দ্য পারফেক্ট মার্ডার

(১)

খোলা জানালার পাশে বসে গুন গুন করে গান গাইছে মালিহা। ওর মনে আনন্দের সীমা নেই। একটু আগে অফিসে যাবার সময় সোহেল জানিয়েছে, সংসারে নতুন মুখ আনতে ও এখন তৈরি। মালিহার পুরো দু’সপ্তাহ লেগেছে ওকে রাজি করতে।

সাতাশ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছে মালিহার, এখন বয়স উনত্রিশ। বাসার কাছেই একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে গণিতের টিচার সে। তবে, আজ স্কুল বন্ধ। সারাদিন ও ঘর গোছাবে আর সোহেলের পছন্দের খাবার তৈরি করবে।

মালিহার চেয়ে বছর পাঁচেক বড় সোহেল। তবে, বয়সের পার্থক্য বিবেচনায় না নিলে সে একজন নিখুঁত স্বামী। সুদর্শন, সুবিবেচক। অ্যাকাউন্টিং-এ মাস্টার্স করে ধীরে ধীরে নিজের ব্যবসা দাঁড় করিয়েছে। বিদেশ থেকে মেডিক্যাল যন্ত্রপাতি আমদানি করে পাইকারি বিক্রি করে সে।

অবশ্য, গত এক বছর ধরে একজন পরিচিত বড় ভাইয়ের অনুরোধে তার বিজনেস ফার্মে কাজ করছে সোহেল, ভাইয়ের ব্যবসাটা দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। সোহেলের নিজের ব্যবসা দেখাশুনা করছে ওর বন্ধু মারুফ।

মারুফকে মালিহা পছন্দ করে না। ও লক্ষ্য করেছে, সুন্দরী মেয়েদেরকে পাশ থেকে বা পেছন থেকে বাজেভাবে দেখে লোকটা। মালিহা বুঝতে পারে ওকেও লোকটা এভাবে দেখে – কারণ, ওর চেহারা যেমন মিষ্টি, ওর শরীরের গড়নও তেমন আকর্ষণীয়। অনেক মেয়ে পুরুষের এভাবে দেখাটা এনজয় করে। মালিহা মোটেই তেমন নয়। কিছু মেয়ে তো পুরুষের মনোযোগ টের পেলে কোমর দুলিয়ে বা অন্যভাবে পুরুষের মাথা ঘুরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। মালিহার মতে, এসব মেয়েরা অ্যাডাম টিজার। ইভ টিজিং যেমন দোষের, অ্যাডাম টিজিংও নিশ্চয়ই দোষের।

তবে, মারুফের তাকানোটা মালিহার কাছে বিরক্তিকর হলেও লোকটাকে অপছন্দ করার প্রধান কারণ এটা নয়।

বায়োকেমিস্ট্রিতে অনার্স পড়তো মারুফ, তবে থার্ড ইয়ার শেষ করতে পারেনি। এটাও দোষের কিছু নয়। মালিহা আর সোহেলের আরও বন্ধু আছে যারা কলেজ বা ভার্সিটির ড্রপআউট, কিন্তু মানুষ হিসেবে অনেক ভাল।

মারুফকে অপছন্দ করার সুনির্দিষ্ট কারণ মালিহা খুঁজে পায়নি, তবুও সতর্ক থাকে ও।

কলিং বেলের শব্দে মালিহার চিন্তায় ছেদ পড়লো। উঠে গিয়ে দরজার স্পাই-হোলে চোখ রাখতেই ও একই সাথে অবাক আর বিরক্ত হলো। মারুফ ভাই! তার তো ভাল করেই জানা থাকার কথা সোহেল বাসায় নেই। এখন আসার মানেই হচ্ছে মালিহার সাথে একা কথা বলতে চায় লোকটা।

বাসায় ছুটা বুয়া বাথরুমে কাপড় কাচছে। কোন ধরণের বিপদের আশংকা নেই। মালিহা দরজা খুলে বললো, ‘স্লামালেকুম, মারুফ ভাই। সোহেল তো বের হয়ে গেল একটু আগে।’

‘আমি আসলে আপনার সাথেই কথা বলতে এসেছি।’

‘আসুন।’ মারুফকে সোফায় বাসিয়ে মালিহা মুখোমুখি বসলো। জানতে চাইলো, ‘চা খাবেন?’

‘না, ভাবী। বেশিক্ষণ বসবো না। আপনার হেল্প দরকার। একটা মেয়ের সাথে বিয়ের কথাবার্তা হচ্ছে -’

‘তাই নাকি? মেয়েটার ছবি আছে?’

মোবাইলে ছবির ফোল্ডার বের করে মালিহার দিকে এগিয়ে দিলো মারুফ। বললো, ‘ওর নাম লিসা।’

মারুফের হাত থেকে মোবাইলটা নেয়ার সময় মালিহা সতর্ক থাকলো যেন হাতে হাত লেগে না যায়। ফোল্ডারে লিসার বেশ কয়েকটি ছবি আছে। ছবিগুলো দেখে মোবাইলটা মারুফের সামনে টি-টেবিলে রাখতে রাখতে মালিহা বললো, ‘মেয়েটা তো দেখতে ভাল। বিয়েটা কবে হচ্ছে?’

‘সে জন্যেই আপনার কাছে আসা। বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে আমি চাই আপনি আর সোহেল মেয়েটার সাথে কথা বলুন। আপনি মানুষ ভাল চিনেন, তাই আপনার উপস্থিতি আমি এনশিওর করতে চাই। আপনি কি আগামীকাল বিকেলে সময় দিতে পারবেন?’

‘সোহেল তো আমাকে কিছু বললো না -’

‘আপনি ফ্রি থাকলে আমি সোহেলকে বলবো। আমি জানি ও বিকেলে ফ্রি থাকে। তারপরও ওর সাথে আলাপ করেই সময়টা ঠিক করবো।’

‘ঠিক আছে, আমার সমস্যা নেই। ওর সাথে কথা বলুন।’

‘থ্যাংক ইউ, ভাবী।’ ঘড়ির দিকে তাকালো মারুফ। তারপর একটু বিব্রত ভঙ্গিতে বললো, ‘ভাবী, যদি কিছু মনে না করেন – আপনাদের বাসায় ঢোকার সময় দেখি আমার মোবাইলে টাকা নেই। লিসাকে এখনই একটা কল করা খুব জরুরি। আপনার মোবাইল দিয়ে কলটা করি?’

