজী অফিসে গেলেই তো প্রমাণ হয়ে যাবে বিয়ে করেছি কিনা।’

‘কোন্ কাজী অফিসে বিয়ে করেছো?’

‘দামপাড়ায় গ্রীনলাইনের স্টপেজে বাস থেকে নেমে লোকজনকে জিজ্ঞাসা করে রিক্সায় গেছি, বাস-স্ট্যান্ড থেকে পুব দিকে। রোডের নামটা মনে করতে পারছি না -’

বিরক্তির সাথে ঘড়ির দিকে তাকালেন রায়হান।

‘পাঁচ।’

‘মনে পড়েছে, আংকেল। সাইফুদ্দিন রোড।’

ঐ রোডে সত্যিই একটা কাজী অফিস আছে, কিন্তু জাহিদ সেটা এমনিতেও জানতে পারে।

‘কাজী সাহেবের নাম্বারটা দাও।’

‘নাম্বার তো আমার কাছে নেই।’

‘বিয়ে করে থাকলে কাজী সাহেব নিশ্চয়ই একটা বিজনেস কার্ড দিয়েছেন ভবিষ্যতে যোগাযোগ করার জন্য?’

‘কার্ডটা তিনি দিয়েছিলেন লতার হাতে। ও সেটা ওর পার্সে রেখেছিলো।’

‘ডিবির লোকেরা লতার পার্সে বা অন্য কোথাও কাজীর কোন কার্ড পায়নি।’

‘হয়তো তারা খেয়াল করেননি। বিজনেস কার্ড তো খুব ছোট একটা জিনিস।’

‘ডিবির লোকদের সম্পর্কে তোমার কোন আইডিয়া নেই।’

‘তাহলে কাবিননামার সাথে কাজীর বিজনেস কার্ডও কেউ নিয়ে গেছে,’ বললো জাহিদ।

‘এসব চুরি করে কার কী লাভ?’ জানতে চাইলেন রায়হান।

‘হয়তো খুনি নিজেই এ কাজ করেছে। সমাজের কাছে লতা আর আমাকে খাটো করতে চায়।’

‘একটা কথার জবাব দাও। তোমার কথা যদি সত্যি হয়ে থাকে, তুমি হোটেলে ফিরে দেখতে পেয়েছো লতা খুন হয়েছে। তখন তোমার প্রথম চিন্তা হলো কাবিননামাটা খুঁজি?’

‘আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে আমি হাস্যকর একটা কাজ করেছি। হোটেল রুমে ঢুকে দেখলাম, লতা নিথর পড়ে আছে। নাড়ি চেক করে বুঝলাম মারা গেছে। ভাবলাম, খুন যেহেতু হয়েছে, পুলিশ আসবে। এক পর্যায়ে পুলিশ বিয়ের কাগজ দেখতে চাইবে, কারণ আমাদের দুজনেরই বয়স কম। দেখলাম, আমার ব্যাগ থেকে কাবিননামা উধাও। লতার স্যুটকেসেও সেটা নেই। মনে হলো, লতাকে যে খুন করেছে, সে আমাকে ফাঁসাতে চাচ্ছে। পুলিশকে দিয়ে সে আমাকে ক্রসফায়ার করাতে পারে। তাই পালানোর সিদ্ধান্ত নিলাম।’

‘চার।’

‘আংকেল -’

‘আমি তো লতাকে বলেছিলাম, ও যাকেই বিয়ে করতে চায় করবে, আমি না করবো না। তুমি একটা ভাল ফ্যামিলির ছেলে, ঢাকা ভার্সিটিতে পড়ো। লতা তোমাকে বিয়ে করতে চাইলে আমি তো না করতাম না। ওর তো লুকিয়ে বিয়ে করার কথা না।’

‘আপনি কিরণকে হিসেব থেকে বাদ দিচ্ছেন। তাই হিসেব মিলছে না।’

‘তার মানে?’

‘কিরণের অস্তিত্ব যদি মেনে নেয়া হয়, তাহলে লতার সব আচরণের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। আপনারা প্রভাবশালী হতে পারেন, কিন্তু কিরণ একজন খুনি। আপনারা লতার বিয়ে দিতে চাইলে কিরণ ঝামেলা করতো। তাই লতা আমাকে রাজি করেছে ওকে ঢাকা নিয়ে যেতে। চট্টগ্রামে এসে আমরা বিয়ে করেছি। তারপর লতার জন্য একটা স্যুটকেস আর কিছু কাপড়চোপড় কিনে হোটেলে উঠেছি। আপনাদেরকে ও বলেছে রাতে বান্ধবীর বাসায় থাকবে। ঢাকায় গিয়ে ও আপনাদেরকে সবকিছু বুঝিয়ে বলতো।’

‘তুমি হোটেল থেকে যখন ঢাকার টিকেট কাটতে গেছো, রুমের দরজা লক করে বের হওনি?’