‘অবশ্যই।’ মালিহা ওর মোবাইলটা এনে দিয়ে ‘দেখি বুয়া কী করছে?’ বলে ওখান থেকে সরে গেল। মারুফ ভাই লিসাকে কল করবে, এ সময়ে কি সামনে থাকা যায়? তবে, ভাল করে চিন্তা করে মালিহা নিশ্চিত হয়েছে, ওর মোবাইলে একান্ত ব্যক্তিগত কিছু নেই – ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর, পাসওয়ার্ড, সোহেলের সাথে অন্তরঙ্গ অবস্থার ছবি – কিছুই না।

মালিহা শুনতে পাচ্ছে মারুফের প্রায় সব কথা: ‘লিসা, কী করছো? … এটা মালিহা ভাবীর নাম্বার, আমার মোবাইলে টাকা নেই, আমি আধা ঘণ্টার মধ্যে আসছি। … হ্যাঁ, মালিহা ভাবীর সাথে কথা হয়েছে। সোহেলের সাথে এখনও কথা বলিনি। ও সময় দিতে পারলে কাল বিকেলে তারা দুজন তোমার সাথে দেখা করবে। … চিন্তার কিছু নেই, তারা অনেক ভাল মানুষ। … কোন একটা রেস্টুরেন্টে … দেখি সোহেলের সাথে আগে কথা বলি। এখন রাখি।’

ফোনে কথা শেষ করেই মারুফ ‘ভাবী’ বলে ডাক দিলো। মালিহা এগিয়ে যেতেই তাকে মোবাইলটা ফেরত দিয়ে ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিলো।

মালিহা দেখলো লিসার নাম্বারটা (যেই নাম্বারে এই মাত্র কল করা হয়েছে) মারুফ ডিলিট করেনি। মালিহা কী মনে করে ডিলিট করতে গিয়েও করলো না। ‘লিসা’ নামে নাম্বারটা সেইভ করতে গিয়েও করলো না। ভাবলো, মারুফ লোকটা কেমন যেন – লিসার সাথে কথা বলার ভান করে কার সাথে কথা বলেছে কে জানে। মোবাইলের কল লিস্টে নাম্বারটা যেমনভাবে আছে থাক।

মালিহা জানে না, ও ভুল জায়গায় ফোকাস করেছে। ঐ নাম্বারটিতে কোন সমস্যা নেই, মারুফ সত্যিই লিসার সাথে কথা বলেছে। তবে, মাত্র কয়েক সেকেণ্ডের জন্য। ‘আমি আধা ঘণ্টার মধ্যে আসছি’ বলার পরেই সে ফোন কেটে দিয়েছে। এরপর লিসার সাথে কথা চালিয়ে যাবার ভান করে সে মালিহার মোবাইল থেকে সোহেলের চাচাতো ভাই সাদমানকে একটা মেসেজ পাঠিয়েছে। মেসেজটা এরকম: ‘ভাইয়া, আপনার সাথে কথা আছে। রাত আটটায় ক্যাফে অপিয়াসে আসুন। ও থাকবে না। এর আগে কোন মেসেজ বা কল দিয়েন না।’

মেসেজটা পাঠানোর পর পরই মারুফ মালিহার মোবাইলের ‘Contacts’ থেকে Saadman Bhaia নামটি ডিলিট করে দিয়েছে। এখন যদি মালিহা মেসেজ ফোল্ডার চেক করে, তাহলে মনে করবে তার মোবাইল থেকে একটা নতুন নাম্বারে মেসেজটা পাঠানো হয়েছে। ভাবতে পারে, মারুফ কোন একজনকে মেসেজ পাঠিয়েছে, কিন্তু নিজের নাম লিখতে ভুলে গেছে। সাদমানের নাম্বারটা মালিহার মুখস্থ থাকার কথা নয়।

রাত আটটার আগে মালিহা টের না পেলেই হলো, তার মোবাইল থেকে সাদমানকে মেসেজ পাঠানো হয়েছে।

মালিহার বোঝার উপায় নেই, ওর স্বামীকে খুন করার নিখুঁত এক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মারুফ এ কাজ করেছে।

(২)

মারুফ বেকার ছিলো বলে বছর দেড়েক আগে সোহেল তার নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পঞ্চাশ হাজার টাকা বেতনে ওকে চাকুরি দিয়েছে। মাস ছয়েকের মধ্যে ব্যবসার নাড়ি-নক্ষত্র বুঝে নিয়েছে মারুফ। এ সময়ে এলাকার বড় ভাই রাকিব অসুস্থ হয়ে সোহেলকে অনুরোধ করলেন তার ব্যবসার হাল ধরতে। সোহেল ছাড়া আর কাউকে তিনি বিশ্বাস করতে পারেন না। দুটো কারণে সোহেল না করতে পারলো না। এক, রাকিব ভাই সোহেলকে নানা সময়ে অনেক হেল্প করেছেন। দুই, সোহেলকে মাসে দু’লাখ টাকা বেতন অফার করলেন তিনি।

সোহেলের নিজের প্রতিষ্ঠান থেকে তখন সব খরচ বাদে মাসে দেড় লাখ টাকা আয় হচ্ছিল। গুছিয়ে নেওয়া ব্যবসাটা মারুফ একাই সামলাতে পারবে বলে সোহেল রাকিব ভাইয়ের প্রতিষ্ঠানের হাল ধরেছে।

সোহেলের নিজের প্রতিষ্ঠানে লাভের পরিমাণ ধীরে ধীরে বেড়েছে, কিন্তু মারুফ সেটা সোহেলের কাছ থেকে গোপন রেখেছে। বিশেষ করে গত ছয় মাস ধরে তো মারুফের নিজের বেতন আর অন্য সব খরচ বাদ দিয়ে তিন লাখ টাকা করে মাসে লাভ হচ্ছে। কিন্তু, কাগজে কলমে মারুফ দেখিয়েছে কখনও দেড় লাখ, কখনও পৌনে দু’লাখ। এভাবে গত এক বছরে মারুফ প্রায় বারো লাখ টাকা সরাতে পেরেছে।

কিন্তু, সোহেল একজন অ্যাকাউন্ট্যান্ট। মাস খানেক আগে ও মারুফকে বলেছে, ‘দোস্ত, আগে তো মাসে বিশ লাখ টাকার মাল কেনা হতো। এখন কেনা হয় ত্রিশ লাখ টাকার মাল। দোকান খরচ তো তেমন একটা বাড়েনি। সেই অনুযায়ী লাভ হচ্ছে না কেন?’