‘অবশ্যই। লতাকে বলে গেছি আমি ছাড়া আর কেউ এলে দরজা না খুলতে।’

‘তাহলে খুনি কীভাবে রুমে ঢুকলো?’

‘হয়তো লতা অসাবধান হয়ে নক শুনেই দরজা খুলে দিয়েছে।’

‘লতা তো এত বোকা বা অসাবধান ছিল না,’ বললেন রায়হান।

চুপ করে রইলো জাহিদ। তারপর বললো, ‘হয়তো খুনি বিশেষ ধরনের চাবি ব্যবহার করেছে। একটা মুভিতে দেখেছি -’

‘বাম্প কি (bump key)?’

‘হ্যাঁ, বাম্প কি। হোটেলের সিসিটিভিতে সন্দেহজনক কিছু দেখা যায়নি?’

‘মেইনটেন্যান্সের জন্য সিসিটিভি কিছুক্ষণ বন্ধ ছিলো।’

‘নিশ্চয়ই এটা কিরণের চাল,’ বললো জাহিদ।

‘তিন।’

‘আংকেল, আমি নিশ্চয়ই সিসিটিভি বন্ধ করার মত ক্ষমতাশালী না?’

‘সিসিটিভি বন্ধ থাকাটা কো-ইনসিডেন্স হতে পারে,’ বললেন রায়হান।

‘আমাদের কি এখন উচিত নয় কিরণের খোঁজ করা?’

‘কিরণ চরিত্রটা পুরোপুরি তোমার আবিষ্কার হতে পারে। এমনকি লতাকেও হয়তো তুমি বুঝিয়েছো, কিরণ নামের একজন গুন্ডা ওর পিছনে লেগেছে, ও যেন ওর ফ্যামিলিকে একটু বলে রাখে। এক পর্যায়ে কিরণের হাত থেকে বাঁচাতে ওকে নিয়ে চট্টগ্রাম এসেছো। সবাইকে বোকা বানানোর জন্য এটা তোমার চাল হতে পারে। ইংরেজিতে যাকে red herring বলে, কিরণ হয়তো তাই। সবাই কিরণের পিছনে ছুটবে, তুমি বেঁচে যাবে।’

‘আমি কেন হঠাৎ করে লতাকে খুন করতে যাবো?’

‘হয়তো বিয়ে না করে তুমি ওর সাথে সম্পর্ক করতে চেয়েছো, ও রাজি হয়নি। তাই ক্ষেপে গিয়ে ওকে খুন করেছো।’

‘যদি প্রমাণ পাওয়া যায় আমরা বিয়ে করেছি? আপনার মোবাইলে Google সার্চ করে কাজীর নাম্বার বের করুন। তাকে কল দিয়ে যাচাই করুন।’

‘বিয়ে যদি করেও থাকো, তার মানে এই নয় খুন করোনি। খুনের কারণ জেনেও লাভ নেই। তুচ্ছ কারণে রাগের মাথায় মানুষ মানুষকে মেরে ফেলে। একমাত্র তোমারই সুযোগ ছিল লতাকে খুন করার।’

আর কোন উপায় নেই, ভাবলো জাহিদ। একটু পরে এই লোকটির হাতে ওর মৃত্যু হবে। লতাকে খুন করার দায় মাথায় নিয়ে ওকে মরতে হচ্ছে। অথচ নিজের জীবনের চেয়ে লতাকে বেশি ভালোবেসেছে ও। অনার্স সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্র স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে বিয়ের চিন্তা করে না। কিন্তু, লতা যখন ওর হাত ধরে অনুনয় করে বললো, আমি বড় বিপদে আছি, আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাও – তখন কোন দ্বিধা করেনি জাহিদ। মায়ের কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়ে লতার হাত ধরে কঠিন এক জীবনের পথে ও পা বাড়িয়েছে।

‘দুই।’

আসন্ন মৃত্যুটা মেনে নেয়ায় জাহিদের মনের অস্থিরতা দূর হয়ে গেছে। ওর যুক্তি পরিষ্কার হতে শুরু করেছে। ওর মনে হচ্ছে, কিছু সহজ ব্যাপার ও অনর্থক জটিল করেছে। লতার বাবাকে Ockham’s Razor নিয়ে জ্ঞান দিলেও ও নিজে এই নীতি ঠিক মত প্রয়োগ করতে পারেনি। এই নীতিকে কেউ কেউ বলে KISS নীতি (Keep It Simple, Stupid) ।

জাহিদ নতুন করে ভাবতে শুরু করলো। লতা বলেছে, কিরণ ওর পিছনে লেগেছে। ভাল একটি মেয়ে হঠাৎ করে মিথ্যা বলেছে? না। সিদ্ধান্ত: কিরণ সত্যিই লতার পিছনে লেগেছিল।