মারুফ বলেছে, ‘কম্পিটিশন বেড়েছে (নতুন প্রতিষ্ঠান হয়েছে)। এখন একটু কম রেটে মাল বিক্রি করতে হয়।’ তবে, সোহেলের মুখ দেখে ও বুঝতে পেরেছে, ওর কথা সে বিশ্বাস করেনি।

এদিকে রাকিব ভাই এখন মোটামুটি সুস্থ। যে কোন সময়ে কাজে ফিরবেন। সোহেল তখন নিজের প্রতিষ্ঠানে ফিরে এসে প্রথমেই অডিট করবে। দু’এক লাখ টাকা হলে কথা ছিলো, বারো লাখ টাকার পার্থক্য সে সহজেই ধরে ফেলবে। তখন শুধু যে মারুফের চাকুরি যাবে, তা নয়। সোহেল যদি রাকিব ভাইয়ের সাহায্য নেয়, বারো লাখ টাকা উদ্ধার করতে বারো ঘণ্টাও লাগবে না। রাকিব ভাইয়ের কানেকশনের অভাব নেই।

শুধু যে আগের মত কপর্দকশূন্য হয়ে যাবে মারুফ, তা নয়। ওকে জেলেও যেতে হতে পারে। সোহেল আর রাকিব ভাই দু’জনই ভালোর ভালো, আবার মন্দের মন্দ।

তাই, সপ্তাহ দুই আগে মারুফ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সোহেলকে খুন করতে হবে। ও খুন হলে আরও কিছুদিন মারুফ চাকুরি করে যেতে পারবে। মালিহা বা ফ্যামিলির অন্য কেউ হঠাৎ করে ব্যবসার হাল ধরতে সাহস পাবে না। আগের মত মাসে দেড় লাখ টাকা করে লাভ পেলে তারা খুশি থাকবে। মারুফ আরও অনেক টাকা সরাতে পারবে। ফ্যামিলি যদি অডিটও করায়, কোন সমস্যা নেই। সোহেল বাদে আর কেউ কোন কিছু বের করতে পারবে না।

মারুফকে সন্দেহ করলেও সোহেল সেটা মালিহাকে বলবে না। ব্যবসার ঝামেলা নিয়ে কথা বলে ও মালিহার মনের শান্তি নষ্ট করে না।

রাকিব ভাইকে সোহেল ব্যবসার সব কথা বলে। তবে, রাকিব ভাই এখনও পুরোপুরি সুস্থ নন। আবার সোহেলও মারুফের চুরির ব্যাপারে নিশ্চিত নয়। হয়তো ও রাকিব ভাইকে এখনও কিছু বলেনি। তবে, সাবধানে এগোতে হবে।

অনেক চিন্তা-ভাবনা করে খুনের জন্য কী কী করতে হবে, তার একটা তালিকা করেছে মারুফ:

ক.সোহেলের সাথে সুসম্পর্কের ভান করতে হবে। এর ফলে দুটো লাভ হবে। ব্যবসার ঝামেলার কথা সোহেল আপাতত: কাউকে বলবে না। তাছাড়া, মারুফ ওকে খুন করার পরিকল্পনা করেছে এটা সে ঘুনাক্ষরেও বুঝতে পারবে না।
খ.খুনটা যেন দুর্ঘটনা বা অসুখ মনে হয়। এটা করতে পারলে বিপদ সবচেয়ে কম।
গ.সোহেলের একজন ভুয়া শত্রু আর ভুয়া সাক্ষ্য-প্রমাণ তৈরি করতে হবে। পুলিশ যদি বুঝতে পারে এটা খুন (অর্থাৎ, প্ল্যান খ যদি ব্যর্থ হয়), মারুফ নিজেকে সন্দেহের বাইরে রাখতে পারবে।
ঘ.একটা নিখুঁত অ্যালিবাই (ঘটনা ঘটার সময় অন্যত্র থাকার প্রমাণ) তৈরি করতে হবে। যদি প্ল্যান খ আর প্ল্যান গ দুটোই ব্যর্থ হয় এবং পুলিশ মারুফকে সন্দেহ করতে শুরু করে, তাহলে ও যেন প্রমাণ করতে পারে, সোহেল যখন আক্রান্ত হয়েছে, ও তখন অন্যত্র ছিল।

গত দু’সপ্তাহ ধরে মারুফ প্ল্যান ক বাস্তবায়ন করেছে। ওর গ্রামের বাড়ি নরসিংদী। সেখান থেকে লটকন আর কলা এনে সে সোহেলের বাসায় পাঠিয়েছে। নিজে থেকে সোহেলকে অডিট করার কথা বলেছে। ও জানে রাকিব ভাই কাজে ফেরার আগে চাইলেও সোহেল অডিটের মত সময়সাপেক্ষ কাজে হাত দিতে পারবে না।

প্ল্যান খ কীভাবে বাস্তবায়ন করবে, অনেক ভেবেও তা বের করতে পারছিলো না মারুফ। প্রথমে চেয়েছিলো খুনটা যেন দুর্ঘটনা মনে হয়। কিন্তু, দিন দুয়েক চিন্তা করে ও বুঝলো, ওর একার পক্ষে এটা সম্ভব নয়। গাড়ি-দুর্ঘটনা ঘটাতে চাইলে কোন মেকানিকের সাহায্য নিতে হবে। সেক্ষেত্রে একজন সাক্ষী তৈরি হবে যে পরে ঝামেলা করতে পারে।

মারুফ সিদ্ধান্ত নিলো, খুনটা রোগবালাই মনে হতে হবে। ও দু’তিন বছর বায়োকেমিস্ট্রি পড়েছে, যদিও অনার্স কমপ্লিট করেনি। যা শিখেছে, হয়তো কাজে লাগবে। প্রায় সবকিছু ভুলে গেলেও ইন্টারনেটের সাহায্য নেয়া যাবে।