কিরণ নামের কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। লতার বাবাও পাননি, জাহিদও পায়নি। এদিকে লতাও মিথ্যা বলেনি। সিদ্ধান্ত: লতা শয়তানটার আসল নাম বলেনি। কেন বলেনি? লতা চায়নি ওর বাবা অথবা জাহিদ ঝামেলায় জড়াক।

লতাদের ফ্যামিলির সাথে কেউ লাগতে যায় না। ওর বাবা ছিলেন ডিবির ইন্সপেক্টর। ওর বড় চাচা আরমান দোকান মালিক সমিতির সভাপতি। বড় চাচার ছেলে সিরাজ যুব রাজনীতি করে। ছোট চাচার ছেলে সেলিম ছাত্র রাজনীতি করে। লতাকে ফ্যামিলির বাইরের কেউ ডিসটার্ব করেছে – এটা চিন্তা করা যায় না। সিদ্ধান্ত: কিরণ লতাদের ফ্যামিলিরই কারও ছদ্মনাম।

লতাদের ফ্যামিলির মধ্যে কে ওর বাবার চেয়ে ক্ষমতাধর? বিশেষ করে ওর বাবা রিটায়ার করার পরে? আরে তাই তো, মিলে যাচ্ছে, কিরণের ঝামেলা শুরু হয়েছে ওর বাবা রিটায়ার করার পর থেকে। লতার একমাত্র ভাই শুভ ক্যানাডায় মাস্টার্স করছে। লতা এক হিসেবে একা। ওর কোন চাচাতো ভাই ওর পিছে লেগেছিলো? সবাইকে তো জাহিদ চিনে না।

‘এক।’

‘আংকেল, আপনাদের ফ্যামিলিতে সবচেয়ে প্রভাবশালী কে?’

‘নিঃসন্দেহে আমি।’

‘আপনি তো রিটায়ার করেছেন। এখন কে?’

‘রিটায়ার করেছি তো কী হয়েছে? আমার হাতে একটা Glock 17 দেখতে পাচ্ছো না?’

‘লতা কি এই পিস্তলের কথা জানতো?’

‘না।’

‘তাহলে লতার চোখে সবচেয়ে প্রভাবশালী কে ছিলো?’

একটু চিন্তা করে রায়হান বললেন, ‘আমার বড় ভাই আরমান।’

লতা জাহিদকে বলেছিল, কিরণ ওকে বিয়ে করতে চায়। আপন বড় চাচা নিশ্চয়ই বিয়ে করতে চায়নি। এই চাচারই ছেলে সিরাজের বয়স পঁচিশ, অবিবাহিত। রাজনীতি করে বলে নিজেও বেশ ক্ষমতাধর। রগচটা স্বভাবের। কিরণের সাথে তার প্রোফাইল মিলে যায়।

‘আংকেল, সিরাজ ভাই লতার পিছনে লেগেছিল।’

‘তুমি বলতে চাও সিরাজ লতাকে খুন করেছে?’

‘হ্যাঁ। তিনি নিজে লতাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন। লতা আমাকে বিয়ে করায় তিনি প্রতিশোধ নিয়েছেন।’

‘ও তো আমার সাথে খুনের পরদিন, মানে গতকাল সকালে চট্টগ্রামে এলো, লাশ নিয়ে দুপুরবেলা দুজনে কক্সবাজারে ফিরে গেলাম। আজ সকালে আবার আমার সাথে ওকে নিয়ে এসেছি আমাকে হেল্প করতে পারবে বলে।’

‘গত পরশু সিরাজ ভাই কখন কী করেছেন তা জানা দরকার। লতা খুন হয়েছে রাত ন’টায়। খুন করার পর সিরাজ ভাই হয়তো রাতেই কক্সবাজারে ফিরে গেছেন। গতকাল সকালে আপনার সাথে আবার এসেছেন।’

‘সিরাজ কি তোমার নতুন রেড হেরিং?’

‘আপনি কি লতার খুনিকে মারতে চান, না আমাকে মারতে চান?’

কিছু বললেন না রায়হান। ঘড়ির দিকে তাকালেন। বললেন, ‘সময় শেষ।’ তারপর জাহিদের দিকে পিস্তলটা তাক করলেন।

বিদ্যুৎ চমকের মতো ব্যাপারটা জাহিদের মাথায় এলো। বললো, ‘সিরাজ একটা আরবী শব্দ। এর বাংলা অর্থ আলো বা কিরণ।’

শেষের কথা

চিন্তিত মুখে রায়হান পিস্তলটা নামিয়ে রাখলেন।

ঘাম দিয়ে যেন জ্বর সারলো জাহিদের। বেঁচে থাকা বড়ই আনন্দের।

ঘড়ি দেখলেন রায়হান। দশটা বিশ। সিরাজকে কল দিলেন তিনি। বললেন, ‘আমি জাহিদের খোঁজ পেয়েছি। তোকে দরকার। একটা মাইক্রো নিয়ে এখনই পার্কি বিচে চলে আয়।’