তিন-চারদিন Google-এ সার্চ করেও মারুফ কিছু পেলো না। একবার ভাবলো, প্ল্যান খ বাদ দিতে হবে। খুনকে খুন মনে হলে সমস্যা কী? প্ল্যান গ (সোহেলের ভুয়া শত্রু) আর প্ল্যান ঘ (মারুফের অ্যালিবাই) ওকে বাঁচাবে।

এ রকম অবস্থায় হঠাৎ করেই রাইসিন ব্যবহার করার কথা মারুফের মাথায় এলো। সোহেলকে পরিমাণ মত রাইসিন খাইয়ে দিলে একসঙ্গে দু’টি প্ল্যানের বাস্তবায়ন হবে, প্ল্যান খ আর প্ল্যান ঘ। রাইসিন খেলে বমি, ডায়রিয়া আর নিম্ন রক্তচাপ শুরু হবে। এরপর পেচ্ছাব-পায়খানার সাথে রক্ত বের হতে শুরু করবে। ডাক্তার ধরতেই পারবে না কেন এমন হচ্ছে। চব্বিশ থেকে আটচলি­শ ঘণ্টার মধ্যে রোগী মারা যাবে। ডাক্তার মনে করবে জটিল কোন রোগ মৃত্যুর কারণ।

আবার, রাইসিন খাওয়ার দশ বারো ঘণ্টা পরে রোগের উপসর্গ শুরু হবে। মারুফ তখন ইচ্ছে করে অনেক দূরে থাকবে যাতে ওর একটা নিচ্ছিদ্র অ্যালিবাই তৈরি হয়।

আসল ঝামেলা হলো রাইসিন তৈরি করা। মারুফের জানা মতে, একমাত্র ভেরেন্ডা গাছের বীজে রাইসিন আছে। বীজ থেকে তেল (ক্যাস্টর অয়েল বা রেড়ির তেল) বের করলে যেই বর্জ্যটা থাকে, সেখান থেকে রাইসিন পাওয়া যায়। দু’দিন ইন্টারনেটে সার্চ করে মারুফ রাইসিন বানানোর প্রয়োজনীয় উপকরণের তালিকা করলো: ভেরেন্ডা বীজ, লাই (এক ধরণের তরল ক্ষার), অ্যাসিটোন, একটা চিমটা, একটা কাঁচের বয়াম, কয়েকটা কফি ফিল্টার (কাগজের), গ্লাভ্‌স্‌ আর একটা মাস্ক। নিজেকে রক্ষার জন্য মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। রাইসিন হলো সাদা পাউডারের মত। নিঃশ্বাসের সাথে সামান্য পরিমাণ রাইসিনও যদি শরীরে ঢোকে, তাহলে নিশ্চিত মৃত্যু।

নিজের বাসায় এক রাতে মারুফ রাইসিন তৈরির কাজে হাত দিলো। লাই মেশানো পানিতে ভেরেন্ডা বীজগুলি এক ঘণ্টা ভিজিয়ে রেখে পানি ফেলে বীজগুলি ধুয়ে ফেললো। চিমটা দিয়ে বীজের বাইরের আবরণ তুলে ফেললো। ব্লেন্ডারে অ্যাসিটোন নিয়ে তার মধ্যে বীজগুলি ঢেলে ভালভাবে ব্লেন্ড করলো। তৈরি হলো সাদা জুসের মত একটা দ্রব্য। সবটুকু বয়ামে ঢেলে মুখ ভালভাবে বন্ধ করে রেখে দিলো।

তিনদিন পর বয়াম খুলে অর্ধতরল দ্রব্যটা ফিল্টারে ছেঁকে ফেললো মারুফ। তরল যে অংশটা নিচের পাত্রে জমা হলো, সেটা অ্যাসিটোন আর ক্যাস্টর অয়েলের মিক্সচার। কোন কাজে লাগবে না বলে মারুফ তা ফেলে দিলো। ফিল্টারে আটকে থাকা পদার্থটাই রাইসিন। একটা পাত্রে ঢেলে শুকিয়ে ফেলতেই সেটা সাদা পাউডারের মত হয়ে গেল।

সোহেল লম্বায় মারুফের প্রায় সমান। দুজনের স্বাস্থ্যও প্রায় একরকম। মারুফের ওজন ৬৩ কেজি। সোহেলের ওজন ৬৫ কেজির কমই হবে। খাবার বা পানীয়ের সাথে ৬৫ মিলিগ্রাম রাইসিন পাউডার মেশালেই চলবে। খাবারে মেশানো কষ্ট হবে বলে পানীয়তে মেশানোর সিদ্ধান্ত নিলো মারুফ।

সোহেলের পছন্দের পানীয় আইস-কোল্ড স্প্রাইট। তবে, এক গ্লাস স্প্রাইট সে কখনই পুরোপুরি শেষ করে না, কিছুটা গ্লাসে থেকে যায়। গ্লাসের স্প্রাইটে রাইসিন মেশালে কিছু রাইসিন গ্লাসে থেকে যাবে। রেস্টুরেন্ট থেকে গ্লাস হাতে বের হয়ে আসা যাবে না। ভেবেচিন্তে মারুফ সিদ্ধান্ত নিলো, স্প্রাইটের ২৫০ এম.এল. বোতলে রাইসিন মিশিয়ে সোহেলকে দিতে হবে। সোহেল যেহেতু পুরো স্প্রাইট নাও খেতে পারে, ১০০ মিলিগ্রাম রাইসিন স্প্রাইটে মেশাতে হবে। তাহলে ৬৫ মিলিগ্রামের বেশি রাইসিন সোহেলের শরীরে যাবে। সোহেল কিছু স্প্রাইট রেখে দিলে মারুফ বোতলটা হাতে নিয়ে বের হবে।

বাকি ছিল প্ল্যান গ বাস্তবায়ন। ভুয়া শত্রু হিসেবে মারুফ বেছে নিলো সোহেলের চাচাতো ভাই সাদমানকে। ওর বয়স বত্রিশ, হ্যানসাম, এখনও বিয়ে করেনি। ইংলিশে মাস্টার্স করে ব্র্যাকে চাকুরি করছে। মালিহা একদিন সোহেলকে বলেছে (মারুফ পাশের রুমে ছিল), ‘সাদমান ভাইয়া তোমার মতই ভাল মানুষ। মেয়েদের দিকে খারাপভাবে তাকায় না। আমার বোন থাকলে তার কাছে বিয়ে দিতাম।’ সাদমানও মালিহা ভাবীকে পছন্দ করে।

সোহেল প্রতি সপ্তাহে বুধবার সাভারে ওর বাবা-মাকে দেখতে যায়। বিকাল তিনটায় অফিস থেকে বের হয়ে প্রাইভেট কারে চলে যায়, আনুমানিক রাত এগারোটায় ফিরে আসে।

প্ল্যান গ বাস্তবায়নের জন্য মারুফ বুধবার সকালটা বেছে নিয়েছে। মালিহার মোবাইল থেকে সাদমানকে যে মেসেজটা পাঠানো হয়েছে, তাতে বলা হয়েছে, ‘ও থাকবে না।’ সোহেলের মনে সন্দেহ সৃষ্টির জন্য এটাই যথেষ্ট।

খুনের জন্য সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।

(৩)

বুধবার দুপুর ২:৩০টায় সোহেলকে কল করলো মারুফ। বললো ‘দোস্ত, জরুরি কথা আছে। বিকাল চারটায় আজাদ হোটেলে চলে আয়।’

‘তুই জানিস না বুধবার তিনটায় আমি সাভারে যাই?’

‘সাভার যাওয়া ক্যান্সেল কর। বিষয়টা তোর জন্য জরুরি। একটা ব্যাপারে হাতে নাতে প্রমাণ পাবি। ফোনে আর কিছু বলতে চাই না। তবে, প্রমাণ পেতে চাইলে কাউকে বলবি না যে তুই সাভার যাবি না। একদম কাউকে না।’

‘ও.কে.।’

আজাদ হোটেলের একটা কর্নার টেবিলে মুখোমুখি বসে আছে মারুফ আর সোহেল। মারুফের বুকপকেটে দুটো ওরস্যালাইনের প্যাকেট। প্রত্যেকটা প্যাকেট এক কোনায় একটু কেটে ওরস্যালাইন ফেলে দিয়ে ১০০ মিলিগ্রাম রাইসিন ঢোকানো হয়েছে, তারপর কাটা অংশ বরাবর প্যাকেটটা একটু ভাজ করে জেমস ক্লিপ দিয়ে আটকানো হয়েছে যাতে রাইসিন পড়ে না যায়। মারুফের প্রয়োজন হবে একটি প্যাকেট, অন্যটি হলো ব্যাক-আপ।

ওয়েটার মারুফের অর্ডার অনুযায়ী স্প্রাইটের দুটো ২৫০ এম.এল. বোতল দিয়ে গেল। দূর থেকে ওয়েটারকে আসতে দেখেই মারুফ সোহেলকে বললো, ‘দোস্ত, লিসা নামের একটা মেয়ের সাথে আমার বিয়ের কথাবার্তা চলছে। মেয়েটার ছবি দেখ।’ মারুফ ‘ভুল করে’ একটা ভিডিও বের করে দিলো, যেটাতে সংক্ষিপ্ত পোশাক পরা একটা মেয়ে নাচছে।

ভিডিওটা দেখতে শুরু করে সোহেল ধাঁধাঁয় পড়ে গেল। এদিকে মারুফ স্প্রাইটের দুটো বোতলেরই ছিপি খুলে ফেললো। জামার পকেটে হাত দিয়ে একটা প্যাকেটের জেমস ক্লিপ খুলে ক্লিপটা পকেটের মধ্যেই ফেললো, তারপর প্যাকেটটা বের করে ওর সামনের বোতলে সবটুকু রাইসিন ঢেলে প্যাকেটটা আবার বুকপকেটে রাখলো।

সোহেল ব্যাপারটা খেয়াল করলো না। যদি খেয়াল করতো, মারুফ বলতো ‘আমার স্প্রাইটে আমি একটু ওরস্যালাইন মেশাচ্ছি।’

সোহেল ভিডিওটা Pause করে ওকে জিজ্ঞাসা করলো, ‘এই মেয়েটাই লিসা?’ বিস্ময় গোপন করার কোন চেষ্টাই সে করছে না।

ওর হাত থেকে মোবাইলটা নিয়ে এক নজর দেখে মারুফ বললো, ‘স্যরি, ভুল হয়ে গেছে।’ তারপর লিসার ছবির ফোল্ডারটা ওপেন করে সোহেলের হাতে দিলো।

সোহেল একটু হেসে বললো, ‘তুই তো একেবারে গেছিস।’ তারপর লিসার ছবি দেখতে শুরু করলো। হাত বাড়িয়ে সোহেলের সামনের বোতলটা নিয়ে এক চুমুক খেয়ে নিজের সামনে রাখলো মারুফ। রাইসিন মেশানো বোতলটা ঠেলে সোহেলের দিকে এগিয়ে দিলো। বোঝার উপায় নেই যে স্প্রাইটে কোন কিছু মেশানো হয়েছে। রাইসিন খুব সহজেই পানিতে মিশে যায়। আর একটা সুবিধা হলো, এটা স্বাদহীন।

ছবি দেখা শেষ করে সোহেল বললো, ‘মেয়েটা দেখতে ভালোই।’ কয়েক ঢোক স্প্রাইট খেয়ে জানতে চাইলো, ‘কী করে মেয়েটা?’

‘মার্কেটিং-এ মাস্টার্স করে চাকুরি খুঁজছে। দোস্ত, কাল বিকেলে তুই আর মালিহা ভাবী কি লিসার সাথে দেখা করতে পারবি? তোদের মত পেলে আমি বিয়েটা ফাইনাল করবো।’

‘আমার অসুবিধা নাই। মালিহার সাথে কথা বলেছিস?’