কয়েক সেকেন্ড পরেই কী মনে হতে তিনি এস.আই. ফিরোজকে সিরাজের নাম্বারটা এস.এম.এস. করলেন। তারপর ফিরোজকে কল করে বললেন, ‘লতার খুনি সম্ভবত আমার ভাইয়ের ছেলে সিরাজ। তার নাম্বারটা আপনাকে এস.এম.এস. করেছি। ওকে আমার কাছে আসতে বলেছি, কিন্তু আমার মনে হয় ও এখানে না এসে পালানোর চেষ্টা করবে। মোবাইল ট্র্যাক করে ওকে অ্যারেস্ট করুন। গত পরশু ও কখন চট্টগ্রামে এসেছে, কখন ফিরে গেছে, হোটেল নীলাচলের সিসিটিভি কীভাবে বন্ধ করার ব্যবস্থা করেছে – এসব খোঁজ নিন। লতা আর জাহিদের বিয়ের কাবিননামা আর কাজীর বিজনেস কার্ড সিরাজ কী করেছে, তাও বের করুন। ওর কাছে একটা বাম্প কি-ও পাওয়া যেতে পারে। যদি ও খুনি হয়ে থাকে, ওকে ভালমত শায়েস্তা করা দরকার, ফিরোজ। আপনাদেরও ছেলেমেয়ে আছে, আর আপনাদেরকেও এক সময়ে রিটায়ার করতে হবে।’

‘আমি সাধ্যমত সব করবো, স্যার।’ এস.আই. ফিরোজের কণ্ঠে আশ্বাস।

জাহিদের দিকে তাকিয়ে রায়হান বললেন, আমরা এখানেই অপেক্ষা করবো।

প্রায় ঘণ্টাখানেক পর এস.আই. ফিরোজ কলব্যাক করলেন। বললেন, ‘স্যার, আপনি ঠিকই ধরেছেন, সিরাজই খুনটা করেছে। ওর এক চ্যালা লতাকে ২:৩০টার বাসে উঠতে দেখেছে। তাই ও ৩:৩০টার বাসে চট্টগ্রামে এসেছে। একজনকে ফোন করে দিয়েছে, সেই লোক লতা আর জাহিদকে চট্টগ্রামে ফলো করেছে। রাজনীতির সুবাদে হোটেল নীলাচলের সহকারী ম্যানেজারের সাথে ওর যোগাযোগ। সেই লোকটাকেও অ্যারেস্ট করা হয়েছে।’

‘এত কিছু এত অল্প সময়ে করে ফেললেন!’

‘ক্রসফায়ারে সিরাজের ডান হাত আর ডান পায়ে বেশ কয়েকটা গুলি লেগেছে তো, তাই চটপট সব কিছু স্বীকার করেছে।’

‘ভেরি গুড।’

‘সহকারী ম্যানেজারের সাথে ওর খাতির ছিল, তাই বাম্প কি লাগেনি। কাজীর বিজনেস কার্ডটা সিরাজের কাছে রয়ে গিয়েছিল, তবে কাবিননামাটা ও ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছে।’

‘তাহলে -’

‘কাজী সাহেবের সাথে আমি কথা বলেছি। লতা আর জাহিদ গত পরশু সন্ধ্যা সাতটায় তার অফিসে বিয়ে করেছিলো। স্যার, এখন রাখি।’

‘ফিরোজ, থ্যাংক ইউ।’

‘ইউ আর অলওয়েজ ওয়েলকাম, স্যার।’

ফোনে কথা শেষ করে জাহিদের দিকে তাকালেন রায়হান। একটু আগে এই ছেলেটিকে তিনি মেরে ফেলতে চেয়েছেন। অথচ, লতা ভালবেসে ছেলেটাকে বিয়ে করেছিল। গত দুদিন সীমাহীন যন্ত্রনা সহ্য করতে হয়েছে ছেলেটাকে।

হাত জোড় করে জাহিদের কাছে ক্ষমা চাইলেন রায়হান, মুখে কিছু বললেন না। তার চোখে জল।

জাহিদও তার চোখের জল আটকাতে পারলো না। লতা ওর হাত ধরে বাঁচতে চেয়েছিল। কিন্তু, এত কিছু করেও ও মেয়েটাকে বাঁচাতে পারেনি।

(শেষ)

কমেন্ট করুন

প্রাক্তন শিক্ষার্থী

পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সেশনঃ ১৯৮৩ - ৮৪

জাফর আহমেদ খান

প্রাক্তন শিক্ষার্থী পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেশনঃ ১৯৮৩ - ৮৪

0