‘হ্যাঁ।’ মারুফ এখনও সাদমানের প্রসঙ্গ তোলেনি। সোহেল আগে স্প্রাইট শেষ করুক। সাদমানের প্রসঙ্গ এলে ওর খাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে।

‘এবার বল তো কী ঘটনা,’ অধৈর্য কন্ঠে জানতে চাইলো সোহেল।

কালক্ষেপণ করার জন্য মারুফ ঢক ঢক করে তার নিজের স্প্রাইট শেষ করলো। তারপর ওয়াশরুমে গেল। ফিরে এসে দেখলো সোহেল তার স্প্রাইট প্রায় শেষ করে ফেলেছে। ব্যস, কাজ হয়ে গেছে – মনে মনে বললো মারুফ। সোহেলের মৃত্যু এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। পৃথিবীর কেউ আর সোহেলকে বাঁচাতে পারবে না। কারণ, রাইসিনের কোন প্রতিষেধক নেই।

‘তোর হয়তো মন খারাপ হবে -’ বললো মারুফ, ‘আমার ধারণা তোর চাচাতো ভাই সাদমানের সাথে মালিহা ভাবীর কোন রিলেশন আছে।’

‘কী যা-তা বলছিস? মালিহা এরকম মেয়েই নয়। আর, সাদমানও খুব ভাল ছেলে।’

‘আজ রাত আটটায় ক্যাফে অপিয়াসে মালিহার সাথে সাদমান দেখা করবে। মালিহা ওকে মেসেজ পাঠিয়েছে।’

‘তুই কীভাবে জানিস?’

‘সাদমানের এক ফ্রেন্ড ওর মোবাইলে মেসেজটা দেখে ফেলেছে। ঐ ফ্রেন্ড আমারও খুব ক্লোজ। বিশ্বাস না হলে রাত আটটায় ক্যাফে অপিয়াসে গিয়েই দেখ।’

‘তুই থাকবি আমার সাথে। তোর কথা মিথ্যা হয়ে থাকলে আমি তোর সব দাঁত ফেলে দিবো।’

(৪)

সোহেল আর মারুফ রাত আটটা পাঁচে ক্যাফে অপিয়াসে ঢুকলো। সাদমানকে একটা কর্নার টেবিলে বসে থাকতে দেখা গেল। চোখ তুলে ওদেরকে দেখতে পেয়ে সে একটু থমকে গেল, কী করবে খুঁজে পাচ্ছে না।

সরাসরি ওর টেবিলের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো সোহেল। বললো, ‘কী রে, কারও জন্য অপেক্ষা করছিস?’

আমতা আমতা করছে সাদমান, কোন উত্তর দিচ্ছে না।

‘কথা বলছিস না কেন?’ রেগে যাচ্ছে সোহেল।

‘তুমি যাও সোহেল ভাইয়া। আমি পরে তোমার সাথে কথা বলবো।’

‘চলে যাব কেন? আমি থাকলে তোর সমস্যা?’

‘আমার কোন সমস্যা নেই। যে আসবে তার সমস্যা থাকতে পারে। আমাকে আগে ঘটনা বুঝতে দাও। আমি আজ রাতেই তোমার সাথে কথা বলবো, প্রমিজ।’

রাত আটটা দশ বেজে গেছে। মালিহা কোন কাজে দেরি করে না। তারমানে, ও আসবে না। হয়তো জানতে পেরেছে সোহেল আজ সাভার যায়নি ।

সোহেল হঠাৎ সাদমানকে বললো, ‘দেখি তোর মোবাইলটা।’ সাদমান বাধা দেয়ার আগেই টেবিল থেকে মোবাইলটা তুলে নিলো সোহেল, ‘Z’ প্যাটার্ন ব্যবহার করে আনলক করলো (প্যাটার্নটা জানা ছিলো সোহেলের), তারপর ‘Maliha Bhabi’-এর পাঠানো মেসেজটা ওপেন করলো।

মেসেজটা পড়ার সাথে সাথে সোহেলের মাথা ঘুরে উঠলো, চোখে অন্ধকার দেখতে শুরু করলো সে। তাড়াতাড়ি একটা চেয়ারে বসে পড়লো।

সাদমান বললো, ‘সোহেল ভাইয়া, তুমি যা ভাবছো তা নয়। মেসেজটা পড়ে আমার মনে হয়েছে, ভাবীর সাথে তোমার মনোমালিন্য হয়েছে, ভাবী ব্যাপারটা নিয়ে আমার সাথে আলাপ করতে চান।’

নিজেকে কিছুটা সামলে নিলো সোহেল। বললো, ‘ওর সাথে আমার মনোমালিন্য হয়নি। তোর যদি এমন মনে হয়ে থাকে, তুই আমাকে জানাসনি কেন?’

‘ভাবীর সাথে কথা বলে আমি তোমাকে অবশ্যই জানাতাম। তার সাথে কথা না বলে তোমাকে কী জানাবো?’

হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে সাদমানের গালে একটা চড় বসালো সোহেল। বললো, ‘আমাকে জানিয়ে তুই এখানে আসতে পারতি।’ তারপর সাদমানের মোবাইলটা হাতে নিয়ে ঝড়ের বেগে বের হয়ে গেল রেস্টুরেন্ট থেকে।

মারুফ ওর গ্রামের বাড়ি নরসিংদী রওয়ানা হলো। সোহেলকে মেসেজ করে খবরটা জানিয়ে দিলো।

পরদিন সকালে অফিসের এক কর্মচারী মারুফকে ফোন করে জানালো, সোহেলকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সাথে সাথে রওয়ানা করে ও দুপুর বারোটার দিকে ঢাকায় এসে পৌঁছালো। হাসপাতালে সোহেলকে দেখতে গিয়ে জানতে পারলো ও আইসিইউতে আছে।

বিকেল পাঁচটার দিকে জানা গেল, সোহেল আর নেই।

পরদিন (শুক্রবার) সকালে মারুফ খবর পেলো, পুলিশ সাদমান আর মালিহাকে অ্যারেস্ট করে থানায় নিয়ে গেছে।

দুপুর বারোটার দিকে পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট পেয়ে পুলিশ একটু ধাঁধাঁয় পড়লো। সোহেলের শরীরে কোন বিষের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। মারুফ খবরটা শুনে মুচকি হাসলো। শরীরে প্রবেশের বারো ঘন্টা পর রাইসিনের কোন ট্রেস থাকে না।

পুলিশ এখনও সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না, সোহেল খুন হয়েছে, নাকি অজ্ঞাত কোন জটিল রোগে মারা গেছে। অর্থাৎ, প্ল্যান খ এখনও কাজ করছে। হাতে রয়েছে সন্দেহভাজন সাদমান আর মালিহা (প্ল্যান গ)। তাছাড়া, মারুফের অ্যালিবাইটা (প্ল্যান ঘ) হয়েছে নিচ্ছিদ্র – সোহেল বৃহস্পতিবার সকালে যখন অসুস্থ হয়ে পড়লো, ও তখন নরসিংদী ছিল। বরং মালিহা ছিল সোহেলের সাথে একই বাসায়।

একেই বলে পারফেক্ট মার্ডার, ভাবলো মারুফ।

(শেষের কথা)

রাকিব ভাইয়ের কল পেয়ে বিকেল চারটায় থানায় গেল মারুফ। তিনি জানিয়েছেন, কিছু তথ্য যাচাইয়ের জন্য ওকে দরকার। গেটে ওর পরিচয় দিতেই ওকে নিয়ে যাওয়া হলো ওসি সাহেবের অফিসে।

ওসি হেলালের বয়স পঞ্চান্নের কাছাকাছি। মাথায় কাঁচাপাকা চুল, ভুঁড়িটা দৃষ্টিকটু। তার অফিসে তিনি ছাড়া আরও চারজন বসে আছেন। ওসি সাহেবের ডানদিকে বসেছেন রাকিব ভাই। তার পাশে মালিহা। মেয়েটি অনেক কান্নাকাটি করেছে বোঝা যায়।

ওসি সাহেবের বামদিকে বসে আছেন একজন এসআই, নাম রাজীব। তার পাশে সাদমান।

একটা চেয়ারই খালি আছে টেবিলে। ওসি সাহেবের হাতের ইশারায় এগিয়ে গিয়ে বসলো মারুফ।

পরিচয় পর্ব শেষ করে সংক্ষেপে ওসি সাহেব মারুফকে ডেকে আনার কারণ ব্যাখ্যা করলেন। জানা গেল, সোহেলকে বিষ খাওয়ানো হয়েছে সন্দেহ করে গতকাল রাতে থানায় মামলা করেছেন রাকিব ভাই। সন্দেভাজন হিসেবে উল্লেখ করেছেন মালিহা আর সাদমানের নাম। আলামত হিসেবে থানায় জমা দিয়েছেন সাদমানের মোবাইল, যেটা গত পরশু রাতে সোহেলের কাছ থেকে নিয়ে তিনি নিজের কাছে রেখেছেন। পুলিশ প্রথমে সাদমানকে এবং পরে মেসেজের সূত্র ধরে মালিহাকে গ্রেফতার করেছে। সাদমান আর মালিহা, দুজনেরই মোবাইল এই মুহূর্তে ওসি সাহেবের টেবিলে। কিছু তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন বলে মারুফকে ডাকা হয়েছে।

ওসি সাহেবের কথা শেষ হতেই এসআই রাজীব মারুফকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি গত পরশু, মানে বুধবার সকালে মিসেস মালিহার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন?’

‘হ্যাঁ। আমার বিয়ের কথাবার্তা -’

‘তার মোবাইলে আপনি কারও সাথে কথা বলেছেন?’

‘হ্যাঁ, আমার বান্ধবী লিসার সাথে। আমার মোবাইলে টাকা ছিলো না, এদিকে কলটাও জরুরী ছিলো।

‘কল করার কতক্ষণ পরে আপনি মোবাইলটা ফেরত দিয়েছেন?’

‘একদম সাথে সাথে তাকে মোবাইলটা ফেরত দিয়ে আমি বের হয়ে গেছি। কেন?’

‘আমরা মিসেস মালিহার মোবাইল চেক করেছি। আপনার কল শেষ হওয়ার চলি­শ সেকেণ্ড পরে মিসেস মালিহার মোবাইল থেকে সাদমান সাহেবকে একটা মেসেজ পাঠানো হয়েছে। মালিহা বলছেন তিনি এটা পাঠাননি। আবার, তিনি বলছেন আপনি লিসার সাথে প্রায় এক মিনিট কথা বলেছেন, কিন্তু মোবাইলের রেকর্ডে দেখাচ্ছে মাত্র দশ সেকেণ্ড।’

‘আমি তো সময়ের হিসাব রাখিনি। তবে, বেশিক্ষণ কথা বলিনি এটুকু মনে আছে। আর, সাদমানকে মেসেজ পাঠানোর ব্যাপারে আমি কিছু বলতে পারছি না। একটা ব্যাপার আমি বুঝতে পারছি না। মেসেজটা মালিহা ভাবী পাঠাক আর যে-ই পাঠাক, তার সাথে সোহেলের মৃত্যুর সম্পর্ক কী? শুনলাম, পোস্ট মর্টেমে সোহেলের শরীরে কোন বিষের আলামত পাওয়া যায়নি। তাহলে তো রাকিব ভাইয়ের মামলার মেরিট থাকে না।’

এসআই রাজীব কিছু বলার আগেই রাকিব ভাই কথা বলে উঠলেন, ‘সম্পূর্ণ সুস্থ একটা মানুষের হঠাৎ করে রক্ত-বমি শুরু হলো, পেচ্ছাব-পায়খানার সাথে রক্ত যেতে শুরু করলো – এটা স্বাভাবিক মৃত্যু? পোস্ট মর্টেম রিপোর্টের উপর আমি ভরসা করি না। এমন অনেক বিষ থাকতে পারে যা টেস্টে ধরা পড়বে না।’

এসআই রাজীব বললেন, ‘টেস্টে ধরা পড়তে হবে না। আমরা যদি বুঝতে পারি কে মিথ্যা বলছে, ধোলাই দিয়ে আমরা তার কাছ থেকেই বের করে ফেলবো কীভাবে সে কী করেছে? মুশকিল হলো, কে মিথ্যা বলছে আমরা নিশ্চিত হতে পারছি না। হতে পারে, মারুফ সাহেব চলে যাবার পর পরই মিসেস মালিহা মেসেজটা পাঠিয়েছেন। কিন্তু, তার মোবাইলের গত ছয় মাসের রেকর্ড চেক করে দেখা গেছে, তিনি এর আগে কখনই সাদমানকে মেসেজ দেননি। একবার কল করেছিলেন, প্রায় চার মাস আগে। ত্রিশ সেকেণ্ডের সেই কলে তিনি সাদমানকে জানিয়েছেন, তার কিছু গেস্ট চলে আসায় তিনি সাদমানদের বাসায় দাওয়াতে যেতে পারবেন না, সোহেল একা যাবে। সাদমানের মোবাইল থেকেও মালিহাকে কোন মেসেজ পাঠানো হয়নি। একবারই কল করা হয়েছে, দাওয়াত দেওয়ার জন্য। যদিও এর মানে এই নয় মালিহা পরশুর মেসেজটা পাঠাননি।’

‘মারুফের পক্ষেও মেসেজটা পাঠানো সম্ভব,’ বললেন রাকিব ভাই। ‘লিসার সাথে দশ সেকেণ্ডে কথা শেষ করে সে হয়তো কথা চালিয়ে যাওয়ার ভান করেছে। মামলার সময় আমি যদিও মালিহার নাম বলেছি, কিন্তু এখন ওকে আর খুনি মনে হচ্ছে না। ও যদি মেসেজটা পাঠিয়েও থাকে, এমন কোন পরকীয়ায় দুজনে লিপ্ত হয়নি যে সোহেলকে খুন করবে। তাছাড়া, মেসেজটা ও পাঠায়নি বলে আমার ধারণা। গত পরশু রাতে সোহেলের সাথে আমি ওদের বাসায় গিয়েছিলাম। যখন মালিহাকে জিজ্ঞেস করলাম সাদমানকে ও মেসেজ পাঠিয়েছে কেন, ও প্রথমে বোকার মত তাকিয়ে ছিলো, বুঝতেই পারছিলো না আমি কী বলছি। সোহেল ওর সাথে কথা বলছে না দেখে কান্নাকাটি শুরু করলো -’

মালিহা হঠাৎ করে আবার কাঁদতে শুরু করলো। বললো, ‘ও যদি আমাকে দুটো কথা শোনাতো, আমি এত কষ্ট পেতাম না। যদি ঘৃণার চোখে আমার দিকে তাকাতো, তাহলেও এত খারাপ লাগতো না। কিন্তু, ও অসহায়ের মত বিষন্ন মুখে বসে থাকল, আমার সাথে একটা কথাও বললো না। রাকিব ভাই চলে যাওয়ার পর কত অনুরোধ করলাম, বললাম আমাকে ভুল বুঝো না, আমি সেই একই মালিহা আছি, বদলে যাইনি -’ কান্নার কারণে কথা শেষ করতে পারলো না মেয়েটা।

নিজেকে একটু শান্ত করে মালিহা আবার বলতে শুরু করলো, ‘আপনারা হয়তো নিশ্চিত হতে পারছেন না সোহেল খুন হয়েছে কিনা। কিন্তু, আমার মনে কোন সন্দেহ নেই ও খুন হয়েছে। আমি জানি সাদমান ভাইয়াকে মেসেজটা পাঠিয়েছে এই লোক (মারুফ), কারণ মোবাইলটা ঐ সময়ে তার কাছে ছিল। শুধু তাই নয়, মেসেজটা পাঠিয়ে সাদমান ভাইয়ার নাম্বার সে ডিলিট করে দিয়েছে, যাতে আমি বুঝতে না পারি কাকে মেসেজটা পাঠানো হলো। এসব সে করেছে কোন উদ্দেশ্য ছাড়াই? একে ভাল করে ধোলাই দিন, দেখবেন সব স্বীকার করবে।’

এসআই রাজীব বলবেন, ‘আপা, সামান্য একটু ক্লু পেলেও চলতো। এখন অবস্থা দাঁড়িয়েছে এমন, আপনার মুখের কথা বনাম মারুফ সাহেবের মুখের কথা।’

মালিহা চুপ করে রইলো, কী বলবে খুঁজে পাচ্ছে না। অন্যরাও কেউ কোন কথা বলছে না।

এক পর্যায়ে মারুফ নীরবতা ভাঙলো। বললো, ‘ওসি সাহেব, আপনাদের আর কোন কিছু বলার না থাকলে আমি উঠি। দরকার হলে আমাকে আবার ডাকবেন, চলে আসব।’

সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া কাউকে আটকে রাখা মুশকিল। সোহেলের মৃত্যুটাকে হত্যাকাণ্ড ধরে নেয়ারও কোন কারণ নেই। ওসি সাহেব রাকিব ভাইয়ের দিকে তাকালেন, তাকে চুপ করে থাকতে দেখে মাথা ঝাঁকিয়ে মারুফকে ‘হ্যাঁ’ বোঝালেন।

মারুফ চলে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াতেই মালিহার মাথায় আইডিয়াটা এলো। এত সহজ ব্যাপারটা আগে কেন মাথায় আসেনি? মারুফকে সে জিজ্ঞাসা করলো, ‘গত পরশু আপনার হাতে ঐ মোবাইলটাই তো ছিল, তাই না?’

‘তা দিয়ে আপনার কী দরকার?’ রূঢ় কন্ঠে বললো মারুফ।

‘মিসেস মালিহার প্রশ্নের উত্তর দিন,’ বললেন ওসি সাহেব।

‘হ্যাঁ, আমার এই একটাই মোবাইল।’

‘সিম কয়টা?’ মালিহার জিজ্ঞাসা।

‘একটাই,’ বললো মারুফ।

‘গত পরশু আপনি নিশ্চয়ই আপনার মোবাইলে টাকা রিচার্জ করেছেন? কোথা থেকে করেছেন? কত টাকা?’

আমতা আমতা করতে শুরু করলো মারুফ। এক পর্যায়ে বললো, ‘মনে নেই।’

এসআই রাজীবকে মালিহা বললো, ‘এই লোকের মোবাইলের ব্যালেন্স চেক করুন। গত পরশু কত টাকা রিচার্জ করেছে, তাও বের করুন। আপনাদের সবার সামনে লোকটা বলেছে, তার মোবাইলে টাকা ছিলো না বলে সে আমার মোবাইল ব্যবহার করেছে।’

এসআই রাজীব চেক করার আগেই মারুফের মুখ দেখে সবাই যা বোঝার বুঝে ফেললেন।

রাকিব ভাই ওসি সাহেবকে বললেন, ‘কথায় বলে: বজ্র আঁটুনি, ফস্কা গেরো। এর মানে জানেন তো? শক্ত বাঁধন, কিন্তু আলগা গিঁট।’

(শেষ)

কমেন্ট করুন

প্রাক্তন শিক্ষার্থী

পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সেশনঃ ১৯৮৩ - ৮৪

জাফর আহমেদ খান

প্রাক্তন শিক্ষার্থীপরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সেশনঃ ১৯৮৩ - ৮৪